চতুরঙ্গ

এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়াদের উদ্দেশে কিছু কথা

 প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৮ | আপডেট : ০৯ মে ২০১৮      

 সফিকুল সাজু

ফাইল ছবি

মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে এবার আমাদের প্রাপ্তি ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ পাশ এবং এক লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জনের এ+। অকৃতকার্য হয়েছে ২২ দশমিক ২৩ শতাংশ। এই লেখা তাদের জন্য, যারা পাশ করলেও প্রত্যাশিত পয়েন্ট পায়নি। তাদের অভিভাবকদের জন্যও এতে রয়েছে কিছু কথা।

আমি ছাত্রজীবনে ছিলাম ব্যাক-বেঞ্চার। অর্থাৎ ক্লাসে সব সময় পেছনের বেঞ্চে বসতাম। আমার পরীক্ষার ফল কখনোই কাউকে বিশেষভাবে আনন্দিত করেনি; না প্রতিষ্ঠানকে, না পরিবারকে। পারিপার্শ্বিকতাকেও না। তাই প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর হেরে যাওয়াদের জন্য দু'লাইন লেখা দায়িত্ব বোধ করি। মনের তাগিদ থেকে লিখি।

ছাত্রজীবনে প্রতিটি রেজাল্টই আমাকে আত্মবিশ্বাসী করত, প্রেরণা দিত। রেজাল্টের পর এই আফসোস থাকতোই যে, 'ইস্!আরেকটু যদি ভালো করে পড়তাম! যদি টাইম ম্যানেজমেন্টটা আরেকটু ভালো করতে পারতাম!' কোনরকম মেট্রিক পাশের পর গ্রামের কলেজেই ভর্তি হই। কলেজে ক্লাস শুরু হয়, নতুন নতুন স্যার ক্লাসে আসেন। নতুন নতুন প্রভাষণ শুনি। ভালো লাগে, উৎসাহিত হই। পুরো উপজেলায় একজনই সে বছর এ+ পান। তিনি ভর্তি হন ঢাকায় নটরডেম কলেজে। স্যাররা তার কথা বলতেন। আমরা অনুপ্রাণিত হতাম। তাকে আইকন মানতাম। আর স্যাররা প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমাদের মধ্যে এ-গ্রেড কে কে পেয়েছ, দাঁড়াও।'  আট দশ জন দাঁড়াত। মনটা ভীষণ ছোট হয়ে যেত। ইচ্ছে হত লুকিয়ে যাই বেঞ্চের নিচে। এ+ তো দূরের কথা, এ-গ্রেডও ভাগ্যে জুটল না! হতাশ হতাম প্রায়ই। তবে এই হতাশা পিছু হটার ছিল না, এই হতাশা ছিল নিজেকে তেজোদ্দীপ্ত করার। আমি কেন পারব না? বাড়িতে গিয়ে গ্রামারের খুঁটি-নাটি পড়তাম, পরিসংখ্যান ম্যাথ করতাম, হিসাববিজ্ঞান করতাম। বাকি বিষয়গুলো আমাকে তেমন টানত না।

আমার পুরো ছাত্রত্বকাল এরূপ ক্ষুদ্রপ্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিতে কেটেছে। পরীক্ষার ফল চকচকে হতে পারিনি কখনোই। আসি এবার মূল আলোচনায়-

১.

