চতুরঙ্গ

একটি প্রাচীন রূপকথা

 প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৮ | আপডেট : ২৪ মে ২০১৮      

 সুমন্ত আসলাম

ধাক্কাটা একটু জোরেই লাগল। পুরো নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গেলেন মানুষটা। আলতো ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি আবার। অতিকায় স্বাস্থ্য এবং মেদবহুল একটা লোক হেঁটে যাচ্ছেন পা দুটো ঈষৎ ফাঁক করে। পেছনে আরও একজন, দু'হাতে বিশাল দুটি বাজারের ব্যাগ। উপচে পড়া খাদ্যসামগ্রী তাতে জানান দিচ্ছে- কারও কারও দিন বেশ ভালো যাচ্ছে আজকাল।

নিজের হাতের খালি ব্যাগটার দিকে তাকালেন মানুষটা। কয়দিন ধরে সকাল থেকে বৃষ্টি। আজও। মনে মনে তিনি ভাবলেন, কবিগুরু এমন বৃষ্টিময় দিনেই কি লিখেছিলেন- এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়...। মানুষটা মনে মনে আরও ভাবলেন- তারও কিছু কথা আছে, তারও কিছু বলার আছে। কিন্তু কাকে বলবেন কথাগুলো, কাকে শোনাবেন বৃষ্টিভেজা কাব্য, যে বৃষ্টি ছুঁয়েছে তার চোখ, যে বৃষ্টিতে মিশে গেছে তার ছলছল চোখের ভেজা প্রলেপ।

নিকেল উঠে যাওয়া হাতঘড়িটা মেলে ধরলেন তিনি চোখের সামনে। চল্লিশ মিনিট পার হয়েছে। বাজারের ভেতর ঘুরছেন তিনি। সেই রূপনগর থেকে হেঁটে এসেছেন এখানে। অপেক্ষাকৃত দাম যেখানে একটু কম, সেই মিরপুর ১ নম্বর বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি একবার ওপরের দিকে তাকালেন। সম্ভবত কাউকে দেখার চেষ্টা করলেন, পেলেন না, নিচু করে ফেললেন মাথা আবার।

কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গেলেন তিনি সবজি স্তূপ করা একটা সবজির দোকানে, দাঁড়ালেন সেটার সামনে। একটু থামলেন। সবকিছু দেখলেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলাতেই জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাই, শসা আজ কত করে?'

পাশের ছোট বালতি থেকে হাতে সামান্য পানি নিয়ে নান্দনিক ভঙ্গিতে শসায় ছিটালেন দোকানদার। মানুষটার দিকে তাকিয়ে তাকে পরিমাপ করার চেষ্টা করলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর কিছুটা নিস্পৃহ গলায় বললেন, 'পঞ্চাশ।'

লালচে হওয়া কিছুটা চামড়া খসা শসার ঝাঁকা থেকে চোখ সরিয়ে পাশের ঝাঁকাটা ইশারা করলেন মানুষটা, 'আমি ওই শসাগুলোর দাম জানতে চেয়েছিলাম?'

'ওগুলা বিরুলিয়ার। একেবারে কচি, তাজা। সকালেই তুইল্যা আনা হইছে। একদাম ষাইট।'

কচি শসায় কামড় দিলে কচ করে শব্দ হয়। শব্দটা শুনলেন তিনি, তবে মুখে নয়, বুকের ভেতর। সেই শব্দ মিলিয়ে না যেতেই হাতের একটু আঙুল তাক করলেন কোনার ঝাঁকাটার দিকে, 'বেগুন-।'

কথা শেষ করতে পারলেন না মানুষটা। দোকানদার বিজ্ঞ গলায় বললেন, 'কোনটা নেবেন? যদি বেগুনি খাইতে চান, তাহলে ওই লম্বাগুলা ভালো, ষাইট। পঁয়ষট্টি টাকা অবশ্য বেচি। যদি ভর্তা খাইতে চান, তাহলে ওই সবুজরঙা গোলগুলা, পঞ্চান্ন। গোল কালাগুলা অবশ্য তরকারি খাওয়ার জন্য, ওগুলাও পঁয়ষট্টি টাকা, যান আপনার জন্য পাঁচ টাকা কম।'

লেবুর ঝাঁকার দিকে তাকালেন তিনি এবার। একই ঝাঁকাতে তিন ধরনের লেবু সাজানো আছে- গোল লেবু, একটু মেটে রঙের ছোঁয়ায়; লম্বা লেবু, চকচকে সবুজ; ছোট আকারের লেবু, অপেক্ষাকৃত সবুজ কম। 

এবার আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না তাকে। উপযাচক হয়ে দোকানদার বললেন, 'যে লেবুই ন্যান, হালি বিশ; শুধু লম্বাগুলান পঁচিশ।'

