বিশ্লেষণ

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৮ | আপডেট : ১১ জুন ২০১৮      

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিকারকরা উৎপাদকে পরিণত হওয়ার ঘোষণা দেন। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর তারা ঘোষণা দিলেন, উৎপাদক হওয়ার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং আমদানিকারক থাকতে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে।

তারা বলছেন, মাঝখানে উৎপাদক হওয়ার স্বপ্নে যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে তা এখন দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ স্থাপিত কারখানা চালুর আগেই বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রায় তিন হাজার মানুষের যে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছিল, তাও বন্ধ হয়ে যাবে। মোবাইল হ্যান্ডসেট শিল্পে 'মেড ইন বাংলাদেশ' এর স্বপ্নও মাঝ পথে থেমে যাচ্ছে। কিন্তু কেন?

চিত্র বদলে দিয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে জারিকৃত ভ্যাট সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন-১৬৮। এই প্রজ্ঞাপনে এমন কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়েছে যার ফলে বিদেশের কারখানায় তৈরি মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট, আমদানি শুল্কসহ মোট কর দিতে হবে ৩১ শতাংশ। আর দেশে সংযোজন কারখানা স্থাপনকারীদের শুধু যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর দিতে হবে ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানির চেয়ে দেশের কারখানায় সংযোজন কর বেশি! একেবারে চোখ বন্ধ করে বলা যায়, দুনিয়ার আর কোন দেশে এ ধরনের অবাস্তব, হাস্যকর নীতি পাওয়া যাবে না।

এবার আলোচ্য প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলোতে আসি। ভ্যাট সংক্রান্ত ১৬৮ নম্বর প্রজ্ঞাপনটি জারি হয়েছে মূলত দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনকে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য খুবই ভাল। এ ধরনের নীতিগত অবস্থান দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। কিন্তু এই প্রজ্ঞাপনের প্রথম শর্তেই সে উৎসাহ নিরুৎসাহে পরিণত হয়েছে। প্রথম শর্তে বলা হয়েছে, 'সংযোজন ব্যতীত উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।' এর অর্থ সংযোজন আর উৎপাদনকে পৃথক করে দেখা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। অর্থাৎ সংযোজন কারখানাগুলো ভ্যাট অব্যাহতি সুযোগ পাবে না। পরের শর্তগুলোর মধ্যে একটিতে কারখানায় 'পিসিবি', ব্যাটারি, চার্জার, হাউজিং, কেসিং উৎপাদন না করলে তাকে উৎপাদন কারখানা বলা হবে না বলে উল্লেখ রয়েছে।

এ দুটি শর্ত প্রমাণ করে, যারা এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন, শুধু মোবাইল হ্যান্ডসেট নয়, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমন্বিত শিল্প উৎপাদন সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই নেই। এখনকার দুনিয়ায় 'অ্যাসেম্বিলিং' আর 'ম্যানুফ্যাকচার' বা সংযোজনকারী কিংবা উৎপাদনকারী শব্দ দিয়ে আলাদা করা হয় না। এখন ব্যবহৃত হয় 'এসকেডি' বা সেমি নক ডাউন এবং 'সিকেডি' বা কমপ্লিট নক ডাউন। 'নক ডাউন' এর আক্ষরিক বাংলা অর্থ করা না গেলেও এটি মূলত, কারখানায় সংযোজন ও উৎপাদনকে সমন্বিতভাবে বোঝায়। এভাবেও বলা যেতে পারে, এখন পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াকে কার্যত আংশিক উৎপাদন ও সংযোজন এবং পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ও সংযোজনে ভাগ করা যেতে পারে। 

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভোগ্য পণ্যের দুনিয়াতে এখন যত বড় ব্রান্ড আছে তারা কেউই কার্যত কোথাও সিকেডি বা পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ও সংযোজন করে না। কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ পণ্যের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পৃথক কারখানায় তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি পণ্যের উৎপাদন 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে' অনেকগুলো পৃথক পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- আই ফোন। এই হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি কোয়ালোকম নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে মাইক্রো প্রসেসরসহ চিপসেট নেয়, স্যামসাংয়ের কাছ থেকে নেয় এলসিডি স্ত্রিন। আবার এর হাউজিং, কেসিং করে পৃথক একটি কোম্পানি। চার্জার বানায় অন্য একটি কোম্পানি। ক্যামেরা এবং অডিও সিস্টেমের সরবরাহ নেওয়া হয় অন্য একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। এভাবে পৃথক প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রাংশ নিয়ে অ্যাপলের কারখানায় সংযোজিত হয়ে তৈরি হয় আই ফোন।

এমন ঘটনা শুধু স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানির ক্ষেত্রে নয়; ডেল এইচপি আসুসের মতো ল্যাপটপ, ডেস্কটপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা টয়োটা, বিএমডব্লিউর মতো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

আমরা দেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর উদাহরণও দিতে পারি। একটি গার্মেন্ট কারখানায় শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, সোয়েটার বানানো হয়। এখানে কাপড়, বোতাম, জিপার সবকিছু সরবরাহ করে পৃথক কোম্পানি। এখন যদি বলা হয়, নিজস্ব টেক্সটাইল, বোতাম এবং জিপার কারখানা না থাকলে সেটাকে গার্মেন্ট পণ্য উৎপাদন কারখানা বলা হবে না, সেটি কি যৌক্তিক হবে?

