চতুরঙ্গ

প্রিয় সারওয়ার ভাই, এই ঘুম আপনার পাওনা!

 প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৮ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৮      

  অজয় দাশগুপ্ত

গোলাম সারওয়ার -জন্ম : ১ এপ্রিল ১৯৪৩, মৃত্যু : ১৩ আগস্ট ২০১৮

প্রিয় সারওয়ার ভাই, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে সাংবাদিকতা জীবনে কত বিনিদ্র রজনী যে কাটিয়েছেন! কেবল পেশাগত দায়বোধ থেকে নয়; পদের বাধ্যবাধকতার কারণেও নয়- এর পেছনে রয়েছে সংবাদপত্রের প্রতি, পাঠকের প্রতি সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, ভালোবাসা। সেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রাতের কথা কত বার আমাদের স্মরণে এনেছেন! রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি আরও বলেছেন- ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, খাজনা-ট্যাপ বন্ধ ইত্যাদি। কিন্তু দৈনিক সংবাদ-এর তরুণ কর্মী হিসেবে আপনি চাইছেন স্বাধীনতার ডাক-ই থাকুক আট কলামে ব্যানার হয়ে। সম্পাদক দ্বিধাগ্রস্ত, সিনিয়র সহকর্মীদের শঙ্কা- সামরিক জান্তার রোষ নেমে আসবে না তো! গভীর রাত পর্যন্ত চলে আলোচনা। শেষ পর্যন্ত আপনার মতই সবাই মেনে নিল। ৮ মার্চের ঢাকার পত্রিকাগুলোর মধ্যে সংবাদ-এর শিরোনাম সবার সেরা! রাত জাগা বৃথা যায়নি আপনার।

সংবাদ-এর বার্তা কক্ষে থাকাবস্থাতেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-এর গণহত্যা অভিযান দেখেছেন। পাশের পুলিশ ফাঁড়িতে হত্যা করা হয় কয়েকজনকে। গোটা শহর জ্বলছে, কামান-মেশিনগানের কান ফাটানো আওয়াজ। তার মধ্যেই বের করে ফেললেন সংবাদ। ভোর হতে না হতেই কারফিউয়ের মধ্যে, গোলাগুলি উপেক্ষা করে ছুটে গেলেন সংবাদ-এর প্রাণপুরুষ শহীদুল্লা কায়সারের বাসায়, পত্রিকা বিলি কীভাবে হবে সেটা জানতে। এ দায়বোধের যে তুলনা নেই। ২৬ মার্চের সংবাদ বিলি হলো না। ততক্ষণে যে বঙ্গবন্ধু নতুন দেশের বার্তা রটিয়ে দিয়েছেন। আর তার ডাকে সাড়া দিয়ে আপনি কলম ছেড়ে হাতে তুলে নিলেন বন্দুক-গ্রেনেড। পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে যে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক অনুষ্ঠানে মজা করে বলেছিলেন নিজের সংসার জীবনের কথা। প্রথম প্রথম গভীর রাতেও ঘরে ফিরে গরম ভাত পেতেন। কিন্তু ক্রমে ভাত-তরকারি ঠাণ্ডা হতে থাকল। কিন্তু এ জন্য কোনো অনুযোগ নয়। ভবিষ্যতে সংবাদকর্মী হতে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের জানালেন, সন্তানদের প্রতি নজর দিতে গিয়েই স্ত্রীকে এমনটি করতে হয়েছে। তিনি যে মা! এ কথা বলতে বলতেই আপনি অশ্রুসিক্ত; বারবার চোখ মুছছেন। প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে বলেন- 'স্ত্রীর প্রতি, সন্তানদের প্রতি কত অবহেলা করেছি! পেশাকে আঁকড়ে ধরেছি। এখন যে অবস্থানে এসেছি তার পেছনে স্ত্রীর অবদান, সন্তানদের অবদান সবচেয়ে বেশি।' উপস্থিত ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক- একদিকে চোখের কোণায় জমা অশ্রু মুছে ফেলতে চাইছে, অন্যদিকে করতালিতে ফেটে পড়ছে। তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে বলেন, আজ আপনাদের সামনে প্রিয়তমা স্ত্রীর এই আত্মত্যাগের কথা জানাতে পেরে নিজে কিছুটা হাল্ক্কা বোধ করছি।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা চলার পথে পেয়ে গেল দিকনির্দেশনা। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ- যেন এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হলো।

