বিশ্লেষণ

মন্ত্রী হিসেবে মোস্তফা জব্বারের সামনে চ্যালেঞ্জ

 প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০১৮      

 রাশেদ মেহেদী

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার— ফাইল ছবি

মন্ত্রী হিসেবে মোস্তফা জব্বারের নিয়োগ টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য প্রযুক্তি খাতের প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সুদৃষ্টির প্রতিফলন। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ২০০৯ সাল থেকেই দেখা গেছে। মোস্তফা জব্বার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা যায়। কিন্তু সময়টা খুব কম, এক বছরেরও কম। এ সময়ের মধ্যে কতটা এগিয়ে যাওয়া যায়? এ খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিস্তৃত হওয়া কানাগলি বন্ধ করার জন্য এ সময়টা সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জ।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর মোস্তফা জব্বারও আলাপকালে প্রথমে চ্যালেঞ্জের কথাটাই বললেন। ‘ফোরজি চালুর মত বিষয়ে কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। এটা চালু করতে সময়ও লাগবে না, সমস্যাও হবে না। কিন্তু সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নন পারফরমিং কোম্পানিগুলোকে পারফরমেন্সের ভেতরে নিয়ে আসা’— বলছিলেন টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন নিয়ে বরাবরই স্পষ্ট কথা বলা প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার। তার কথায় আশ্বস্ত হওয়া গেল, আস্থাটাও বাড়ল। প্রযুক্তিবিদ মন্ত্রী ঠিক শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জটা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। টেলিযোগাযোগ খাতে সত্যিকার অর্থেই বড় সংকট এবং অপচয়ের খাত হচ্ছে অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। এ কোম্পানিগুলো সফল হলে টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য প্রযুক্তি খাতে সক্ষমতার চিত্রটা সত্যিই অনেক উজ্জ্বল হতে পারত। কিন্তু ভুল নীতি এবং পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো দিন দিন রাষ্ট্রের জন্যই বড় বোঝা হয়ে যাচ্ছে।  সবচেয়ে বড় কোম্পানি বিটিসিএল এবং প্রতি বছর এর লোকসান বাড়ছে। বিদায়ী অর্থ বছরেও (সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী) বিটিসিএল প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর বাইরে টেলিটকেরও অবস্থা শোচনীয়। খুলনা কেবল আর টেসিস লাভের কৌশলগত ভুল হিসেব দিয়ে কিছু ধোঁয়া তৈরি করতে পারলেও সত্যিকার অর্থে লাভজনক হতে পারছে না। প্রতিযোগী না থাকায় ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মত শুধুমাত্র লাভে আছে সাবমেরিন কেবল কোম্পানি। এ ধরনের কোম্পানিকে লাভজনক করার চ্যালেঞ্জ আসলেই অনেক বড়। 

এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে হলে মোস্তফা জব্বারকে নিয়োগ দিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় যেমন সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি এসব কোম্পানির প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রেও সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের উদ্ভট কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তন করতে পারলে সেটাই হবে প্রাথমিকভাবে বড় অগ্রগতি। সঠিক কাঠামো, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন তারুণ্য নির্ভর নেতৃত্ব পেলে এসব কোম্পানির নিজের পায়ে দাঁড়াতে বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু বরাবরই এসব কোম্পানিকে জীর্ণ সেকেলে আমলাতন্ত্র আর অদক্ষ নেতৃত্বের হাতে জিম্মি করে রাখা হচ্ছে। 

বিটিসিএল এর কথাই ধরুন। যে ব্যক্তি দুই মেয়াদে এমডি পদে থেকে কোম্পানিকে ক্রমাগত লোকসানের ভেতরে ঠেলে দিয়েছে, যার দায়িত্বে অবহেলা এবং অনিয়মের কারণে জাপানি ঋণ সহায়তা ফেরত গেছে বলে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে, সেই ব্যক্তিকে তৃতীয় মেয়াদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়ার অর্থই হচ্ছে বিটিসিএলের ভেতরে অদক্ষতা এবং অনিয়মকে উৎসাহিত করা এবং এখন সেটাই হচ্ছে।  অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক উচ্চ মূল্যের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, চড়া সুদের বিদেশি ঋণের বোঝা জাতির ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে, কিন্তু গ্রাহকরা কোনো সুফল পাচ্ছে না। যেমন বিপুল ব্যয়ের ট্রিপল প্লে নেটওয়ার্ক থেকে সাধারণ গ্রাহকরা কোনো সুফল পায়নি। এখনও ‘এমওটিন’ নামে প্রকল্পে বিশ্বে প্রায় পরিত্যক্ত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বসানোর আয়োজন চলছে অস্বাভাবিক উচ্চ ব্যয়ে, অর্থাৎ প্রকল্পের শুরুতেই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, এটাও শুধুই অপচয় হবে। কোম্পানিও লাভবান হবে না, রাষ্ট্র কোনো সুফল পাবে না। অনিয়ম, অপচয়ই বিটিসিএলের লোকসানের পরিমাণ বছর বছর বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ খাতের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ক্ষেত্রেও এ সত্যই প্রযোজ্য। 

