বছরটা নতুন, প্রত্যাশা পুরনো

বিশেষ লেখা

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০১৮      

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

কালের বিবর্তনে আরেকটি বছর শুরু হলো। বছরটি নিয়ে আমাদের অনেক আশা, অনেক চিন্তা, অনেক উদ্বেগ এবং ভয়ও। আশাগুলি পুরনো- প্রতি বছরের শুরুতে এগুলি আমরা উচ্চারণ করি :দেশটা শান্তিতে থাকুক, স্বচ্ছন্দ হোক এর সব মানুষের জীবন, উন্নতির পথে দেশটা তার যাত্রা অব্যাহত রাখুক। বিশ্ব নিয়েও আমাদের কিছু প্রত্যাশা থাকে- আমরা চাই দেশে দেশে সম্প্রীতি বাড়ূক, যুদ্ধ-বিবাদ-বিসম্বাদ থেকে বিশ্ব মুক্তি পাক ইত্যাদি। বছর শেষে দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়। এর প্রধান কারণ- মানুষে মানুষে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে বৈষম্য; পুঁজিবাদের শাসন ও করপোরেট লোভ; সমরবাদ; নানা ধরনের উগ্রবাদ; অসহিষ্ণুতা, স্বার্থপরতা, ক্ষমতা ও বিত্তের দম্ভ। এগুলি মানুষ, ব্যক্তি, শ্রেণি ও সংঘের কিছু মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক এবং আচরণগত উপাদান। এগুলি এমনই মৌলিক যে এদের থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোদিন সম্ভব কি-না, কে জানে। যেমন- পুঁজিবাদ কখনও মানববান্ধব হবে না, উগ্রবাদ কখনও যুক্তি শুনবে না, সমরবাদ কখনও শান্তির প্রাধান্য মেনে নেবে না। কিন্তু তাই বলে এদের বিকল্প উদ্ভাবন অথবা এগুলি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়- এ কথাও মেনে নেওয়া যায় না। সম্ভব, যদি মানুষের ভেতর সুনীতিচর্চা বাড়ে; নৈতিকতা, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতা জাগানো যায় এবং মানবিকতার অধিষ্ঠান ঘটানো যায়। এসব করার জন্য আমাদের চিন্তাচেতনা ও চর্চার ক্ষেত্রে এক বিরাট এবং ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে হবে, যাকে বিজ্ঞান-দার্শনিক-তাত্ত্বিক টমাস কুন-এর ভাষায় বলা যায়, প্যারাডাইম শিফট বা আমূল পরিবর্তন।

তা-ও সম্ভব। যদি আমরা শুরু করি শিক্ষা দিয়ে- যে শিক্ষা হবে সংস্কৃতির, সত্যের, সুন্দরের, জীবনের এবং মূল্যবোধের। এই শিক্ষা দেওয়ার জন্য কতগুলি শর্ত পূরণ প্রয়োজন- প্রথমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, রাষ্ট্রের সংকল্প, সম্পদের সমাবেশ, মেধার সন্নিবেশ এবং পরিবর্তনের জন্য প্রতিটি মানুষকে তৈরি করা। যদি এই উদ্যোগগুলি ২০১৮ সালে শুরু করা যায়, তাহলে এক প্রজন্মের মধ্যেই এর ফল পাওয়া যাবে।

এ পর্যন্ত বলে অবশ্য আমাদের থামতে হয়; কারণ, ২০১৭ সালের শুরুতেও আমরা এই প্রত্যাশাটি ব্যক্ত করেছিলাম; কিন্তু বছর শেষে এসে দেখা গেল, কোনো উদ্যোগ তো নেওয়া হয়ইনি, বরং বিরাজমান শিক্ষা কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলল শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা, যার সুযোগ নিয়ে কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নকলের ব্যাপ্তি বাড়ল।

গত বছরের সবচেয়ে লজ্জাজনক খবর ছিল, দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। আমাদের শিক্ষার বিস্তার বাড়ছে, সন্দেহ নেই; কিন্তু মান রয়ে গেছে তলানিতে। প্রশ্ন ফাঁস, মুখস্থনির্ভর, সনদমুখী, জিপিএ ৫-এর স্বপ্ন দেখে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা যেসব শিক্ষার্থী তৈরি করছে, তারা কখনও আত্মবিশ্বাসী হবে না, আত্মশক্তিতে জেগে উঠবে না।

তারপরও ২০১৮ সালের প্রত্যাশাটা- পুরনো প্রত্যাশাটাই বস্তুত আমরা পুনর্ব্যক্ত করব এবং আশা করব, নতুন বাস্তবতার তাগিদে প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো নেওয়া শুরু হবে।