কাঁচামরিচের দিকে তাকালেন এবার মানুষটা। হাতে নিলেন একটা, রেখেও দিলেন আগের জায়গায়। চোখে লাগেনি হাতটা, তবু কেমন যেন পোড়াতে লাগল জায়গাটা। একটু একটু করে জলও ভেসে উঠল সেখানে। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে তা মুছে তিনি কী যেন বলতে লাগলেন বিড়বিড় করে।

রোজার প্রথম দিককার চেয়ে জিনিসপত্রের দাম একটু কমেছে। 

ঘুরে দাঁড়িয়েই মাংসের দোকান দেখতে পেলেন তিনি, গরুর মাংসের দোকান। ওখানে গেলেন না তিনি আর। দাম জানেন। ওখানে দিয়ে আসতে গিয়েই একজনের জিজ্ঞাসায় দোকানদার বলেছিলেন, 'কেজি ৪৮০।' ব্রয়লার মুরগির দোকানে গেলেন তিনি। পরিচিত দোকানদার দুই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, 'আপনার ভাগ্য ভালো কাকু। কয়দিন ধইর‌্যা বৃষ্টি। বেচাকেনা এট্টু কম। আইজ ১৫০ টাকা না, ৫ টাকা কম, ১৪৫। আর যদি লেয়ার ন্যান তাহলে ১৮০।'

বাজারে এসে ঘণ্টাখানেক সময় ব্যয় করে তিনি প্রথম সদাই ব্রয়লার মুরগি কিনলেন, ওই ১৪৫ টাকা কেজিতেই। অথচ রোজার আগে ছিল সর্বোচ্চ ১২৫ টাকা।

ধনেপাতা কিনলেন এক মুঠো, পুঁইশাক কিনলেন, আলু কিনলেন বড়গুলো, টুকটাক আরও কিছু কিনে তিনি যখন বাসায় ফিরলেন, তখনও বৃষ্টি ঝরছে টিপটিপ করে। রমজানে স্কুল ছুটি, ছোট ছোট দুটো নাতি-নাতনি এসে বলল, 'দাদু, এখন গল্প শোনাও।'

হাত-মুখ ধুয়ে কেবল গায়ের ময়লা না, মনের ক্লেদ ধুয়ে তিনি নাতি-নাতনিকে নিয়ে বসলেন। তারপর দু'হাত পরস্পর ঘঁষতে ঘঁষতে বললেন, 'জানো, একটা না দেশ ছিল। রোজা আসার আগে আগে সেই দেশের কিছু ক্ষমতাবান বলেন- রোজায় এবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লে বরদাশত করা হবে না। কিন্তু প্রতিবারই বাড়ে, সব আমলেই বাড়ে। কিন্তু কে কী বরদাশত করে জানি না, নির্লজ্জ এই আমরা বরদাশত করে যাই অবলীলায়। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আমাদের। কেবল এই সান্ত্বনা- ঝাপসা চোখে ভালো দেখা যায় না কিছু, তাই পত্রিকা-টিভিতেও শূন্য প্রলাপ বকা মানুষগুলোর চেহারাও দেখতে হয় না আমাদের।'

'এটা কি কোনো গল্প হলো!' নাতি মুখ বাঁকা করে বলল।

'হ্যাঁ, এটি একটি রূপকথার গল্প, প্রাচীন রূপকথা। ঈশপের গল্পে যেমন ধূর্ত শেয়াল আছে, এই রূপকথাতেও আছে। ওখানে যেমন বোকা কাক আছে, এখানেও আছে। তোমাদের কেবল বুঝে নিতে হবে- কে ধূর্ত শেয়াল আর কে বোকা কাক।'

কিছুই বুঝতে পারল না ছোট নাতি-নাতনি দুটো। কেবল দেখতে পেল- শেয়ালের ধূর্ততায় কাক মাংস হারিয়ে কা কা করছিল, তার দাদু করছেন আ আ।

দাদুর চোখ দুটো কেমন ভিজে গেল নিমেষে!

লেখক: সাংবাদিক



শিশুরা বেড়ে উঠুক সৃজনশীল মনোভাব নিয়ে

 আশিক মুস্তাফা

অনলাইনে শিশু পরিস্থিতি খুঁজতে গেলেই চোখে পড়ে-শিশুশ্রম, বাল্য বিবাহ, অপুষ্টি, ...

৯ ঘণ্টা আগে

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম

 তপোধীর ভট্টাচার্য

আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে লিখেছিলাম- শরশয্যায় রয়েছে আসামের ...

০৬ নভেম্বর ২০১৮

বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে

 অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ ...

০৪ নভেম্বর ২০১৮

বিএনপি নেতাদের প্রথম গণভবন দর্শন

 অজয় দাশগুপ্ত

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ...

৩১ অক্টোবর ২০১৮