বিশ্লেষণ

জাফর ইকবালের ওপর হামলা যে আশঙ্কাকে প্রকট করে

 প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০১৮ | আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৮      

 রাশেদ মেহেদী

মুক্তবুদ্ধির চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে একটি প্রশ্ন আবারও জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছে। সেটি হলো—সুস্থ চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা যারা করেন এই ভূখণ্ডে তাদের নিরাপত্তা কি দুর্বল হয়ে পড়ছে? আমি মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে চাই। যুক্তিহীনতা, অন্ধত্বের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই। তাই প্রশ্নটা নিশ্চয় আমার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

মুক্তচিন্তার আরেক পথিকৃৎ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয় প্রায় ১৪ বছর আগে, ২০০৪ সালে। ভয়াবহ সেই হামলার গভীর ক্ষত থেকে আর সেরে ওঠেননি তিনি। ওই বছরের আগস্টে বিদেশের মাটিতে তার মৃত্যু হয়। বিগত কয়েক বছরে একের পর এক মুক্তচিন্তার ব্লগারদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা জাতি দেখেছে। অনেক তরুণ ব্লগার হুমকির মুখে বিদেশে চলে গেছেন। তারা সম্ভবত আর দেশে ফেরার কথা চিন্তাও করেন না।

প্রায় দুই যুগ আগে অধ্যাপক আহমদ শরীফ ও লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে 'মুরতাদ' ঘোষণা করেছিল উগ্র ধর্মান্ধরা। তসলিমা নাসরিন আজও পরবাসী। মুহম্মদ জাফর ইকবালও গত কয়েক বছরে একাধিকবার হুমকির শিকার হয়েছেন। ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এক এমপি ও তার অনুগতরা তাকে প্রকাশ্যে চাবুক পেটা করার হুমকিও দেন!

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এদেশে স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত করে জাতির চরম সর্বনাশের সূচনা করে গেছেন। আর ক্ষমতার রাজনীতির হীন স্বার্থে জেএমবির মত জঙ্গি সংগঠনের জন্ম দিয়ে, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় হামলার ঘটনাকে প্রশ্রয় দিয়ে দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাবাদের শিকড় বিস্তৃত করার ঘৃণ্য কাজটি পরবর্তী সময়ে করেছে খালেদা জিয়ার বিএনপি। দলটি দেশে জন্ম দিয়েছে চরম প্রতিহিংসার রাজনীতির।

দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ক্ষমতার রাজনীতির সংকীর্ণ স্বার্থে 'হেফাজতে ইসলামের' মতো সংগঠন প্রশ্রয় পাচ্ছে। তাই স্পষ্ট করেই বলা যায়, মুক্তবুদ্ধির ও সুস্থচিন্তার মানুষের বসবাসের জন্য জন্মভূমি অনিরাপদ করার মূলে আসলে হীন রাজনীতি। শুধু ক্ষমতায় যাওয়া আর টিকে থাকার রাজনীতিই এখন মুখ্য! সুস্থচিন্তার সুশিক্ষিত একটি জাতি গঠনের গুরুত্ব এখানে ম্লান। শুধু তাই নয়, পাঠ্যপুস্তকে মৌলবাদীদের দাবি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রচনা সংযোজন করে নতুন প্রজন্মের সামনেও অন্ধকার পথ তৈরি করা হয়েছে।

ষাট বা সত্তরের দশকের সঙ্গে যদি বর্তমান রাজনীতির তুলনা করা হয়, তাহলে বলতেই হবে, ওই সময়ের তুলনায় জাতি অনেক পিছিয়ে গেছে। ষাটের দশকে স্বাধীন মাতৃভূমির পাশপাশি ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নত গণতন্ত্র আর নৈতিক মানসম্পন্ন জাতি গঠনের লড়াইয়ে রাজনৈতিক শক্তি ছিল অনেক সক্রিয়। সেদিনের রাজনীতিকরা কখনোই জাতির স্বার্থ ও নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দেওয়ার পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু আজকের রাজনীতিকরা নিজের ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সন্তানদের চরম অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে দ্বিধা করছেন না।

অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর আস্কারা পেয়েও যারা কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস দেখাতে পারেনি। আজ তারা স্বাধীন দেশে সেই সাহস পাচ্ছে! ক্ষমতার মোহ আমাদের রাজনীতিকদের কি ভয়াবহ মাত্রায় নির্লজ্জ করে তুলেছে তা ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির উলম্ফন দেখেই বোঝা যায়। উলম্ব রেখায় অর্থনীতির গড় হিসেব থেকে উন্নয়নশীল বা উন্নত জাতির খেতাব নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর আমরা তুলতেই পারি। কিন্তু সেই প্রশান্তি দিয়ে উন্নত চিন্তার জাতি গঠনের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

সময় খুব কম, তারপরও সময় আছে এবং দায়িত্বটা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী রাজনীতিকদেরই নিতে হবে। ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে চটকদার বিজ্ঞাপন নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগোতে হবে। নতুন প্রজন্মের সামনে যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সুশিক্ষা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্যাগের মহান আদর্শের উন্নত নৈতিক মানদণ্ড তুলে ধরা যায় তাহলে বিএনপির জঙ্গিবাদ-তোষণের অপরাজনীতি এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর সমাজের ভেতর যদি ধর্মান্ধতা বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের নয়, বরং বিএনপির রাজনীতিই শক্তি পাবে। তাই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন শুরু করতে হবে এখনই। আর তা না হলে ভবিষ্যতে সেই আন্দোলন শুরুর উপযুক্ত সমাজ থাকবে কী-না তা নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

রাজনীতি যদি মৌলবাদ তোষণের সর্বনাশা পথ থেকে মুক্ত হতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের যাত্রা নিষ্কণ্টক হবে না কখনোই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণও হয়ে পড়বে কষ্টসাধ্য। আর সেটা হবে জাতির জন্য চরম বিপর্যয়ের। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা সে আশঙ্কাই প্রকট করে তোলে।

লেখক: সাংবাদিক


  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

    ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’


‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