যুগান্তরে আপনার সহকর্মী হিসেবে যোগ দিই দেড় যুগ আগে। আপনার কাজের ধারা বুঝে উঠতে সময় লাগেনি। প্রতিদিন সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে সকালে আলোচনা। যেদিন আসতে পারতেন না, ফোনে কথা বলে নিতাম। কী নিয়ে লিখতে হবে- সেটা বলতে সময় নিতেন খুব কম।

সমকাল যাত্রা শুরু করে ২০০৫ সালের মে মাসে। প্রথম দিন থেকেই ছিলাম আপনার সঙ্গে। যুগান্তরে থাকার সময় দেখেছি, গণআন্দোলনের কারণে রাজপথ উত্তপ্ত। আপনি রাতে থেকে যাচ্ছেন অফিসে। বয়স বাড়ছে, কিন্তু আপনি চিরসবুজ-সতেজ রয়ে যাচ্ছেন। সমকাল পরিবারে যুক্ত হয়েও একই চিত্র। সব বিভাগের কাজের প্রতি সমান নজর। জেলা-উপজেলার কর্মীরা জানে- গভীর রাতেও কোনো ঘটনা ঘটলে আর কাউকে জানাতে পাওয়া না গেলেও অন্তত একজন মোবাইল ফোনের কলটি রিসিভ করবেন- তিনি প্রিয় সম্পাদক গোলাম সারওয়ার।

হাসপাতালে ভর্তির আগে সর্বশেষ যেদিন সমকালে আসেন, তার আগের দুপুরে ফোন করি সম্পাদকীয় লেখার বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য। জানালেন, শরীরটা ভালো নেই। গলাটা ভারি মনে হলো। ধরে নিই, বিকেলে হয়তো আসবেন না। কিন্তু অতীতের মতো এবারেও হেরে যাই। আপনি ঠিকই বার্তা বিভাগে হাজির। সম্পাদকীয় পাতার মেকআপ কপি পাতা আপনাকে দেখাচ্ছি ১৮ বছর। সামান্য ভুলও আপনার নজর এড়াতে পারে না। শিরোনাম কত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আকর্ষণীয় হতে পারে, চৌকস হতে পারে, তার তুলনা একমাত্র আপনিই।

অনেক রাত জেগেছেন প্রিয় সম্পাদক, সারওয়ার ভাই। কত ঘুম যে মাটি করেছেন! কিন্তু কখনও ক্লান্ত মনে হয়নি আপনাকে। সবকিছুই অপরের জন্য। দেশ ও দশের জন্য। নিজে বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবেননি। আপনার কারণে আরও কত সংবাদকর্মী ও আলোকচিত্র শিল্পী, প্রেস-কম্পিউটার বিভাগের কর্মী, প্রুফ সেকশনের কর্মী যে রাত শেষের ভোর দেখেছে, সূর্যোদয়ের পর বাসায় ফিরেছে, তার হিসাব রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই আপনি ফের অফিসে হাজির। আপনার যে অনেক ঘুম পাওনা হয়ে আছে। আজ (মঙ্গলবার) কাটাবেন বারডেমের হিমঘরে। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে, থাকবেন চিরনিদ্রায় শায়িত। কাউকে আর জাগিয়ে তুলবেন না। কাউকে বলবেন না- মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে যাও সংবাদ সংগ্রহের কাজে। কেউ আর আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ খবরটি দেওয়ার জন্য রাত ৩টায় ফোন করবে না। কারও ডাকে আর সাড়া দেবেন না।

বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে থাকুন অনন্তকাল।

লেখক: উপসম্পাদক, সমকাল



ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম

 তপোধীর ভট্টাচার্য

আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে লিখেছিলাম- শরশয্যায় রয়েছে আসামের ...

০৬ নভেম্বর ২০১৮

বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে

 অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ ...

০৪ নভেম্বর ২০১৮

বিএনপি নেতাদের প্রথম গণভবন দর্শন

 অজয় দাশগুপ্ত

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ...

৩১ অক্টোবর ২০১৮

রাজনীতিতে এখন 'যদি'

 দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

মফস্বলের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গণপরিবহন পর্যন্ত খোশগল্পের মুখ্য ...

২৩ অক্টোবর ২০১৮