দক্ষ চালক তৈরি করবে কে

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০১৮     আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

সারাদেশে মোটরসাইকেল বাদে নিবন্ধনকৃত যানবাহন ১৫ লাখ ৯ হাজার ৬০৪টি। এসব বাস, ট্রাক, প্রাইভেট গাড়ি, ট্রাক ইত্যাদির বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে সাত লাখ ১২ হাজার ৩৩৬ জনের। বাকি সাত লাখ ৯৭ হাজার ২৬৮টি নিবন্ধনকৃত যানবাহন চলছে অদক্ষ, অশিক্ষিত লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে।

এই ছোট্ট পরিসংখ্যানই বলে দেয়, অদক্ষ, অশিক্ষিত লাইসেন্সবিহীন চালকই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। আর দক্ষ চালকের অনুপস্থিতিতে নিরাপদ সড়কের দাবিও অকার্যকর হতে বাধ্য। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দক্ষ চালক তৈরির এ উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। তাদের মতে, দক্ষ চালক তৈরির জন্য দেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। চালকদের সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি সম্মানজনক অর্থনৈতিক সুবিধাও দিতে হবে- যাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষিত মানুষ এ পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী হন। কারণ সামাজিকভাবে অবমূল্যায়ন করা হয় বলেই অনেকে এমএ পাস করে পিয়নের চাকরি করলেও এসএসসি পাস করে ড্রাইভারের চাকরি করতে চান না।

দক্ষ ও অদক্ষ চালকের চালচিত্র : বিআরটিএ'র হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকের সংখ্যা সাত লাখ ৯৭ হাজার ২৬৮। তবে মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্যা বলেন, বিআরটিএ'র এই হিসাব যথার্থ নয়। সমিতির হিসাবে লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা ১৫-১৬ লাখ।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, সারাদেশে নিবন্ধনকৃত মোট যানবাহনের সংখ্যা বর্তমানে ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ৪৬০টি। এর মধ্যে নিবন্ধনকৃত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২০ লাখ ৭২ হাজার ৮৫৬টি। নিবন্ধনকৃত মোট যানবাহন থেকে নিবন্ধনকৃত মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাদ দিলে বাস, ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টেম্পো, প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য বাহনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৯ হাজার ৬০৪টি। বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে সাত লাখ ১২ হাজার ৩৩৬টির চালকের। অর্থাৎ অন্য সাত লাখ ৯৭ হাজার ২৬৮টি নিবন্ধনকৃত যানবাহন চলছে অদক্ষ ও অশিক্ষিত লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে।

আবার নিবন্ধনকৃত ২০ লাখ ৭২ হাজার ৮৫৬টি মোটরসাইকেলের মধ্যে লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে ১১ লাখ ৫৭ হাজার ৪৮০টির বিপরীতে। বাকি ৯ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৬টির বিপরীতে কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া হয়নি। এ হিসাব অনুযায়ী সাত লাখ ৯৭ হাজার ২৬৮টি গাড়ি ও ৯ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৬টি মোটরসাইকেলসহ মোট ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬৪৪টি যানবাহন চলছে লাইসেন্স ছাড়াই। সড়ক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই এসব যানবাহনের অদক্ষ চালকদের। তাদের অনেকেই আবার কোনো না-কোনোভাবে মাদকাসক্ত।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, ২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মোট ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ৪৬০টি যানবাহন নিবন্ধন করা হয়। একইভাবে ২০০৮ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪১৬টি ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়।

মোট ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬টি ড্রাইভিং লাইসেন্সের মধ্যে পেশাদার আট লাখ ৩০ হাজার ৯০টি ও অপেশাদার ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৬টি। পেশাদারদের জন্য হালকা, মাঝারি, ভারী, থ্রি-হুইলার, টেম্পোসহ অন্যান্য যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

হালকা যানবাহনের মধ্যে রয়েছে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও টেম্পো। মাঝারি যানবাহনের মধ্যে রয়েছে মিনিবাস। ভারী যানবাহনের মধ্যে রয়েছে বাস, কোচ, ট্রাক, লরি ইত্যাদি।

পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই :এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পরিবহন খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি যেন নিত্যদিনের ঘটনা। যা থেকে মুক্তি পেতে দক্ষ চালক তৈরির বিকল্প নেই। অথচ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, প্রয়োজনীয় দক্ষ চালক তৈরির জন্য তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। পর্যাপ্ত দক্ষ চালক তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগে সারাদেশের প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর জন্য মালিক সমিতির নেতারা বার বার সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির (মালিক সমিতি) মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্যা সমকালকে বলেন, দক্ষ চালক তৈরির জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর জন্য সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বার বার সুপারিশ করা হলেও এক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি জানান, বর্তমানে সড়কের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে লাইসেন্সবিহীন চালকদের মধ্য থেকে তুলনামূলক দক্ষদের বাছাই করা হবে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন সমকালকে বলেন, 'নিবন্ধনকৃত গাড়ির তুলনায় চালকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারিভাবে ফ্রি প্রশিক্ষণ ও ফ্রি লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। এই পেশায় উৎসাহিত করতে চালকদের প্রণোদনা দিতে হবে।'

