বিশ্লেষণ

অমসৃণ হচ্ছে শ্রমবাজারের পথ

 প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮      

 দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

ফাইল ছবি

সৌদি আরব হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আমাদের বৃহত্তম শ্রমবাজার। বিগত কয়েক বছরে তেলের বাজারে ঘটেছে ব্যাপক দরপতন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিরাজ করছে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি যুদ্ধবিবাদ। এসব কারণে দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বেকারত্বের হার বেড়ে গেছে স্থানীয়দের মধ্যে। এমতাবস্থায় দেশগুলো বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার হার কমিয়ে দিয়েছে অনেকাংশে। অনেক খাতেই বন্ধ রয়েছে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিসহ বিদেশিরা কাজও হারাচ্ছেন। এর বিরূপ ধাক্কা লেগেছে আমাদের শ্রমবাজারে।

নিকট অতীতেও সৌদি আরবের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রটা ছিল অনেকটাই বিস্তৃত। ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং অর্থনীতির চিত্র দ্বন্দ্ব সংঘাতে আশঙ্কাজনকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। এই দেশগুলো থেকে উদ্বাস্তুর সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। এসব বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ একেবারে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি এক জরিপচিত্রে প্রকাশ, তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবে বেকারত্নের হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশ, ওমানে ১২ শতাংশ, কুয়েতে ২ দশমিক ২ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি কর্মনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে তারা বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। এর ফলে নতুন করে সেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের যাওয়ার পথ সঙ্কুচিত হওয়ার পাশাপাশি যারা কর্মরত আছেন তারাও হয়ে যাচ্ছেন কর্মহীন। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার প্রবাসী আয়ে এর ফলে সঙ্গতই পড়েছে ভাটা। এই অবস্থায় বাংলাদেশকে বিকল্প সন্ধানে দ্রুত মনোযোগী হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এই দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করে বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।

নানা মহল থেকে বারবার অদক্ষ কর্মী কিংবা শ্রমিকের বদলে বিভিন্ন পেশায় দক্ষদের বিদেশে পাঠানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে। দক্ষকর্মীর চাহিদা বরাবরই ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আর এজন্যই প্রয়োজন দেশে পেশাভিত্তিক দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জোরদার উদ্যোগ। একই সঙ্গে খুঁজতে হবে নতুন নতুন শ্রমবাজার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের কদর আছে দুটি কারণে। প্রথমত, বাংলাদেশি কর্মীদের মজুরি কম; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি কর্মীরা পরিশ্রমী। তবে এক্ষেত্রে শুধু পেশাগত দক্ষতাই শেষ কথা নয়, যেসব দেশে কর্মী পাঠানো হবে সেসব দেশের ভাষা, কৃষ্টি সম্পর্কেও কর্মীদের যথাযথভাবে যোগ্য করে তোলার বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে।

আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ার কারণে কর্মহীন মানুষ কর্মসংস্থানে বিদেশে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এর সুযোগ নেয় দালাল, প্রতারক ও মানবপাচারকারী চক্র। এদের খপ্পরে পড়ে ইতিমধ্যে সর্বস্ব খুঁইয়েছেন অনেকে। অনেকের জীবনও গেছে অত্যন্ত মর্মন্তুদভাবে। এখনও যে এমন ঘটনা ঘটেছে না তা নয়। জমিজমা, সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে অনেকেই যেমন অজ্ঞতার কারণে পড়ছেন প্রতারকদের ফাঁদে, তেমনি সেখানে গিয়েও নানারকম বিড়ম্বনার শিকার হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরছেন। অনেকে কাটাচ্ছেন প্রবাসে বন্দি জীবন। কিন্তু প্রতারক, দালাল, অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কর্ণধারদের এসব কারণে শনাক্ত করে এ যাবৎ দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের চিত্র বিরল। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি-না- এ প্রশ্নটি পুরনো। জনশক্তি রফতানি খাতটিকে কেন সুশৃঙ্খল করা যাচ্ছে না- প্রশ্ন আছে এ নিয়েও। বিশ্বের যেসব দেশে অবৈধ বাংলাদেশি রয়েছেন তাদের বৈধকরণের চেষ্টা সরকারকেই নিতে হবে। তাদের সমস্যা বিশেষত্ব কারান্তরীণ বাংলাদেশিদের মুক্তির ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে দূতাবাসগুলোকে।

প্রধানমন্ত্রী মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর ইতিমধ্যে বহুবার জোর দিয়েছেন। বস্তুত সমস্যাটির নিষ্পত্তি হওয়া খুব জরুরি। প্রবাসে কর্মরত বাঙালির সংখ্যার অনুপাতে দক্ষ জনশক্তি বেশি নয়। অথচ প্রবাসে কর্মরতরা দক্ষ হলে রেমিট্যান্স বেড়ে যেত অনেক। দেশে এখন অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ব্যয় কমাতে হবে। এ দেশ শুধু জনসংখ্যাধিক্যেরই নয়, এ জনসংখ্যা সম্ভাবনাও ধারণ করে। এটা পরীক্ষিত যে, বিদেশে এ দেশের শ্রমিকরা যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। এখন দরকার শুধু অধিক সংখ্যার জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্র উদ্ভাবন হওয়া। সুনির্দিষ্ট বাজারগুলোর দিকেই শুধু নয়- ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার দেশগুলোতেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে। রেমিট্যান্সের কারণেই বাংলাদেশে গত বিশ্বমন্দার তেমন আঁচড় পড়েনি- এই সত্য অনস্বীকার্য।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনশক্তি রফতানি খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে সরকার ও সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তা না হলে এ ব্যাধি আরও নতুন উপসর্গ সৃষ্টি করবে। বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমনিতেই এসব কারণে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে বিকল্পের সন্ধান করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আমাদের হারানো শ্রমবাজারগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সুষ্ঠু ও সমন্বিত জনশক্তি রফতানি নীতিমালার আলোকে যৌক্তিক অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাংবাদিক

deba_bishnu@yahoo.com



‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