বিশ্লেষণ

‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৮ | আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৮      

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে আমাকে বলল, ‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খুব খারাপ।’  আমি বললাম, ‘কেন এ কথা বলছ বাবা?’ বাচ্চার উত্তর, ‘আমরা রাস্তায় ভাল করে গাড়ি চলার ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম। তোমরা বড়রা শুনলে না, মারামারি করলে, খুব খারাপ করেছ।'

আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। বাচ্চাটা বলার সুযোগ দিল না। সে আবার বলল, ‘আচ্ছা, আমরাও কি বড় হয়ে বড়দের মতো খারাপ হব?’ এই প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি। সম্ভবত, শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের কোন প্রান্তের নূন্যতম সুস্থ বুদ্ধির সচেতন মানুষই পারবে না। তবে অসুস্থ মানসিকতার কেউ হলে হয়ত বলে দিতে পারবে, 'বড় হতে হলে খারাপ হতে হয়, এটাই নিয়ম!'

কিশোরের সঙ্গে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে আলাপ করার চেষ্টা করলাম। তাকে বললাম, রাস্তায় ভাল করে গাড়ি চালাতে কি করতে হয় সেটা তোমরা কি করে জানলে? তার চটপট উত্তর, ‘এটা তো খুব সোজা। কার ড্রাইভিং গেমসেই তো রাফ ড্রাইভিং করলে, রুলস ব্রেক করলে পুলিশ আসে। পেলান্টি দেয়, পয়েন্ট হারাতে হয়। এটা না বোঝার কি হলো?’ আমি হতবাক হলেও আশান্বিত হলাম। এই বাচ্চাদের আমরা গেমসের জন্য, ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর হওয়ার জন্য কতো বকা-ঝকাই না করি! ইন্টারনেট পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দেই! অথচ দেখুন, বাচ্চারা গেমস থেকে, ডিজিটাল ডিভাইস থেকেও ভাল কিছু শিখছে। ডিজিটাল এই প্রজন্ম পুরনো প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সুস্থ বুদ্ধি, প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি আর স্মার্ট হয়েই তারা বড় হচ্ছে।

আসলে এবার কিশোর প্রজন্মের কাছে হেরে গেছে বাংলাদেশ। ‘বড়রা খরাপ’ এই ধারণা যখন তাদের অনুভূতির সঙ্গে যোগ হয়ে যায় তখন জাতি হিসেবে এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু আমরা বড়রা কি সত্যিই লজ্জা পাচ্ছি?

বাস্তবতা হলো, বাচ্চাদের একটি আন্দোলন ঘিরে চারদিক থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছে নানা পক্ষ। প্রথমে সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে আসি। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে জনগণের পক্ষে সাহস নিয়ে দাঁড়ানো সবচেয়ে পরীক্ষিত রাজনৈতিক শক্তি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে দলটি। স্বৈরশাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও থেকেছে সবার সামনে। অথচ এবার কিশোররা যখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে তখন আওয়ামী লীগের কোন নেতাকে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দেখা গেল না। দলটির কেউ তাদের মাথায় হাত রেখে কথা শুনলেন না! অথচ আন্দোলনের একদিন, দু’দিনের মাথায় মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা বাচ্চাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারতেন। মোড়ে মোড়ে সমাবেশ করে দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলে তাদের ক্লাসে দিয়ে আসতে পারতেন। দুর্ভাগ্য তেমনটি আমরা দেখলাম না! এটাই বোধ হয় ক্ষমতার নিয়ম। ক্ষমতায় থাকলে জনতার সমান্তরালে দাঁড়াতে অনেক হিসাব-নিকাষ করতে হয়! তাই শুরু থেকেই দেখলাম, সরকারের মন্ত্রী- কর্মকর্তারা বেশ কঠোর 'বাবা সুলভ' শাসনের সুরে কথা বলতে শুরু করলেন। ব্যাপারটা এরকম, ‘বাচ্চারা অনেক গেমস খেলেছ, এবার পড়তে বসো’। একেবারে শেষ পর্যায়ে বাচ্চারা যখন চোখে আঙুল দিয়ে ভুল ধরিয়ে দিল, তখন তাদের 'বাহবা' দেওয়া হলো। অথচ শুরুতেই দায়িত্বশীল হলে শেষটাও অনেক সুন্দর হতে পারত। উদ্বেগ-উৎকন্ঠা আর হামলা-মামলার প্রয়োজন হত না।

সরকারবিরোধীরাও এ আন্দোলন থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করলেন। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ অনুসন্ধান করে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুললেন। নিরাপদ সড়কের দাবি এড়িয়ে অনুপ্রবেশ আর নাশকতা ঠেকানোর পথে সরকারকে ধাবিত করলেন। এতে খুব কি লাভ হলো তাদের? অথচ তারাও বড়দের কাতারেই। আসলে তাদের কাছেও ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে জনগণের বাঁচার দাবি ও অব্যক্ত যন্ত্রণার কোনো মূল্য নেই।

সব মিলিয়ে বড় একটা ভুল কী আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবকরা করে ফেললেন না? আজকের এই কিশোররা পথে নেমে যা দেখল, যা শুনল এবং যা বুঝল, তাতে কি দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল বা জোটের ওপর ভবিষ্যতে তারা আস্থা পাবে? কিশোরদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়াল। পরিস্থিতি ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নিল। মার খেল শিক্ষার্থীরা। এভাবে একটি প্রজন্ম যদি রাজনীতিতে আস্থা হারায় তাহলে রাজনৈতিক অভিভাবকদের ভবিষ্যত কিভাবে শংকা মুক্ত হয়- সে প্রশ্ন বেশ বড় হয়েই দেখা দিয়েছে মনে হয়।

আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। আন্দোলনের মাঝে পেটানো হল সাংবাদিকদের।পুলিশের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার দায় অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের নিতে হবে। আর আন্দোলনে দাবির মুখে নতুন গণপরিবহন আইন মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। এই আইন নিয়ে আমার খুব বেশি উৎসাহ নেই। কারণ আইনে শুধু চালকদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, মালিকদের দায়িত্বহীনতা ও শ্রম আইন লঙ্ঘন সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। বলা হয়নি, বিআরটিএ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অবহেলা ও দুর্নীতির শাস্তি সম্পর্কে। আইনে যেসব কমিটির কথা আছে সেখানে মালিকপক্ষ, তাদের সহযোগী শ্রমিক সংগঠনের নেতা ও আমলাদের রাখা হয়েছে। ফলে আইনটিকে 'পরিবহন মালিকবান্ধব' না বলে 'জনবান্ধব' বলা মুস্কিল। নিশ্চয় দেশে অনেক ভাল আইন হয়; কিন্তু অনেক সময়ই তা প্রয়োগের চেয়ে অপ্রয়োগ হয় বেশি। তাই আইন অপপ্রয়োগের শাস্তিও নতুন আইনে স্পষ্ট উল্লেখ থাকা দরকার। তা না হলে, ভালো আইনেও অনেক সময় ভালো ফল আসে না। আর আইনগুলো তো বড়দেরই তৈরি।

লেখক: সাংবাদিক 


  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

    প্রভাবশালী বন্ধু দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা চাই

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

    পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

  • একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

    একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ


নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট: স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক হিসাব

  রাশেদ মেহেদী

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এখন মহাকাশে। দেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট নিয়ে সাধারণের ...

২০ মে ২০১৮