এদিকে বেসরকারিভাবে বা স্ব-উদ্যোগে ট্রেনিং নেওয়া চালকদের দক্ষতা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। নিসচার চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, "বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাসস্ট্যান্ড বা তার আশপাশের অভাবী ও অশিক্ষিত শিশু-কিশোররা গাড়িচালকের (ওস্তাদ) কাছে যায়। তাকে পান, বিড়ি খাওয়ায়। চা এনে দেয়। গাড়ি পরিস্কার করে। এভাবে একসময় গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সামনে-পেছনে করে। এভাবে একটু-আধটু চালাতে চালাতে কিশোরটি গাড়ি চালাতে থাকে। ওস্তাদ ঘুমায় আর বলে 'তুই চালা'। এদের অনেকে মাদকাসক্ত। নৈতিক জ্ঞান নেই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। অদক্ষ চালকদের সড়ক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। এ কারণে সড়কের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না।"

বিআরটিএ অবশ্য জানাচ্ছে, প্রশিক্ষিত চালক তৈরির জন্য ঢাকাসহ দেশের সব জেলাতেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলার কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ৭-৮টি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জায়গাও কেনা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ফ্রি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে : বর্তমানে চালকদের প্রায় সময়ই আট ঘণ্টার বদলে ১৪-১৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে হয়। দুই ঈদের সময় কর্মঘণ্টা আরও বেড়ে যায়। ফলে চালকদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ বাস কোম্পানিই চালকদের মাসিক ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে থাকে। আবার রাজধানী ঢাকার প্রায় সব বাসেই চালক ও হেলপারদের মজুরি দেওয়া হয় ট্রিপ ভিত্তিতে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানও ভঙ্গুর। তাই এই পেশাজীবীদের মূল্যায়নও হয় না তেমন।

বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী সমকালকে বলেন, গাড়ি চালকদের সামজিক মর্যাদা নেই বললেই চলে। তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। সবচেয়ে পরিশ্রমী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলেও তারা ঝুঁকিভাতা পান না। এসব কারণে মানুষ এ পেশায় আসতে চান না।' তিনি বলেন, 'সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে এই পেশায় টানতে হবে। তবেই সড়কে সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে। সড়ক দুর্ঘটনাও রোধ করা সম্ভব হবে।' তিনি আরও বলেন, 'সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা না থাকায় মানুষ এমএ পাস করে পিয়নের চাকরি করেন; কিন্তু এসএসসি পাস করে ড্রাইভারের চাকরি করতে চান না।'

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাই দক্ষ চালক তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান সমকালকে বলেন, 'যেসব গাড়ির নিবন্ধন করা হয়েছে, অথচ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া হয়নি, তাদের লাইসেন্স নিতে বাধ্য করা হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ যাতে গাড়ি চালাতে না পারে, তার জন্য বিআরটিএ'র নিজস্ব মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।' আশা করা হচ্ছে, এসব উদ্যোগে চালকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে লাইসেন্স নেওয়ার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন।

আরও পড়ুন

শেখ হাসিনার বিরোধীরা ঢাকায় বসে ষড়যন্ত্র করছে: কাদের

শেখ হাসিনার বিরোধীরা ঢাকায় বসে ষড়যন্ত্র করছে: কাদের

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরোধীরা ঢাকায় বসে 'ষড়যন্ত্র' করছে বলে মন্তব্য ...

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে রসুন

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে রসুন

রান্নার অন্যতম উপকরণ রসুন স্বাস্থ্যের জন্য দারুন উপকারী। এতে বিভিন্ন ...

কয়লাখনি দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনে শুনানি ২৫ অক্টোবর

কয়লাখনি দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনে শুনানি ২৫ অক্টোবর

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের ...

মোংলা ও বুড়িমারী বন্দরে শতভাগ দুর্নীতি: টিআইবি

মোংলা ও বুড়িমারী বন্দরে শতভাগ দুর্নীতি: টিআইবি

মোংলা সমুদ্রবন্দর ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের সব পর্যায়ে শতভাগ দুর্নীতি হয় ...

গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ

গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ

বকেয়া বেতনের দাবিতে গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ...

মিরপুরের কালশি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান

মিরপুরের কালশি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান

রাজধানীর মিরপুরের কালশী বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী। রোববার ...

ছোট ভাইকে হাতুড়িপেটা করে মারল বড় ভাই!

ছোট ভাইকে হাতুড়িপেটা করে মারল বড় ভাই!

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় পারিবারিক বিরোধের জের ধরে ছোট ভাইকে হাতুড়ি-বাটাল ...

২৬ বছরের অভিনেত্রীর সঙ্গে ৭০ বছরের মহেশ ভাটের প্রেম!

২৬ বছরের অভিনেত্রীর সঙ্গে ৭০ বছরের মহেশ ভাটের প্রেম!

এক তরুণ অভিনেত্রীর কাঁধে মাথা রেখেছেন খ্যাতিমান পরিচালক মহেশ ভাট। ...