চতুরঙ্গ

মফস্বলে সাংবাদিকতা

 প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৮      

 সাইফুল ইসলাম

সাংবাদিকদের অনেকেই ব্যাঙ্গ করে বলেন ‘সাংঘাতিক’। এ কথা দেশের রাজধানী ঢাকা শহরেও শোনা যায়, মফস্বল শহরের সাংবাদিকদের গায়ে তো এ তকমা শক্ত করেই সেঁটে আছে! অবশ্য ঢাকার সাংবাদিকদের একটি সুবিধা আছে, সেখানে খুব সহজেই লুকিয়ে থাকা যায় বিশাল জনারণ্যে। কিন্তু মফস্বল শহরে তা সম্ভব নয়। ছোট শহরে লোক সংখ্যা কম, একজন আরেক জনকে চিনতে পারে সহজেই। কে কী করছে, কোন ধান্ধাবাজী করে সংসার চালাচ্ছে তা জানা খুব কঠিন নয় কারো কাছেই। শহরের ফুটপাতে চায়ের দোকানগুলোতে সবারই সততা আর অসততার শ্রেণি বিভাগও হয়ে যায় সহজেই। তাই সেখানে অন্তত চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও কিছুটা মেনে চলতেই হয় জনগণকে। আর বর্তমান সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনেই করেন, অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়াতে হলে একটু আধটু এদিক সেদিক হতেই হয়। এটা না করলে অর্থকড়ি পাওয়া যায় না, চলে না সংসার। আর সুযোগ পেয়ে একটু এদিক সেদিক করতে গিয়েই মফস্বল সাংবাদিকরা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সাংঘাতিক।

একজন মফস্বল সাংবাদিক, ধরা যাক, নাম তার 'ক'; অনলাইন নিউজ পোর্টাল দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু। বয়স অল্প হওয়ায় পরিশ্রম করতে পারতেন, দ্রুত পৌঁছে যেতেন খবরের কাছে। আর তথ্য তুলে আনতে পারতেন ঘটনার গভীর থেকে। ভালো লিখতেন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এসব গুণে খুব সহজেই নামডাক ছড়িয়ে পড়ে তার। দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকেন। ঢাকার নামীদামী অনলাইন পোর্টাল, ভালো টেলিভিশন থেকে অফার পেতে থাকেন এবং তা লুফে নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করেন। সহজেই ছড়িয়ে পড়ে তার নামডাক। বাড়তে থাকে খাতির-যত্ন, প্রভাব। অন্য সাংবাদিকরা কেউ ঈর্ষা, কেউ সহযোগিতা করে। মফস্বল শহরে যা হয়, তার নেতৃত্বে একটি সাংবাদিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে সহজেই। জেলার এমপি, মন্ত্রী, ডিসি, এসপি সাহেবরা চিনে ফেলেন তাকে। কলেজের মেয়েরা তার সঙ্গে খাতির করে কথা বলে। অনেকেই জন্মদিন, পুজা, পার্বণ, উৎসবে উপহার দেন। আর এভাবে ক্ষমতাবান হয়ে এক সময় নেমে পড়েন ইট, বালু সাপ্লাইয়ের কাজে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন শিল্পপতি হওয়ার। কারণ, মফস্বল থেকে শিল্পপতি হয়ে ওঠাদের তো প্রথম ব্যবসাই হলো সরকারি দলের কর্মী হয়ে খাস জলমহাল থেকে মাটি বা বালি তুলে ঠিকাদারকে সরবরাহ করা। দেদার আসতে থাকে অর্থকড়ি। দেদার সে টাকা খরচও হয়। একে দেন, ওকে দেন। জুটে যায় অনেক ইয়ার-দোস্ত এমনকি চামচাও। তারপরও এতো টাকা দিয়ে কী করবেন 'ক'? এক সময় স্রেফ মজা করার জন্য তাকে ধরতে হয় ইয়াবা সেবন। ধীরে ধীরে নেশার মজা পেয়ে বসে তাকে, নেশায় বুঁদ হয়ে যান তিনি। 

পত্রিকা অথবা টিভি অফিস থেকে ফোন করে পাওয়া যায় না তাকে। নিউজ অথবা অ্যাসাইনমেন্ট সময় মতো পায়না অফিস। বিরক্ত হয়ে পড়ে পত্রিকা বা টিভি অফিস। যারা 'ক' এর কাছে থেকে নিউজের কপি নিয়ে পত্রিকায় পাঠিয়ে সাংবাদিকতা রক্ষা করেন তারাও আর তার ওপর ভরসা পান না। ছেড়ে যায় সাংবাদিকসহ অন্য বন্ধু-বান্ধবরা। এক সময় হেড অফিস থেকে চিঠি আসে ‘ইওর সার্ভিস ইজ নো লংগার রিকোয়ার্ড।’ মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, এসপির কাছে খাতির কমে যায়। দিশেহারা হয়ে পড়েন সাংবাদিক 'ক'। যে পরিবারকে একদিন অনেক কিছু দেবেন বলে ভেবেছিলেন এক সময়, সেই পরিবারেরই বোঝা হয়ে পড়েন তিনি। তার বাবা-মা, ভাই-বোন আফসোস ছাড়া আর করার কিছুই থাকে না। এভাবে মফস্বলের অনেক সাংবাদিকের মতো ‘সাংঘাতিক’ হয়ে ওঠেন 'ক'। এখন আর ক্ষমতাবানরা তার খোঁজ নেন না, বন্ধু-বান্ধবরাও এড়িয়ে চলেন তাকে।