নতুন বাস্তবতাটা কী? এটি হচ্ছে জাতি হিসেবে, দেশ হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ। আমাদের অর্থনীতির জন্য ২০১৮ সাল একটি কঠিন বছর হবে। আমরা যদি আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে পৌঁছাতে চাই, যদি উগ্রবাদ মোকাবেলা করে আমরা এগিয়ে যেতে চাই, যদি দেশের সকলের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, যদি শিক্ষাকে প্রকৃত মানসম্পন্ন করতে চাই, যদি নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চাই, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষজনকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে চাই, তাহলে ২০১৭ সালের বাস্তবতায় সমর্পিত থাকলে চলবে না, নতুন বাস্তবতা হচ্ছে নতুন হিসাব-নিকাশ, যাতে দেশের ও মানুষের কল্যাণের সব বিষয় প্রাধান্য পাবে।

নতুন বাস্তবতার আরেকটি দিক হচ্ছে, বাংলাদেশের তারুণ্যচিত্র। যদি তরুণদের অনুপ্রাণিত করে, তাদের সুশিক্ষা দিয়ে, তাদের দক্ষতা তৈরি করে এবং তাদের সৃজনশীলতা চর্চার সকল পথ উন্মুক্ত করে তাদেরকে দেশ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করতে পারি, তাহলেই এই বছরটি এবং আগামী সব বছর আমাদের হবে। না হলে না। কিন্তু আমাদের তারুণ্যচিত্রটি খুব কি আশাবাদী করে আমাদের? একদিকে তরুণেরা প্রত্যাশিত মানের ও মাত্রার শিক্ষা পাচ্ছে না; অন্যদিকে মাদক, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা, জঙ্গিবাদ এবং বেকারত্বের ফাঁদে পড়ে তাদের জীবনীশক্তি এবং অনেকের জীবন ধ্বংস হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যেসব দেশ দ্রুত উন্নতির পথে যাচ্ছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া অথবা চীন, তারা তরুণদের পেছনে বিশাল বিনিয়োগ করছে, তাদের সকল জাতীয় কর্মকাণ্ডের ও মনোযোগের কেন্দ্রে তাদের রেখেছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার বড় সংখ্যাই তরুণ। তাদের দিকে আমাদের সকল মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। ২০১৮ সালে যদি আমরা সত্যিকারভাবে তরুণবান্ধব দেশ হওয়ার একটি শপথ নিতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের এগিয়ে যাওয়া শুরু হবে।

২০১৮ সালে নতুন কিছু প্রত্যাশাও আমাদের তালিকায় যুক্ত হবে। আমরা জানি, এ বছরটি হবে নির্বাচনের বছর। নির্বাচন বলতে আমাদের চোখে যে প্রত্যাশার ছবিটি ভেসে ওঠে তা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ উৎসবমুখর একটা পরিবেশের, যেখানে প্রত্যেক ভোটার নিশ্চিন্তে তার ভোটের অধিকার প্রয়োগ করবেন এবং সংখ্যাগুরুর পছন্দের প্রার্থীই বিজয়ী হবেন। কিন্তু বাস্তবের ছবিটি খুবই ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীত। নির্বাচন মানে হানাহানি, রক্তপাত, ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই। নির্বাচন হচ্ছে সহিংসতার এক উৎকট প্রকাশ। এর ফলে গণতন্ত্র কখনও তার কাঙ্ক্ষিতরূপে আত্মপ্রকাশ করে না। অথচ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যে আমরা করিনি, তা নয়।

২০১৮ সালে আমাদের বড় একটি প্রত্যাশা- নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক, গণতান্ত্রিক হোক, স্বচ্ছ হোক এবং জনগণের পছন্দের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাক।

২০১৮ সালে আমাদের আরও প্রত্যাশা থাকবে- আমাদের অর্থনীতি তার অগ্রযাত্রার পথেই থাকবে, আমাদের সংস্কৃতিচর্চা উন্মুক্ত থাকবে, আমাদের খেলাধুলায় অর্জনের পাল্লাটি আরও ভারী হবে।

তবে এ বছর আমাদের উদ্বেগ, ভয় এবং অস্বস্তির ভাগটাও কম নয়। গত বছর মিয়ানমার থেকে সে দেশের সেনাবাহিনী এবং উগ্রবাদী জনগোষ্ঠীর অত্যাচারে দশ লাখের মতো যে উদ্বাস্তু আমাদের দেশে আশ্রয় নিল, তাদের আমরা ফেরত পাঠাতে কি পারব? না, পুশব্যাক ধরনের ফেরত পাঠানো নয়, বরং তারা যাতে জীবন ও জীবিকার নিশ্চিত অধিকারসহ সকল নাগরিক এবং মানবাধিকারের সবগুলি নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারে- সেই নিশ্চয়তাসহ ফেরত পাঠানো। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বড় এক বিপর্যয়ের উদ্বেগ থেকেই যাবে। একে তো দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে সামাজিক ভারসাম্যে একটা জটিলতা সৃষ্টি হবে; অন্যদিকে পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা শুধুই বাড়বে।

পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রশ্নে বড় আরেকটি উদ্বেগের বিষয় আমাদের চিন্তায় প্রাধান্য পায়। আমাদের শহরগুলিতে ও তাদের আশপাশে জলাশয় এবং জলাভূমি নিরুদ্দেশ হচ্ছে, গ্রামগুলিতে হারিয়ে যাচ্ছে খালবিল, নদী; হাওরগুলিতে পলি জমে ভরাট হচ্ছে, নদীগুলি ভীষণরকম দূষণে পড়েছে, অরণ্য-জঙ্গল হারিয়ে যাচ্ছে, খেলার মাঠ দ্রুত উধাও হচ্ছে। সবুজভুক এবং মাঠ-প্রান্তরখেকো হিসেবে, নদীর প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরাই বোধ হয় পৃথিবীর শীর্ষে। ২০১৮ সালে পরিবেশ কি থাকবে আমাদের কুঠার আর কেমিক্যালের নানা মারণাস্ত্রের নিচে?

২০১৮ সালে কি অনেক মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরবে না? গুম হয়ে যাবেন কিছু মানুষ, যারা ভিন্নমতের অথবা রাজনীতির চর্চা করেন? শিশুরা নির্যাতিত হতে থাকবে, নারীরা লাঞ্ছিত হতে থাকবেন? নাকি এসব ঘটনার লাগামে টান পড়বে, অতীতের বিষয় হবে গুম, অপহরণ ইত্যাদি ২০১৮ সালে?

উদ্বেগ আছে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে, নানান নতুন রোগ-বালাইয়ের বিস্তার নিয়ে (২০১৭ সালের চিকুনগুনিয়া কি আবার ফিরবে এ বছর?), দারিদ্র্যের বিস্তার নিয়ে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশাগুলি একটু একটু পূরণ করতে পারি, তাহলে উদ্বেগগুলি দূর করার ক্ষেত্রটাও প্রস্তুত করতে পারি। সে লক্ষ্যেই এগোতে হবে আমাদের ২০১৮ সালে।

সমকালের সকল পাঠকসহ দেশের সকল মানুষ, দেশের বাইরে থাকা সকল বাঙালির জন্য ২০১৮ সাল হোক এক স্বর্ণবছর। বিশ্বের মানুষও সুখী হোক। প্যালেস্টাইনের শিশুদের জন্য এক বিশেষ প্রার্থনা থাকল আমাদের।

আরও পড়ুন

আতাউরকে নিয়ে বিব্রত বিএনপি

আতাউরকে নিয়ে বিব্রত বিএনপি

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএন-সিসি) নির্বাচন স্থগিতাদেশ দেওয়ার রিট আবেদনকারী ...

এত অস্ত্র বৈধ নাকি অবৈধ

এত অস্ত্র বৈধ নাকি অবৈধ

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে না হতেই বৈধ-অবৈধ অস্ত্র দেখা যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ...

শান্তি চায় নাগরিক সমাজ

শান্তি চায় নাগরিক সমাজ

নারায়ণগঞ্জকে যারা সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে, মঙ্গলবারের ঘটনাও ...

এই 'অভিজ্ঞতা' দিয়ে কী করবে চট্টগ্রাম বন্দর

এই 'অভিজ্ঞতা' দিয়ে কী করবে চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবালকে বদলি ...

আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিভেদে সুযোগ নিতে চায় জাপা

আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিভেদে সুযোগ নিতে চায় জাপা

নৌকার আসন হিসেবে পরিচিত হলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) ...

 'মানুষ বিপদে পড়ার ভয়ে প্রতিবাদ করছে না'

'মানুষ বিপদে পড়ার ভয়ে প্রতিবাদ করছে না'

ক্রমশ মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছে। প্রতিবাদ করছে না ...

ভাড়া বিমানে খাবার পৌঁছালো রেস্টুরেন্ট

ভাড়া বিমানে খাবার পৌঁছালো রেস্টুরেন্ট

আবাসস্থলের আশেপাশে পছন্দের রেস্টুরেন্টের কোনো শাখা না থাকায়, অথবা ডেলিভারি ...

পদ্মায় আরেকটি স্প্যান বসছে রোববার

পদ্মায় আরেকটি স্প্যান বসছে রোববার

পদ্মা সেতুতে আরেকটি স্প্যান বসানো হবে আগামী রোববার। সেতুর জাজিরা ...