অন্যান্য

পলাতক খুনিদের ফেরাতে আইনি জটিলতা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০১৮     আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাশেদ মেহেদী ও ওয়াকিল আহমেদ হিরন

আইনি জটিলতার কারণে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার আত্মস্বীকৃত ছয় খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব নিয়ম থাকায় পলাতকদের ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কানাডায় পালিয়ে থাকা খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আইনি লড়াই শুরু করেছে বাংলাদেশ। এ লড়াই শেষে তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আশাবাদী সরকার। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও নিজ নিজ দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে সরকার আশাবাদী হলেও খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ ও জটিল। খুনিদের ফিরিয়ে এনে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকরের সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বিশেষ টাস্কফোর্সেরও প্রধান তিনি। 


২০১০ সালে ২৭ জানুয়ারি পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়। তবে পলাতক আরও ছয়জনকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তাদের দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি এখন অনেকটা অনিশ্চিত। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, খুনিদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোই সরকারের জন্যে বড় চ্যালেঞ্জ। 


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিদের বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পাঠায় তখনকার অবৈধ দখলদার খন্দকার মোশতাক সরকারসহ পরবর্তী সামরিক সরকারগুলো। এমনকি খুনিদের বিচারের পথও রুদ্ধ করে রাখা হয় কুখ্যাত 'ইনডেমনিটি অ্যাক্ট' জারি করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায়ে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত আদেশ দেন উচ্চ আদালত। পরে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হলে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে থাকা পাঁচ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। তারা হচ্ছে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন। এ ছাড়া খুনি আজীজ পাশা ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে। বাকি ছয় খুনিকে দেশের আনার প্রচেষ্টা শুরু হয় পাঁচ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকরের পর থেকেই। 


বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিরা কে কোথায় : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পলাতক ছয় খুনির মধ্যে নূর চৌধুরী আছে কানাডায়। ১৯৭৬ সালে এই খুনিকে বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিলে নূর চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে যায়। একইভাবে ১৯৭৬ সালে খুনি রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবের জেদ্দা বাংলাদেশ মিশনে চাকরি দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে তাকেও দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিলে এই খুনি পালিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭৬ সালে খুনি শরিফুল হক ডালিমকে চীনে কূটনৈতিক মিশনে হিসেবে পাঠানো হয়। পরে ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকার তাকে কেনিয়ায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে। এই খুনি বর্তমানে কোথায় আছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন সময়ে তার কেনিয়া, স্পেন ও পাকিস্তানে অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। এই খুনি বার বার বিভিন্ন স্থান পরিবর্তন করছে। ২০১৪ সালে খুনি ডালিমের মৃত্যুর গুজবও ছড়ানো হয়। 


খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন বর্তমানে জার্মানিতে রয়েছে বলে সূত্র জানায়। অপর খুনি আব্দুর রশীদকে সর্বশেষ পাকিস্তানে দেখা গেছে বলে সূত্র জানায়। তবে এই খুনিও বার বার অবস্থান পরিবর্তন করছে বলে সূত্রের ধারণা। এ ছাড়া খুনি আবদুল মাজেদের অবস্থান ঠিক কোথায় তা নির্ণয় করা যায়নি। 


খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া যেভাবে চলছে :খুনিরা যেসব দেশে পালিয়ে আছে সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে খুনিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে দেশগুলোর নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ায় নানা বাধ্যবাধকতার কারণে এই চেষ্টা সফল করা যাচ্ছে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কানাডা থেকে খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি লড়াই শুরু করেছে বাংলাদেশ। 


সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে বহিস্কারের আদেশ দিয়েছিলেন কানাডার আদালত। তবে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খুনি নূর চৌধুরীর অন্য এক আবেদনে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় নূর চৌধুরী কানাডায় বসবাসের সুযোগ পাচ্ছে। এ আবেদনে সে কানাডা কর্তৃপক্ষকে জানায়, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ থাকায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। সূত্র জানায়, কানাডা নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা সমর্থন করে না। এই সুযোগ নিয়ে সহানুভূতি পাওয়ার কৌশল হিসেবেই কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে নূর চৌধুরী আবেদন করে। ঝুলে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কানাডার ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে বাংলাদেশ। এ আবেদনটি কানাডার অ্যাটর্নি কার্যালয় খারিজ করে দিলেই খুনি নূর চৌধুরীক দেশে ফিরিয়ে আনতে আর কোনো বাধা থাকবে না। 


এ ছাড়া খুনি রাশেদ চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং মোসলেহ উদ্দিনকে জার্মানি থেকে ফিরিয়ে আনতে দুই দেশের সঙ্গেই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। খুনি আব্দুর রশীদকে পাকিস্তানে দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়ার পর এ ব্যাপারে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি নোট পাঠানো হয়। কিন্তু দেশটির সরকার তার কোনো জবাব দেয়নি। এ ছাড়া কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ডালিম ও আবদুল মাজেদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। 


আইনমন্ত্রীর বক্তব্য : এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দ প্রাপ্ত বিদেশে পালিয়ে থাকা একজন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যথেষ্ট অগ্রগতি রয়েছে। আমরা দু'জন আসামির সম্পর্কে তথ্য জেনেছি। তাদের ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। 


তিনি আরও বলেন, কানাডায় নূর চৌধুরীকে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তার বৈধ কোনো নাগরিকত্ব নেই। তিনি সেখানে একটি আবেদন করেছেন যে, বাংলাদেশে একটি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এ কারণে কানাডা সরকার তাকে ফেরত দিচ্ছে না। 


ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট : বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি টাস্কফোর্স পর্যবেক্ষণ করছে। সেখানে লে. কর্নেল (অব.) এমএইচবি নূর চৌধুরী ও কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরীর অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 

আরও পড়ুন

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোট শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে মহাসংকটে ...

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চলকে শহরের সুবিধায় আনতে ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ...

প্রত্যাবাসন আজ শুরু হচ্ছে না

প্রত্যাবাসন আজ শুরু হচ্ছে না

বহুল প্রতীক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে না। ...

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ঘাতক ব্যাধি ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ...

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

'লোকগানের কথায় রয়েছে জীবনের দিকনির্দেশনা। এর ঐন্দ্রজালিক সুর অদ্ভুত এক ...

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দক্ষ রাজমিস্ত্রি হিসেবেই মিরপুর, ভাসানটেক ও কাফরুল এলাকার মানুষজন চিনতেন ...

নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে বসবে নির্বাচন কমিশন: সচিব

নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে বসবে নির্বাচন কমিশন: সচিব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেছাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি নিয়ে নির্বাচন ...

ইসির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিরোধিতা আ. লীগের

ইসির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিরোধিতা আ. লীগের

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আবারও পেছানোর বিরোধিতা করেছে আওয়ামী ...