তদারকির দায়িত্ব কার

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসক অনুপস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উপজেলায় পদায়ন করা হলে চিকিৎসকরা কর্মস্থলে থাকতেই চান না। কেউ বিনা অনুমতিতে ছুটি নিয়ে অনুপস্থিত থাকছেন, আবার কেউ যোগদান করে আর কর্মস্থলে কোনোদিন যাননি। কেউ কেউ পালা করে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক চিকিৎসক উচ্চ পর্যায়ে তদবির করে পছন্দমতো জায়গায় বদলি হয়ে চলে যাচ্ছেন। এতে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বারবার গ্রামে কর্মস্থলে চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করার তাগিদ দিলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

সর্বশেষ ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে যে ১১০ চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ এখনও যোগদান করেননি। অনেকে বদলি ঠেকাতে মন্ত্রণালয়ে তদবির করছেন। কয়েকজনের বদলির আদেশ এরই মধ্যে বাতিলও হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কয়েকজন নেতা ঢাকার বাইরে বদলি করা কয়েকজন চিকিৎসকের বদলির আদেশ বাতিল করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে একটি সূত্র সমকালকে নিশ্চিত করেছে। ওই নেতারা উৎকোচের বিনিময়ে ড্যাব নেতাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে লবিং-তদবির করছেন বলেও জানা গেছে। 


এ অবস্থায় উপজেলায় চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা এবং সিভিল সার্জনের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন চিকিৎসকরা।


চিকিৎসকদের কর্মস্থলে রাখতে না পারার ব্যর্থতা কার- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকরা কর্মস্থলে উপস্থিত আছেন কি-না, তা কয়েকটি স্তরে তদারক করা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র তদারক করেন। তার ওপর সিভিল সার্জন জেলার সব উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড তদারক করেন। সিভিল সার্জন বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও পুরো বিভাগের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা তদারক করেন। সারাদেশের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও  পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তাদের তদারক করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সর্বশেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।


অন্তত পাঁচ সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও জনবল সংকটের বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত চিঠি পাঠিয়ে অবহিত করেন। প্রতি মাসে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।


নেত্রকোনার সিভিল সার্জন ডা. তাজুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, দুর্গম ও হাওর এলাকা হওয়ার কারণে চিকিৎসকরা এসব উপজেলায় আসতে চান না। আবার পদায়ন করা হলেও প্রেষণে অন্যত্র চলে যান। অথবা বিনা অনুমতিতে ছুটিতে চলে যান। চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


সংশ্নিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে ডা. সমীর কান্তি সরকার যোগদানের পরই কাজকর্মে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। দায়িত্ব পালনে তার ব্যর্থতার কারণে বিভাগীয় পরিচালকদের কাছে বিভাগীয় বদলি, পদায়ন করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এখন বিভাগীয় পরিচালক বিভাগের যে কোনো কর্মস্থলে চিকিৎসক-কর্মকর্তাকে বদলি করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তদবির করে তা বাতিল করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিভিল সার্জনদের মাসোয়ারা দিয়ে চিকিৎসকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। এ ছাড়া বিভাগীয় পরিচালক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও যথাযথভাবে তদারক না করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর সম্প্রতি ডা. সমীর কান্তি সরকারকে পরিচালকের (প্রশাসন) পদ থেকে সরিয়ে জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের লাইন ডিরেক্টর করা হয়েছে।


পরিচালকের (প্রশাসন) দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ডা. সমীর কান্তি সরকার সমকালকে জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজে গতিশীলতা আনার জন্যই বিভাগীয় পরিচালকদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসক উপস্থিত আছেন কি-না, তা তদারকির জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) সম্মিলিতভাবে কাজ করেন। কর্মস্থলে অনুপস্থিত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা স্থানীয় প্রশাসনের। একই সঙ্গে অনুপস্থিত চিকিৎসকদের তালিকা তারা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে পাঠাতে পারেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসন তদারক না করলে অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় চাইলেও চিকিৎসকদের উপজেলার কর্মস্থলে রাখা সম্ভব হবে না।


ডা. সমীর কান্তি সরকার অভিযোগ করে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসকদের বদলি করলেও উচ্চ পর্যায়ে লবিং-তদবির করে তারা পছন্দমতো কর্মস্থলে চলে আসেন। এমন অনেক ভিআইপি তদবির করেন যে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের তা রক্ষা না করে উপায় থাকে না। গ্রামে চিকিৎসকদের ধরে রাখতে না পারার জন্য এ ধরনের তদবির একটি বড় ধরনের সমস্যা বলে মনে করেন তিনি।


পরিচালক বলেন, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের ধরে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রামের কর্মস্থল চিকিৎসকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তখন সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন তিনি। 


নতুন পরিচালকের (প্রশাসন) দায়িত্ব পাওয়া ডা. এ বি এম মুজাহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি সরেজমিনে ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা সফরে যাচ্ছেন। কর্মস্থলে অনুপস্থিতির দায়ে এরই মধ্যে ১০ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বেতন-ভাতা বন্ধ থাকবে।


পরিচালক আরও বলেন, গ্রামের কর্মস্থলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ঝটিকা অভিযান চালানো হবে। কর্মস্থলে পাওয়া না গেলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিষয় : চিকিৎসক

পরবর্তী খবর পড়ুন : কর্মস্থলে থাকেন না ৬০% চিকিৎসক

আরও পড়ুন

নেইমারের অভিনয় ধরা পড়লো ভিডিওতে

নেইমারের অভিনয় ধরা পড়লো ভিডিওতে

নেইমারও ম্যাচের নায়ক হয়েছেন। কিন্তু পার্শ্ব নায়ক। তবে ম্যাচের ৭৮ ...

গণগ্রেফতার বন্ধের দাবি হাসান সরকারের

গণগ্রেফতার বন্ধের দাবি হাসান সরকারের

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের পরিবেশ নির্বিঘ্ন করতে গণগ্রেফতার বন্ধের ...

নাইজেরিয়ার দুর্দান্ত দু্ই গোল

নাইজেরিয়ার দুর্দান্ত দু্ই গোল

ভোলগোগ্রাদে শুক্রবার রাত ন'টার ম্যাচে নাইজেরিয়ার জয় আর আইসল্যান্ডের হার ...

জিততে গিয়ে বদনাম যেন না হয়: প্রধানমন্ত্রী

জিততে গিয়ে বদনাম যেন না হয়: প্রধানমন্ত্রী

স্থানীয় সরকারের নির্বাচনসহ সংসদের উপনির্বাচনগুলোকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে ...

রাষ্ট্রপতিকে নন-এমপিও শিক্ষকদের স্মারকলিপি

রাষ্ট্রপতিকে নন-এমপিও শিক্ষকদের স্মারকলিপি

প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিতে রাষ্ট্রপতি ...

নেইমারের এক গোলে দুই রেকর্ড

নেইমারের এক গোলে দুই রেকর্ড

রাশিয়া বিশ্বকাপে শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গে কোস্টারিকার বিপক্ষে জয়টা ছিনিয়ে এনেছে ...

ফতুল্লায় ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে খেলা দেখলেন রাষ্ট্রদূত

ফতুল্লায় ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে খেলা দেখলেন রাষ্ট্রদূত

ব্রাজিলের 'ফ্যান কার্ড' নিয়ে প্রিয় দলের খেলা দেখতে এরই মধ্যে ...

কর্মচারি হয়ে নগরবাসীর সেবা করতে চান জাহাঙ্গীর

কর্মচারি হয়ে নগরবাসীর সেবা করতে চান জাহাঙ্গীর

ভোটে জিতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে নয়, কর্মচারি হয়ে ...