চতুরঙ্গ

প্রবাসে রমজান: দেশি ঢঙে ভ্রাতৃত্ববোধের দৃষ্টান্ত

 প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৮ | আপডেট : ০৪ জুন ২০১৮      

 রুদ্র মাসুদ

নিউইয়র্ক সিটিতে অভিবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশই ব্যাচেলর জীবনযাপন করেন। যাদের বেশীরভাগ তরুণ-যুবক। এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে মেসে তাদের বসবাস। পরিবার পরিজন থেকে দূরে প্রবাসের সংগ্রামী জীবনে মা, স্ত্রী কিংবা বোনের হাতে ইফতার থেকে অনেকেই বঞ্চিত বছরের পর বছর। নিজের জন্য রান্না করে খাওয়াও অনেক সময় কষ্টসাধ্য। তার ওপর ইফতারের আযোজন! কেউ কেউ আবার ইফতারের সময় থাকেন কাজে।

নিউইয়র্ক সিটির বাঙালি অধ্যুষিত ব্রুকলীজের চার্চ ম্যাকডোনাল্ড ও আশপাশের এলাকা যেমন, নস্টরান্ড-ফুল্টন, কুইন্সের ওজন পার্ক, জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস ও ব্রঙ্কসর পার্কচেষ্টার এলাকায় মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের ভিড় বাংলাদেশের মতোই। এই মসজিদগুলোতে ইফতারের ব্যাপক আয়োজন থাকে। ইফতারে অংশ নেওয়া স্থানীয় মুসল্লিদের বড় অংশই আবার ব্যাচেলর। ইফতার আয়োজনের ঝক্কি ঝামেলা এড়াতে মসজিদে ইফতার সেরে নেন অনেকে। পাশাপাশি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় দেশি খাবারের রেস্তোরাঁগুলোতেও ইফতার ক্রেতার তালিকায় এগিয়ে ব্যাচেলররা।

এর বাইরেও নিজেদের মতো করে ইফতার আয়োজন করেন পরিবার পরিজন থেকে দূরে থাকা এই মানুষগুলো। মেসগুলোতে পালাক্রমে একদিন একেকজন ইফতার আয়োজনের দায়িত্বে থাকেন আর সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন মেস মেম্বাররা। নিজে রান্না করে খেতে খেতে একসময় তারাও হয়ে উঠেন পাকা রাধুনী। এরমধ্যে কেউ কেউ আবার পরিচিতজনদের কাছে জনপ্রিয় শুধু রুচিশীল বাহারি ইফতারের জন্য। প্রবাস জীবনে কঠোর খাটুনির পরও কেউ কেউ ইফতারে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের আয়োজনে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেন। নিউইয়র্কের ব্রুকলীনের একটি এপার্টমেন্ট দেখা গেল এমন আয়োজন। আমিন টিপু ও তৌফিকুল ইসলাম মানিক সহোদর। তাদের ব্রুকলীনের এপার্টমেন্টে বাসিন্দা ছয়জন। প্রতিদিন ইফতারে এপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের চেয়ে আমন্ত্রিতরাই বেশি থাকেন। এবছর প্রথম রমজানেই ইফতার আয়োজনে হৈ চৈ ফেলে দেন এই সহোদর। প্রতিদিন ব্যাচলরদের এই ইফতার আয়োজনে নানা ফল দিয়ে ট্রে সাজানো হয়। পেয়ারা, লিচু, চেরি, কিউই, ড্রাগন ফল, মাল্টা, পেপে, তরমুজ, স্ট্রবেরি, আপেল, আঙুর আর খেজুর তো থাকেই। ফলের এমন মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনার পাশাপাশি থাকে লিচু ও তরমুজের জুস। বাদ যায়না পেয়াজু-বেগুনি। খাবার শেষে পরিবেশিত কাচ্চি বিরিয়ানী পুরান ঢাকার বনেদি রেস্টুরেন্টগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। দুঃখ-কষ্ট ভুলে কেউ কেউ ছবি তুলে প্রিয়জনকে জানান দেন- 'প্রবাসে ভালো আছি, আমাদের জন্য চিন্তা করো না'। কাজ শেষে প্রতিদিন এভাবে বন্ধু-পরিচিত জনদের জন্য ইফতারের আয়োজন করেন আমিন টিপু ও তৌফিকুল ইসলাম মানিক।

