কল্যাণ ট্রাস্টের ৩১ প্রতিষ্ঠান সরকারের বোঝা

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৭      

আবু সালেহ রনি

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন মুনাফা করছে, তখন শুধু ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে গত দুই যুগে বন্ধ হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ২৯টি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ট্রাস্টের অন্য আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান চালু থাকলেও এর মধ্যে লাভজনক রয়েছে মাত্র একটি। বন্ধ এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় চারশ' কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রতিবছর ট্রাস্টের ব্যয় হচ্ছে ১৮ কোটি টাকা। ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নানামুখী তৎপরতা সত্ত্বেও গত আট বছরে বন্ধ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানও চালু করা সম্ভব হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ২২টি লাভজনক প্রতিষ্ঠান নিয়ে ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে বঙ্গবন্ধু সরকার। পরে জিয়া ও এরশাদ সরকার ট্রাস্টে নয়টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত করায় মোট প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায় ৩২টিতে। কিন্তু লাভজনক এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠানই এরশাদের আমলের শেষ দিকে এবং ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের পাঁচ বছরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন থেকে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ২৯টিতে। গত আট বছরে এসব প্রতিষ্ঠান একাধিকবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। বন্ধ থাকা ২৯টি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ও ১০১ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছে সরকার।

মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের। পরিচালনায় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে ট্রাস্টের ১৪টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গঠনের পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ এর আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠান এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। তখন থেকে ট্রাস্টের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও একে একে বন্ধ হতে শুরু করে। এখন ট্রাস্টের ৩২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯টি বন্ধ রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবদুল আহাদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা, অযৌক্তিক বিভিন্ন বিষয় ট্রাস্টের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বেহাল অবস্থা। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও সম্পত্তি বেহাত হতে চলেছে।

সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের জন্য বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় ট্রাস্টের অধীনে প্রায় ১০ হাজার কর্মচারী থাকলেও এখন আছে মাত্র চারশ'। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেনশনসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে কল্যাণ ট্রাস্ট। বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এগুলো হলো- ঢাকার পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন কেমিক্যাল লিমিটেড ও ঢাকার মিমি চকলেট লিমিটেড। এর মধ্যে ফিলিং স্টেশন ছাড়া অন্য দুই প্রতিষ্ঠান দেনার দায়ে জর্জরিত। ট্রাস্টের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে এখন ১৬০ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর)। এর মধ্যে ৪২ কোটি টাকার এফডিআর থেকে পাওয়া লভ্যাংশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য 'বঙ্গবন্ধু ছাত্রবৃত্তি' দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১১৮ কোটি টাকার এফডিআর থেকে লভ্যাংশ বাবদ পাওয়া মাসিক ৬৯ লাখ টাকা এবং গুলিস্তানসহ কয়েকটি মার্কেটের ভাড়া ও পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশন মিলিয়ে পাওয়া ৭৩ লাখ টাকা দিয়ে বর্তমানে ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে। এর পরও অর্থাভাবে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না ট্রাস্ট।

অব্যবস্থাপনাই বড় সংকট :কল্যাণ ট্রাস্টের বেহাল অবস্থার জন্য বিভিন্ন সরকারের আমলের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিই প্রধান কারণ। এর ফলে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কল্যাণ ট্রাস্টের অস্তিত্ব রক্ষা করা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, ২০০১ সালেও ট্রাস্টের সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান তাভানী বেভারেজের লাভ ছিল প্রায় ২৫ কোটি টাকা। অথচ ২০০৮ সালে লোকসান ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাভানী বেভারেজের উপ-মহাব্যবস্থাপক কাজী ইকবাল বাহার সমকালকে বলেন, 'তাভানীসহ ট্রাস্টের সব প্রতিষ্ঠানই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তাভানী চালুর করা চেষ্টা হলেও দুর্নীতিবাজরা আগে যেভাবে লুটপাট চালিয়েছে, তাতে নতুন করে আর তা চালু করা সম্ভব হয়নি।'

ট্রাস্টের অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন সমকালকে বলেন, ট্রাস্টের পুরো কার্যক্রম বাণিজ্যিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। এ জন্য সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন হয়। কিন্তু ২০০২ সালে ট্রাস্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাওয়ার পর থেকে চিঠি চালাচালি করতে গিয়েই সিদ্ধান্তহীনতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া নেতৃত্বের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি তো রয়েছেই।

এ বিষয়ে ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আজাহারুল হক সমকালকে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত এক বছরে বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলো চালুর বিষয়ে অনেক চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু মামলাসহ বিভিন্ন কারণে খুব একটি সফল হতে পারিনি। তবে চেষ্টা অব্যাহত আছে। আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে এনে আগ্রহী সরকারি বা বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেও যদি দু-একটি কোম্পানি চালু করা যায়, তাহলে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে তা-ও করা হবে।

উদ্যোগ :লোকসান কমিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ট্রাস্টকে লাভজনক করার জন্য বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব জমি অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে, সেসব স্থানে বাণিজ্যিক ও আবাসিক বহুতল ভবন নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এর মধ্যে গাজীপুরের কুনিয়া মৌজার ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডের ১/৬ প্লটের দশমিক ২২ একর, চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের ১ দশমিক ৯৩ একরসহ ১১টি প্রতিষ্ঠানের জমিতে ডেভেলপারের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাবনা আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৭ অক্টোবর ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয়ে এ নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করে ট্রাস্টকে লাভজনক করার জন্য চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খোঁজখবর নেন। গত কয়েক বছরে কল্যাণ ট্রাস্টের তিনশ' কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মওকুফ করা হয়েছে।



আগামীকাল :২০ বছর ধরে অব্যবহূত এক হাসপাতালের গল্প

আরও পড়ুন

নৌকায় চড়তে চান নাজমুল হুদা

নৌকায় চড়তে চান নাজমুল হুদা

বিএনপির এক সময়কার ডাকসাইটে নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এখন আওয়ামী ...

ন্যায়বিচার চায় পরিবার

ন্যায়বিচার চায় পরিবার

কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের এক বছর আট মাস ...

 আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব-বিবাদ বিএনপিতে দুর্বল প্রার্থী

আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব-বিবাদ বিএনপিতে দুর্বল প্রার্থী

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে একাধিক মনোনয়নপ্রার্থী থাকায় অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য প্রকট হয়ে ...

হাজারীখিল মাতাচ্ছে ১২৩ প্রজাতির পাখি

হাজারীখিল মাতাচ্ছে ১২৩ প্রজাতির পাখি

মথুরা, কাঠময়ূর ও হুদহুদ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ...

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বৃহস্পতিবার চুক্তি হতে পারে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বৃহস্পতিবার চুক্তি হতে পারে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা থেকে বাঁচতে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ...

হরিষে বিষাদ

হরিষে বিষাদ

ভাগ্নির বিয়েতে আনন্দে নাচানাচি করছিলেন মামা শাহাবুল ইসলাম (২৮)। কিন্তু পাশেই ...

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাড়তি ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাড়তি ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ

দেশের প্রতিটি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বাল্যবিয়ে আর নারীর প্রতি ...

'সরকার নামানোর শক্তি থাকলে মওদুদ চেষ্টা করে দেখতে পারেন'

'সরকার নামানোর শক্তি থাকলে মওদুদ চেষ্টা করে দেখতে পারেন'

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, 'সরকারকে ...