এদেশের মানুষ অন্তত দু’টি পেশার মানুষের কাছে সততা আশা করে, পেশা দুটি হলো শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা। শিক্ষকরা মানুষকে শিক্ষা দেবেন, জাতিকে গড়বেন, এটাই তাদের কাজ বলে মনে করেন তারা। একইভাবে জনগণ মনে করে, সাংবাদিকরা ক্ষমতাহীন দূর্বল মানুষের বিবেক হয়ে কাজ করবেন। অন্যায় মানেই অন্ধকার, সাংবাদিকরা অন্যায় দেখলে তা টিভি বা পত্রিকায় প্রকাশ করে আলোতে নিয়ে আসবেন। সরকার সেই অন্যায়ের প্রতিকার করবে, এটাই জনগণ আশা করে। কিন্তু শিক্ষক বা সাংবাদিকরাও এ সমাজেরই মানুষ। তাদের মধ্যেও আছে লোভ-লালসা, ধনী হয়ে প্রভাবশালী হওয়ার ইচ্ছা। অন্তত অর্থনৈতিকভাবে নিজের পরিবারকে স্বচ্ছল করার আকাঙ্খা। আর এই লোভ সংবরণ করতে না পেরে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন প্রভাবশালীদের সাংবাদিক। হয়ে ওঠেন গণশত্রুও। 

আসলে সাংবাদিকতা বেকারত্ব দূরীকরণের পেশা নয়, মেধাবৃত্তিক পেশা। এজন্য রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সমাজ- সব বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হয়। থাকতে হয় জনগণকে নিয়ে জনগণের পক্ষে কাজ করার আগ্রহ। সেই সঙ্গে লেখালেখিতে পারদর্শীতা। কিন্তু মফস্বলে অনেকেই সাংবাদিকতা পেশায় আসেন সামাজিক অবস্থান বাড়াতে, কেউ কেউ ধান্ধাবাজী করতে। অনেকেই এ পেশায় এসেছেন বেকারত্ব দূর করতে। ঢাকাতেও এর ব্যতিক্রম নয়, তারা আসেন প্রভাবশালীদের হাত ধরে। ফলে তারা এ কাজ করতে গিয়ে ফাঁকিবাজী করেন। আবার কেউ কেউ  দ্রুত সফলতা চান। তাই চেষ্টা করেন গোজামিল দিয়ে পার হওয়ার। ফলে তারা একটি ভালো প্রতিবেদন তৈরিকে সফলতা মনে করেন না।  মনে করেন আরও উপরে ওঠাই সফলতা। আত্মীয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদি কারণে কেউ কেউ উপরে উঠতেও পারেন। আর এসব দৃষ্টান্ত হতাশ করে সৎ সাংবাদিকদের। আমার এক সাংবাদিক বন্ধু বলেন, কোলকাতায় সাংবাদিকদের অন্তত ৮০ শতাংশ লেখক; কিন্তু আমাদের দেশে? ২০ শতাংশও লেখালেখি করেন না। তারা সাংবাদিকতায় এসেছেন এই সাইন বোর্ড কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্য অথবা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য। সংবাদপত্র জগতে এতো আগাছার চাষবাস এ কারণেই। তাইতো সংবাদপত্র শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না, গড়ে উঠছে না সৎ সাংবাদিকতাও।

সাংবাদিকতা একটি বিশাল লড়াই। এটা সমাজ সংস্কারকের কাজ, সমাজ বিপ্লবীর দায়িত্ব পালন। কাজটি জনগণের আশা-হতাশা, লড়াইয়ে ওঠা-নামার সঙ্গে দোল খায়। জনগণের ওপর যারা আস্থা রাখতে পারেন না, তাদের পক্ষে সৎ সাংবাদিকতা অসম্ভব। জনগণকে নিয়ে এমন ভাবতে শিখতে হয় যে, আজ জনগণ ঝিম মেরে আছে। এ ঝিমানোর মধ্যে তারা ভাবছে, দেশটা এভাবে চলতে পারে কিনা? এর চেয়ে ভালো একটি দেশের স্বপ্ন দেখা যায় কিনা? এ ভাবনা থেকেই জনগণ আবার একটি ভালো দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখবে, মাঠে নামবে, লড়াই করবে। তখনই ভালো মানুষ যেমন সন্মান পাবে, তেমনি সৎ সাংবাদিকদের সন্মান বাড়বে। নির্ভয়ে লিখতে পারবে মনের কথা, স্বপ্নের কথা। তার আগে পর্যন্ত সাংবাদিকদের লড়াই শুধু টিকে থাকার, নিজেকে শান দিয়ে তৈরি করার লড়াই। যেমন লড়াই করছে এদেশের হাজারো ভালো মানুষ, সৎ মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক



  • কী অভিমান শহীদকন্যা মেঞ্জেরা বেগমের

    কী অভিমান শহীদকন্যা মেঞ্জেরা বেগমের


নাগরিকপঞ্জি বোঝাতে চায় বাংলাভাষী মানেই অনুপ্রবেশকারী!‌

 সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

আসামে নাগরিক বাছাইয়ের নামে যে কাজটি সরকারের নেতৃত্বে চলছে, সেটি ...

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে

 অজয় দাশগুপ্ত

১৫ আগস্ট, ১৯৭৬। আমরা দৃঢ়সংকল্প ছিলাম— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ...

১৫ আগস্ট ২০১৮

প্রিয় সারওয়ার ভাই, এই ঘুম আপনার পাওনা!

  অজয় দাশগুপ্ত

প্রিয় সারওয়ার ভাই, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে সাংবাদিকতা জীবনে কত ...

১৪ আগস্ট ২০১৮

অভিশাপ

 সুমন্ত আসলাম

রোববার দুপুর ১টা ৫৮ মিনিট।বনলতা সুইটসের সামনে এসে গাড়িটা থামতেই একগাদা ...

৩০ জুলাই ২০১৮