বিশ্লেষণ

এলডিসি, উন্নয়নশীল এবং মধ্যম আয়ের ধারণা: বিভ্রান্তি ও ব্যাখ্যা

 প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৮ | আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৮      

 জাকির হোসেন

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) শ্রেণি থেকে বের হবার যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপনের শোভাযাত্রায় সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা তাদের ব্যানারে লিখেছে, বাংলাদেশ নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। কোনো কোনো সংস্থার ব্যানারে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। দুটি ক্ষেত্রেই ধারণাগত বিভ্রান্তি রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও এ নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অভুতপূর্ব উন্নতি করেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে আর্ন্তজাতিকভাবে বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) গুলো অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যও আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত। ধারাবাহিক অগ্রগতির কারণে আর্ন্তজাতিক সংস্থাগুলোর দেশভিত্তিক শ্রেণিকরণে বাংলাদেশ ওপরের দিকে উঠছে। বাংলাদেশের অর্জনকে খাটো করে দেখা কোনোভাবেই এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। মাথাপিছু আয় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে আর্ন্তজাতিক সংস্থাগুলোর শ্রেণিকরণ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যে অস্পষ্টতা রয়েছে তা তুলে ধরার চেষ্টা এ লেখার উপজীব্য।

বাংলাদেশ ২০১৫ সালের ১ জুলাই নিম্ন -আয় থেকে নিম্ন -মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। শুধু মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক চার শ্রেণিতে দেশগুলোকে শ্রেণিকরণ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে নিচের শ্রেণি নিম্ন-আয়। এর পরে যথাক্রমে নিম্ন-মধ্যম, উচ্চ-মধ্যম এবং উচ্চ আয়ের দেশ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পৌছে গেছে। অথচ বিভিন্ন সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে— বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চায়। এক্ষেত্রে 'মধ্যম' বলতে যদি 'উচ্চ-মধ্যম' বোঝানো হয়ে থাকে, তাও পরিষ্কার করা হচ্ছে না। যদিও এ সময়ের মধ্যে ওই স্তরে যাওয়া সম্ভব নয়।

আমরা জানি, সরকারের রুপকল্প-২০২১ অনুযায়ী, ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে পৌছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের এ অর্জন আগেই হয়েছে, যার অন্যতম কারণ জিডিপি গণনার ভিত্তিবছর পরিবর্তন। ২০১৩ সালে জিডিপির ভিত্তিবছর ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছর নির্ধারণ করা হয়। মাথাপিছু আয় প্রতিবছরই বাড়ছে। তবে ভিত্তিবছর হালনাগাদ করায় মাথাপিছু আয়ের অংক আরও বেড়েছে।

২০১৫ সালে নিম্ন-আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত সীমা ছিল, মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪৬ ডলার। বিশ্বব্যাংকের অ্যাটলাস পদ্ধতিতে হিসাব করা মাথাপিছু আয় আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরোর চেয়ে কম থাকে। যাই হোক, ওই বছর উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য ন্যূনতম মাথাপিছু আয় ধরা হয় ৪ হাজার ১২৬ ডলার। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০৫ ডলার। আর বিশ্বব্যাংকের অ্যাটলাস পদ্ধতিতে ১ হাজার ৪৯৬ ডলার। ২০২১ সালে নিশ্চয় উচ্চ-মধ্যম আয়ের যোগ্যতা নির্ধারণে মাথাপিছু আয়ের সীমা ২০১৫ সালের চেয়ে বাড়বে। যদি নাও বাড়ে, তাতেও প্রায় তিনগুণ আয় বাড়তে হবে, যা তিন বছরের মধ্যে অসম্ভব।

এবার আসি এলডিসি থেকে উত্তরণের কথায়। জাতিসংঘ নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুযায়ী বিভিন্ন দেশকে এলডিসি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। প্রতি তিন বছর পর প্রত্যেকটি এলডিসিগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করে জাতিসংঘের একটি কমিটি। এলডিসি থেকে উত্তরণেরও মানদণ্ড রয়েছে। এলডিসি থেকে বের হলে সেই দেশ উন্নয়নশীল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি ( সিডিপি) কয়েকদিন আগে তাদের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বলেছে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার মানদণ্ড প্রথমবার পূরণ করেছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা - এই তিন সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ড অতিক্রম করেছে। আশা করা যায়, ২০২১ সালে ওই কমিটির পর্যালোচনায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো যোগ্য বিবেচিত হবে। তখন বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করা হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। কিছু প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে আসবে। এরপর আরও তিন বছর অর্থাৎ ২০২৭ সাল পর্যন্ত এলডিসি হিসেবে বাণিজ্য ও ঋণসুবিধা পাবে বাংলাদেশ। সুতরাং, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে বলে কারও কারও যে ধারণা রয়েছে, তা সঠিক নয়।

নিম্ন মাত্রার আর্থ-সামিাজিক উন্নয়ন, নিম্ন উৎপাদশীলতা ও বিনিয়োগ, সুশাসনের অভাব, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য রয়েছে এমন দেশগুলোকে ১৯৭১ সাল থেকে এলডিসি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা শুরু করে জাতিসংঘ। ১৯৭১ সালে এলডিসি ছিল ২৫ টি। বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয় ১৯৭৫ সালে।

এ পর্যন্ত ৫২টি দেশ এলডিসি হিসেবে অর্ন্তভুক্ত হয়েছে। পাঁচটি দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে। ১৯৯৪ সালে আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানা এলডিসি থেকে বের হয়। ২০০৭ সালে আফ্রিকার কাবো ভারদে, ২০১৪ সালে সামোয়া এবং ২০১৭ সালে ইকুয়েটোরাল গিনির উত্তরণ ঘটে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালদ্বীপ ২০১১ সালে এলডিসি থেকে বের হয়। বাংলাদেশের উত্তরণ হবে সমসায়মিক উন্নয়ন ইতিহাসের একটি বড় সাফল্য। আগের যে ৫ টি দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে তাদের অর্থনীতি অনেক ছোট। জনসংখ্যার আকারও কম।

লেখক: সাংবাদিক




  • আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

    আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?


‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