একইভাবে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনও 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে' পৃথক কারখানার যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ওপর র্নিভরশীল। গার্মেন্ট কারখানার মতই এখানে অনেকগুলো যন্ত্রাংশ নিপুণভাবে জুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডসেট তৈরি হয়। অথচ, এসআরও-১৬৮ তে দেশে স্থাপিত মোবাইল হ্যান্ডসেট কারখানায় 'হাউজিং প্ল্যান্ট' থাকতে হবে! প্রজ্ঞাপন জারিতে অজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে যায় এই একটি শর্তেই।

মোবাইল হ্যান্ডসেট শুধু নয়; ইলেকট্রনিক্স ভোগ্য পণ্য উৎপাদনে প্রথম যে নকশা এবং সে অনুযায়ী মোল্ডিংয়ের মাধ্যমে কাঠামো তৈরিকে বলা হয় 'হাউজিং'। এই হাউজিংয়ের বিখ্যাত কোম্পানির নাম ফক্সকন। অ্যাপল, স্যামসাং, এইচটিসি, নকিয়ার মত ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান ফক্সকনের কাছ থেকে 'হাউজিং' সরবরাহ নেয়। আর একটি হাউজিং কারখানা স্থাপনে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। কারখানায় মাসে উৎপাদনের গড়ও কয়েক মিলিয়ন ডলারের। এ ধরনের একটি হাউজিং কারখানা স্থাপনের শর্ত দেওয়া হয়েছে মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদন উদ্যোক্তাদের ওপর!

দেশে গার্মেন্ট কারখানা যখন প্রথম স্থাপিত হয়, তখন কিন্তু দেশে উন্নত কাপড়, বোতাম, জিপার তৈরির  মত 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ' কারখানা ছিল না। গার্মেন্ট কারখানা বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কারখানা গড়ে উঠে। দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট কারখানাগুলো যদি বিস্তৃত হতো তাহলে এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ কারখানা যেমন ব্যাটারি, চার্জার, কেসিং এমনকি পৃথক হাউজিং মোল্ডিং এর মতো ব্যয়বহুল কারখানাও হয়ত স্থাপিত হতো। কিন্তু এসআরও-১৬৮ সেই স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

গত অর্থ বছরেও বাজেটের সঙ্গে একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। সেখানে সংযোজন ও উৎপাদনকে একই ক্যাটাগরিতে রেখে কিছু যন্ত্রাংশের যৌক্তিক উৎপাদনকে সামনে রেখে একটি ছোট্ট বিভাজন করা হয়েছিল; যে বিভাজনে সংযোজন (এসকেডি) ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ কর এবং উৎপাদনের (সিকেডি) ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ কর ধার্য করা হয়েছিল। আর পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে মোট কর ছিল ৩০ শতাংশ। আমদানি এবং সংযোজনের মধ্যে কর পার্থক্যের এই সুবিধার জন্যেই দেশে দ্রুত গতিতে বিশ্বখ্যাত স্যামসাং, দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ব্র্যান্ড টেকনো, দেশীয় ব্র্যান্ড সিম্ফনি, ওয়াল্টন, উই দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট কারখানা স্থাপন করে। যেখানে প্রথম পর্যায়ে এসকেডি বা আংশিক উৎপাদন ও সংযোজনের ব্যবস্থাই মূলত রাখা হয়। ভবিষ্যতে সিকেডি'র সুযোগও রাখা হয়। যেমন, এর আগে ফ্রিজ এসকেডি দিয়ে শুরু হয়েছিল। এখন দেশেই কমপ্রেসার তৈরি হচ্ছে এবং এটাকে সিকেডি বলা হচ্ছে। যদিও ফ্রিজ উৎপাদনও একাধিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ কারখানার ওপর নির্ভরশীল। মোবাইল হ্যান্ডসেটেও সেই সিকেডি হতে পারত অদূর ভবিষ্যতে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এসআরও-১৬৮এর কারণে থাকছে না।

প্রজ্ঞাপনটির কারণে মোবাইল হ্যান্ডসেট তৈরির সদ্য স্থাপিত করাখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন স্যাসসাং, টেকনো, সিম্ফনি, ওকে মোবাইলসহ এ খাতের উদ্যোক্তারা। আর সত্যি যদি তেমনটি ঘটে তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। বিশ্বে প্রচার হয়ে যাবে, বাংলাদেশের করনীতি অস্থিতিশীল এবং এ কারণে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী বা লাভজনক বিনিয়োগ পরিবেশ নেই! অথচ আমরা জানি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে ডিজিটাল সুবিধা দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি খাতে আরও বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার হাইটেক পার্ক এবং সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক করেছে। এ অবস্থায় এই একটি প্রজ্ঞাপন গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল বার্তা দিতে পারে; যা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রা থমকে দেবে। তাছাড়া এতে,  তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাজার আরও বেশি চোরাচালানীদের দখলে চলে যাবে। 

লেখক: সাংবাদিক


  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

    ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’


‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট: স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক হিসাব

  রাশেদ মেহেদী

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এখন মহাকাশে। দেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট নিয়ে সাধারণের ...

২০ মে ২০১৮