রাজধানী

বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল শিকড় বাংলাদেশে

সাক্ষাৎকার : পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোস

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭      

এস এম মুন্না

'কেন যে হিন্দুস্তানি বা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বলা হয়, তা বুঝি না। কারণ প্রায় ৬০ শতাংশ সঙ্গীতগুরুরই মূল শিকড় এই বাংলাদেশে।' বললেন পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোস। জানালেন, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত সাধনায় স্বর্গীয় আনন্দ পাওয়া যায়।

গোলাম বন্দেগি খান বাঙ্গাস ঘরানার সরোদ বাজিয়ে ভারতীয় প্রখ্যাত পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোস। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সরোদ বাজিয়েছেন তিনি। তবে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবে এসেছেন এবারই প্রথম। অবশ্য ২০১১ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির একটি উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন বড় ভাই কুমার বোসের সঙ্গে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমণ্ডির শেখ কামাল আবাহনী মাঠে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত পঞ্চ রজনীর ষষ্ঠ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনের সর্বশেষ পরিবেশনায় অংশ নেন তিনি।

তার সঙ্গীতচর্চার শুরু অবশ্য তবলা দিয়ে। তবে সরোদই এখন তার যত সাধনা। গান লেখেন, সুর করেন। চলচ্চিত্রে ব্যবহার হচ্ছে সেসব গান। বের হয়েছে বেশ কিছু অ্যালবাম। মা ভারতী বোসের অনুপ্রেরণায় পুরোদস্তুর সরোদশিল্পী হয়ে উঠেছেন তিনি। ছাত্র থাকার সময় চর্চা শুরু করেন তবলার পণ্ডিত দাদা কুমার বোস ও ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের কাছে। রেওয়াজের সময় ওস্তাদ শুরুতে বলতেন তবলা বাজাতে। তবে দেবজ্যোতি একদিন বলে ফেললেন, 'সরোদ শিখতে চাই।' এভাবে শুরু হলো সরোদ রেওয়াজ। কালক্রমে তিনি খ্যাতি পেলেন সরোদের পণ্ডিত হিসেবে।

বেঙ্গলের মঞ্চে সরোদের দেবজ্যোতি এসেছিলেন পণ্ডিত রনু মজুমদারের বাঁশির সঙ্গে যুগলবন্দি হয়ে। সাড়ে নয় বছর ধরে এ দু'জনের যুগলবন্দি সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সন্তুর শিল্পী শিবকুমার শর্মা ও বাঁশিশিল্পী হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার পর এমন একটি জুটি গড়ে ওঠার পেছনে অবদান রয়েছে পণ্ডিত কুমার বোসের। এ জুটির অনবদ্য এক পরিবেশনা দেখলেন গতকাল কয়েক হাজার সঙ্গীতপিপাসু মানুষ।

দেবজ্যোতি বোস উঠেছেন হোটেল সোনারগাঁওয়ে। সমকালের মুখোমুখি হয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চার নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বললেন তিনি। 'সংস্কৃতি' সম্পর্কে তার নিজের ধারণা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বললেন, 'নিজে করে খাওয়াটা প্রকৃতি। অন্যেরটা কেড়ে খাওয়াটা বিকৃতি। আর ভাগ করে খাওয়াটা সংস্কৃতি।' দেবজ্যোতি বললেন, 'পরিমাণগতভাবে শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়লেও গুণগত সুশিক্ষায় প্রকৃত জ্ঞানীর সংখ্যা বাড়েনি। পুঁথিগত শিক্ষায় অনেকেই শিক্ষিত হচ্ছেন, তবে তাদের মধ্যে লেশমাত্র 'সংস্কৃতিবোধটুকুও' থাকছে না। কীভাবে ওপরে ওঠা যায় তাই নিয়ে ব্যস্ত সবাই। এখনকার অভিভাবকদের মন-মানসিকতা অন্যরকম। 'সন্তানকে প্রথম হতে হবে, পিছিয়ে থাকলে হবে না'- এ রকম মানসিকতার কারণে মানবিকতার বোধ পোক্তভাবে প্রোথিত হচ্ছে না তাদের ভেতর। এভাবে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। আয় যেভাবে হয়, সংস্কৃতিচর্চাও এখন সেভাবেই হচ্ছে। অথচ সংস্কৃতি হওয়া উচিত শ্রোতার মনের ভেতর থেকে।'