প্রবাস জীবনে সোনার হরিণের আশায় পরিবারের সর্বস্ব খুইয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই পৌঁছেন যুক্তরাষ্ট্রে। যাদের বেশিরভাগই ঠাঁই নেন এই নিউইয়র্ক সিটিতে। প্রথমে তারা খুঁজে নেন নিজের আত্মীয়, পরে পর্যায়ক্রমে বন্ধু, এলাকার পরিচিত কিংবা নিজ অঞ্চলের মানুষদের। ব্যাচেলরদের বেশিরভাগই এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত। কেউ মামলায় জিতেছেন, কেউ লড়ছেন বছরের পর বছর। এমন পরিস্থিতিতে স্বজনদের কাছ থেকে বছরের পর বছর দূরে থাকলেও তারা ধর্মচর্চা করেন নিবিড়ভাবে। রোজা, সেহরি,  ইফতার এবং ঈদের সকল আয়োজনেই সরব উপস্থিতি থাকে বাঙালি তরুণদের। নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি একসময় তারা স্থানীয় আয়োজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন। সংগঠন চর্চার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ থাকেন অনেকেই। নিজ গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা জেলার নামে গড়ে তোলেন সংগঠন। সেই সংগঠনগুলোও আবার রমজানজুড়ে ইফতার ও সেহরিতে করে নানা আয়োজন। গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, এগিয়ে আসেন একে অপরের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। এই ব্যাচেলরদের মধ্যেই একসময় যারা থিতু হন পরিবার পরিজন নিয়ে, তারা আবার ফেলে আসা জীবনের সতীর্থদের পাশে থাকেন সব সময়।

হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও যারা দেশি ঢঙে নিজেদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন প্রবাসীরা। আয়-রোজগার এবং পীড়িতদের সহযোগীতায় ন্যায্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তারা। রমজানে নিবিড় সংযমে নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন মানবিকবোধ; যা কিনা ভুলিয়ে দেয় পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কষ্ট। হাঁড়ভাঙা পরিশ্রম করে পরিবার পরিজনের জন্য রমজানের খরচ কিংবা ঈদের কেনাকাটার টাকা পাঠাতে ভুল করেন না কেউই। ত্যাগের মহিমায় ভরে উঠুক প্রবাসের এই ধর্মপ্রাণ তরুণ-যুবাদের জীবন। কষ্টের দিনগুলো কাটিয়ে সোনালী আলোয় উদ্ভাসিত হোক সবার জীবন।

লেখক: নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক
rudramasud@yahoo.com



নাগরিকপঞ্জি বোঝাতে চায় বাংলাভাষী মানেই অনুপ্রবেশকারী!‌

 সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

আসামে নাগরিক বাছাইয়ের নামে যে কাজটি সরকারের নেতৃত্বে চলছে, সেটি ...

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে

 অজয় দাশগুপ্ত

১৫ আগস্ট, ১৯৭৬। আমরা দৃঢ়সংকল্প ছিলাম— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ...

১৫ আগস্ট ২০১৮

প্রিয় সারওয়ার ভাই, এই ঘুম আপনার পাওনা!

  অজয় দাশগুপ্ত

প্রিয় সারওয়ার ভাই, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে সাংবাদিকতা জীবনে কত ...

১৪ আগস্ট ২০১৮

অভিশাপ

 সুমন্ত আসলাম

রোববার দুপুর ১টা ৫৮ মিনিট।বনলতা সুইটসের সামনে এসে গাড়িটা থামতেই একগাদা ...

৩০ জুলাই ২০১৮