দুনিয়ার আর একটা দেশের উদাহরণ সামনে নেই যেখানে একজন সরকারি আমলা একই সঙ্গে পাঁচ-ছয়টা কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান। যদি বিভাগের সচিব একাই পাঁচ-ছয়টা কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যান হন তাহলে প্রত্যেক কোম্পানির জন্য পৃথক বোর্ড রাখারও কোনো যুক্তি নেই। এসব বোর্ডের সদস্যদের কাজ বলতে একেকটা সভায় হাজির হয়ে সম্মানি নেওয়া ছাড়া বেশি কিছু নয়। কারণ কোম্পানি বছরের পর পর অলাভজনক, অসফল থাকার সবচেয়ে বড় দায় পরিচালনা পর্ষদের। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে এই সব কোম্পানির একজন বোর্ড চেয়ারম্যান মাননীয় সচিব সাহেব সেই দায় নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন না। কারণ মেয়াদ শেষে মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়েই গেলেই সব দায়মুক্তি! 

 মোস্তফা জব্বার এ বিষয়গুলোর সবই জানেন। তাকে চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে এখানেই। প্রথমেই কোম্পানিগুলোরর পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান কাঠামো ভেঙে নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান কাঠামোয় একজন মন্ত্রীর এসব কোম্পানিকে সফল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগই নেই। সর্বেসবা হচ্ছেন সচিব। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমলা নির্ভর এই পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো রেখে এবং টিঅ্যান্ডটি, বিটিটিবি থেকে বিটিসিএল হয়ে দীর্ঘ অনিয়মের মধ্যে বেড়ে ওঠা পরীক্ষিত ব্যর্থ ব্যক্তিদের দফায় দফায় এমডি নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে সফল, লাভজনক করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটা এত বছরে বাস্তবিক অর্থেই প্রমাণিত সত্য।

এখানে আমার প্রস্তাব, প্রত্যেক কোম্পানির জন্য পৃথক পরিচালনা পর্ষদ না রেখে ছয়টা কোম্পানির জন্য একটা বোর্ড গঠন করা হোক। দেশের স্বনামধন্য প্রযুক্তি গবেষক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ পেশাজীবীরা বোর্ডের সদস্য হবেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন সার্বক্ষণিক এবং পেশাগত জীবনে সফল এবং দক্ষতার পরিচয় দেওয়া বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। এই বোর্ড কোম্পানি পরিচালনার নীতি ও কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে কোম্পানিগুলোর নিয়োগ, আয়-ব্যয়ের হিসেব নেওয়া সব ধরনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। কোম্পানির এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা কোম্পানিগুলোর মত একশ' ভাগ পেশাদার, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন তারুণ্য নির্ভর নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বোর্ডের তদারকিতে প্রত্যেক কোম্পানির প্রতি বছর ‘টেকনিক্যাল অডিট’ হবে এবং এই অডিট রিপোর্ট জনগণের সামনে প্রকাশিত থাকবে। বোর্ডের চেয়ারম্যান দায়বদ্ধ থাকবেন বিভাগের মন্ত্রীর কাছে। মন্ত্রী বোর্ড চেয়ারম্যানের জবাবদিহিতা এবং বোর্ডের ভূমিকাসহ কোম্পানির কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন। টেকনিক্যাল স্টাডি ছাড়া নতুন কোনো প্রকল্পও নেওয়া হবে না।

আমরা জানি নতুন করে এই কাঠামো গড়ে তোলা খুবই কষ্টসাধ্য। তবে নতুন মন্ত্রী একটা কাজ করতে পারেন। এখনই প্রত্যেকটা কোম্পানির টেকন্যিকাল অডিটের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাহলে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের আসল চেহারাটা বোঝা যাবে।

মোস্তফা জব্বারের কাছে জাতির কৃতজ্ঞতা আরও বাড়বে যদি তিনি বিটিআরসিকে আবারও আগের মত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে পারেন। স্বাধীন কমিশন হিসেবে বিটিআরসির ভূমিকা নিশ্চিত করার পক্ষে মোস্তফা জব্বার সব সময় সোচ্চার। আশা করি তিনি এই সাহসী পদক্ষেপ নেবেন। তবে এ কাজটিও খুবই কষ্টসাধ্য। কারণ সেই আমলাতন্ত্র! বিটিআরসির প্রতি নিয়ন্ত্রণ সহজে ছাড়তে চাইবেন না আমলারা— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মোস্তফা জব্বার উদ্যোগ নিলে সফল হবেন বলেই আমার বিশ্বাস। 

দেশের টেলিযোগাযোগ শিল্পে বেসরকারি খাত নিজেদের মত করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিদেশি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর, দেশীয় মালিকানাধীন এনটিটিএন কোম্পানি, সফটওয়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ডিভাইস আমদানি করা প্রতিষ্ঠান সবাই নিজেদের চেষ্টায় নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে যেমন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে, তেমনি দেশের টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি খাতকেও এগিয়ে নিয়ে গেছে। টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি শিল্পে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যবসা ও বিনিয়োগে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা নতুন মন্ত্রীর জন্য প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সরকারি খাত এক্ষেত্রে নিদারুণ অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে এবং এখন সে ধারাতেই আছে। সরকারি খাতকে ডিজিটাল সময়ের স্রোতধারায় বহমান হওয়ার উপযোগী করে তোলাটা মন্ত্রী হিসেবে মোস্তফা জব্বারের  জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

লেখক: সাংবাদিক


  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

    ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’


‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