দেবজ্যোতির বাবা তবলার দিকপাল বেনারস ঘরানার পণ্ডিত কণ্ঠে মহারাজের শিষ্য ছিলেন। তবলা নিয়ে ব্যস্ত বাবা তাদের সময় দিতে পারেননি, মা-ই তার শিল্পী হওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন বলে জানালেন তিনি। একদিন তার ওস্তাদজি বললেন, 'তুমি পড়াশোনা আর সরোদের মধ্যে কোনটাকে প্রাধান্য দেবে?' দেবজ্যোতি বললেন, 'সরোদ।' ব্যস, দিল্লিতে ওস্তাদের কাছাকাছি থাকা শুরু হলো। অনেক যত্ন নিয়ে শেখাতেন ওস্তাদ। দেবজ্যোতি বুঝলেন, ওস্তাদের সংস্পর্শে থাকা কেন জরুরি। শুধু রেওয়াজের সময়েই নয়, স্টেজে, বাড়িতে, ক্লাসে গল্পের ছলে যে আড্ডা হতো, তাতেও থাকত শিখে নেওয়ার নানা উপাদান। শিখতে শিখতেই একসময় দেবজ্যোতি পেয়ে গেলেন তরুণ শিল্পীদের জন্য সম্মানসূচক হাফিজ আলী খাঁ পুরস্কার। তিনি বলেন, 'অনেক সৌভাগ্য, আমাদের বাড়িতে আমরা ওস্তাদ রবিশঙ্কর, আলী আকবর, বিলায়েৎ আলী খাঁ, আমজাদ আলী খাঁ সাহেব- এ চার কিংবদন্তিকে খুব কাছ থেকে পেয়েছি। এ কারণেই হয়তো সরোদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। আমাদের বাড়িটা এমন একটা জায়গায় যেখানে সব কিংবদন্তিকে রাস্তার ওপর স্ট্রিট ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতে দেখেছি।'

দেবজ্যোতি বোস বললেন, 'এখনকার ছেলেমেয়েদের সুযোগ অনেক বেশি। তারা এখন প্রযুক্তির অনেক কাছাকাছি। অথচ এ পেশায় অনিশ্চয়তা বেশি। সেটাও অস্থিরতার কারণ। এর পরও উচ্চাঙ্গসঙ্গীত যারা ভালোবাসছে, তাদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া দরকার। গণমাধ্যম, মা-বাবা- সবারই উচিত ওদের উৎসাহ দেওয়া।' তিনি জানান, রাজনৈতিক কারণে ভাগাভাগি হলেও সঙ্গীত ভাগাভাগি করা যায় না। মার্গ সঙ্গীতের ভালো দিক হলো, যে পূর্বপুরষরা এটি সৃষ্টি করেছেন, তারা খুব অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে সঙ্গীত ও ছন্দ এক জায়গায় করেছেন। তাই মার্গ সঙ্গীতের একটি জায়গায় গিয়ে কোনো না কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি তিনি এও মনে করেন, এখন মার্গ সঙ্গীত শিল্পীরা শুধু শিল্পী নন, ধনকুবেরও হয়ে গেছেন। তারা ইচ্ছা করলেই অনেক কিছু করতে পারেন।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেবজ্যোতি বলেন, 'এ এক অন্যরকম আয়োজন। ভাবতে ভালো লাগছে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় উচ্চাঙ্গবিষয়ক সঙ্গীত আয়োজন। এতে করে এ দেশ অনেক ভালো ভালো শিল্পী পাচ্ছে, যারা ভারতে এবং সারা পৃথিবীতে গানবাজনা করবে।' তিনি বলেন, 'যে কেউ গানবাজনা করে ভাবতে পারে যে, আমি টিকে থাকব। সে ক্ষেত্রে একটি যুক্তিও আছে, আমরা তো সবাইকে বিদ্যালয়ে পাঠাই, সবাই তো হুমায়ূন আহমেদ বা জগদীশচন্দ্র বসু হয় না। তবুও তো পাঠাই। কারণ এটি একটি শিক্ষাগত যোগ্যতা। সে রকম সঙ্গীত এবং ছন্দ যদি মানুষের মধ্যে না থাকে, তাহলে আমরা কিন্তু একটা কাজ করতে না পারলে বলে উঠি, 'তুমি কি তালকানা'? অর্থাৎ ছন্দ সত্যি যদি মানুষের মধ্যে যায়, তাহলে জীবনও কিন্তু অনেক ছন্দময় হয়ে ওঠে।' সঙ্গীত শেখার বিষয়ে অভিভাবকদের মানসিকতার উন্নয়নের কথাও বলেন এ পণ্ডিত।

উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের কোন দিকটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে- এ প্রশ্নের জবাবে দেবজ্যোতি বোস বলেন, 'আমাকে খুব টানে এই মার্গ সঙ্গীত। মার্গ সঙ্গীতের একজন প্রতিনিধি হতে পেরে আমি গর্বিত। পদ্মশ্রী পদক পাইনি বলে আফসোস নেই। আফসোস, আমজাদ আলী খাঁর মতো বাজাতে পারি না।'

চার পুরুষ ধরে সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত দেবজ্যোতি বোস পরিবার। বাবা বিশ্বনাথ বোস তবলার কিংবদন্তি ছিলেন। মা ভারতী বোস নিজের সঙ্গীত জীবন উৎসর্গ করেছেন সন্তানদের জন্য। বড় ভাই কুমার বোস তবলার দিকপাল। মেজ ভাইও গান করেন, হারমোনিয়াম বাজান।

আরও পড়ুন

সাতক্ষীরায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে আটক ৬৩, ইয়াবা-ফেনসিডিল উদ্ধার

সাতক্ষীরায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে আটক ৬৩, ইয়াবা-ফেনসিডিল উদ্ধার

সাতক্ষীরা জেলাব্যাপী পুলিশের বিশেষ অভিযানে জামায়াত-শিবিরের ছয় নেতাকর্মীসহ ৬৩ জনকে ...

জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার উপায়

জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার উপায়

র‌্যাবিসকে বাংলায় জলাতঙ্ক বলা হয়। অর্থাৎ জলে যার আতঙ্ক। এই ...

সৌম্য-ইমরুল কি খেলবেন আজ

সৌম্য-ইমরুল কি খেলবেন আজ

বিমানবন্দর থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১১টা। আজ দুবাই ...

গোপালগঞ্জে বাসচাপায় শিশু নিহত

গোপালগঞ্জে বাসচাপায় শিশু নিহত

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে বাসচাপায় পাপ্পী দাস (৭) নামে এক শিশু নিহত ...

সরকারকে আলোচনার আলটিমেটাম

সরকারকে আলোচনার আলটিমেটাম

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব দলের ...

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় টাইগারদের

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় টাইগারদের

গল্পে পড়া উঠের পিঠে চড়া সেই বেদুইনরা নাকি এখন শুধুই ...

বালুখেকোরা খুবলে খাচ্ছে সুরমা

বালুখেকোরা খুবলে খাচ্ছে সুরমা

সিলেটের প্রাণ সুরমা নদীকে খুবলে খাচ্ছে বালুখেকোরা। অথচ এই নদী ...

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা নিয়ে বিশ্বের সমর্থন চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা নিয়ে বিশ্বের সমর্থন চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সহযোগিতার জন্য ফের আহ্বান জানাবেন ...