এখন যারা ফেল করছে, তাদের কথা একটু খোলাখুলিভাবে এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বলব। তবে কথাগুলো শোনার আগে আমাদের ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আচ্ছা যারা ফেল করেছে, তারা কি কেউ এ-গ্রেড বা এ+ আশা করেছে? নিশ্চয় না। তারা কোনরকম পাশ চেয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় নিজেদের সম্পর্কে তারা কিছুটা অবগত। তারা জানে, সি-গ্রেড কিংবা তার আশেপাশে একটা ফল তারা পাবে। আর তারা যদি ফেল না করে ডি কিংবা সি-গ্রেড পেয়ে পাশ করত, তাহলে তারা কী করত? হয়ত আবার কলেজে ভর্তি হত। কলেজেও একই মানের ফল নিয়ে হয়ত পাশ করত। এই পয়েন্টে সাধারণত অনার্সে পড়ার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। অতএব, পাস কোর্সে ভর্তি হতে হত। সেখান থেকেও কোনরকম পাশ মিলত হয়ত। এই প্রতিযোগিতার বাজারে টেনেটুনে ডিগ্রি পাশ করে কী হতো? দুই-এক বছর বেকার ঘুরতে হতো। এলাকার হাটবাজারে কিংবা পাড়ার টঙ দোকানে চা-সিগারেটের আড্ডায় সময় যেত। আশপাশের এনজিও অফিসে যাতায়াত বাড়ত। সেটাও এখন দখল করে নিয়েছে অনার্স পাস প্রার্থীরা। অতপর, সবদিকে ব্যর্থ হয়ে মানসিক চাপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যবসা করবে অথবা বিদেশ যাওয়ার কথা ভাবতে কিংবা আত্মকর্মসংস্থানমূলক কিছু করতে। তো ১০ বছর সময় নষ্ট করার পর যদি এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে এই ১০ বছরে নিজেকে কী দিলে? পরিবারকে কী দিলে? সময় ও অর্থ নষ্ট হয়েছে অনেক, তার বিনিময়ে কী পেলে? আমি বলব ১০ বছর পরের সে সিদ্ধান্তটা তুমি এখন নাও। কাজ শেখো, ব্যবসা করো, বিদেশে যাও। পাশাপাশি সম্ভব হলে পড়াশুনাটা রাখো। ১০ বছর সময় বাঁচবে, আর্থিকভাবে লাভবান হবে, পরিবারের ভার কমবে, প্রাপ্তি বাড়বে। এই দেশটা বেকারের দেশ, পড়াশুনা করে বড় চাকরির স্বপ্নটা খুব সতর্কভাবে দেখতে হয়। আর যদি ইচ্ছে হয় কেবল কিছু জানার জন্যই পড়ব; তাহলে ঠিক আছে।

২.

আর যারা কম পয়েন্ট পেয়েছ বলে মন খারাপ করেছ, তাদের বলব, তুমি ফেলও করতে পারতে। পাশ করেছ, এতো ভাগ্য। পয়েন্ট যদি খুব কম হয়, তাহলে উপরের পরামর্শটা কাজে লাগাতে পারো। কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। পড়াশুনাটা ছেড়ে দিয়েও তুমি এমন কিছু করতে পারবে, যা অন্য দশজনে নাও পারতে পারে। পড়াশুনাই যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। পৃথিবীতে ক'জন বিখ্যাত শিক্ষাবিদকে আমরা জানি, ক'জন সেরা শিক্ষার্থীকে চিনি? ক'জন শ্রেষ্ঠ ছাত্রের গল্প আমাদের জানা আছে? আসলে পড়াশুনা করে কিছুটা হওয়া যায়, সেরাটা কেবল পড়াশুনা দিয়ে হয় না। সেরা হতে প্রচেষ্টা-পরিশ্রম, ত্যাগ ও কর্মঠ মানসিকতা লাগে। 

আর যদি মোটামুটি মানের ফলাফল হয়, তাহলে বলব, তোমার হাতে সময় আছে, সম্ভাবনাময় তারুণ্য আছে, গায়ে শক্তি আছে। তুমি অতীতে কিছু ভুল করেছ,সেসব এখন শুধরে নাও। এবার নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার পথ প্রশস্ত করো। 

জীবন একটা সুন্দর জায়গা। তবে তোমার অলসতা, অসতর্কতা, অজ্ঞতা সে সৌন্দর্যকে কেড়ে নিতে পারে। কাজেই চোখ মেলো, পৃথিবীকে দেখো, চ্যালেঞ্জ নাও, পরিশ্রম করো। ছাত্র হলে ছাত্রত্বকেই প্রাধান্য দাও। পড়াশুনাটা করার মত করো। সফল হবে।

৩.

অভিভাবকদের বলব আপনার সন্তান ১০ বছর পড়াশুনা করে এসএসসির ফল পেয়েছে। এই পাওয়া আপনারও। এই ১০ বছর আপনি তাকে গাইড করেছেন, তার ছাত্রত্বের মান দেখেছেন, তাকে গড়ে তুলেছেন। সর্বোপরি সে কেমন আপনি দেখেছেন। ছাত্র হিসেবে সে যেমন, আপনি তার কাছ থেকে তার বেশি আশা করতে পারেন না। এখন দেশজুড়ে এ+ এর খবর শুনে তার কাছেও হঠাৎ এ+ আশা করা কতটা যৌক্তিক? এটা তার ওপর অপ্রাসঙ্গিক মানসিক চাপ তৈরি করবে। তার যা মেধা ও প্রচেষ্টা আছে,তা ধারণ করেই তাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করুন। পরীক্ষায় প্রাপ্ত পয়েন্টই মেধার একমাত্র সাক্ষ্য নয়। আপনি তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছেন। অতএব তাকে পয়েন্ট দিয়ে না মেপে, তার অর্জিত বোধ ও জ্ঞান দিয়ে মাপুন। পরীক্ষার ফলাফল বাহ্যিক। ব্যক্তিক বোধ ও জ্ঞানই মৌলিক। সন্তানের অভ্যাস, রুচি, বুদ্ধি, বিবেক, আচরণে সে কতটুকু মার্জিত হয়েছে সেটা দেখুন। সেটাই শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য। তাই বলব সন্তানকে যথার্থ শিক্ষিত করুন, মানুষ করুন, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন। পয়েন্ট দিয়ে বেশি কিছু হয় না, বড়জোর বড় কলেজে ভর্তি করানো যায়। ভুলে যাবেন না, মোটামুটি পয়েন্ট দিয়ে ছোট কলেজে পড়েও বড় হওয়া যায়। প্রতিষ্ঠান খুব বেশি গড়ে না, গড়তে হয় নিজেই। বড় হওয়ার আকাঙ্খা আসতে হয় নিজের ভেতর থেকে।

পরিশেষে আবারও বলব সন্তান আপনার, সেখানে আপনার আবেগ থাকা স্বাভাবিক। তাকে বিবেক আর বাস্তবতায় মূল্যায়ণ করুন। তাকে পুরোপুরি বুঝুন। তার সামর্থের উর্ধ্বে বাড়তি চাপ দেবেন না। তার ব্যর্থতাকে নিজের গায়ে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাবুন। হঠাৎ করে কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে আস্তে ধীরে ভাবুন, তাকে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করুন।

লেখক: শিক্ষক, কবির হাট সরকারি কলেজ, নোয়াখালী




রাজনীতি কাদের হাতে

 ইমতিয়ার শামীম

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা রায়ের পর্যবেক্ষণে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল ...

১১ অক্টোবর ২০১৮

যে সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই

 সজীব ওয়াজেদ জয়

কিছু মহল থেকে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করা হচ্ছে। ...

০১ অক্টোবর ২০১৮

নির্বিকার মুখোশধারী হয়ে পড়ছি আমরা

 ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস

এখন ছবি তোলা কোনো ব্যাপার? 'ক্যামেরা উইথ বিউটি অ্যাপ' সবার ...

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নাগরিকপঞ্জি বোঝাতে চায় বাংলাভাষী মানেই অনুপ্রবেশকারী!‌

 সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

আসামে নাগরিক বাছাইয়ের নামে যে কাজটি সরকারের নেতৃত্বে চলছে, সেটি ...

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