সিটি নির্বাচন

আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ বিএনপিতে বিভেদ

লিটনের পাশে সবাই, দ্বন্দ্বের জালে বুলবুল

রাজশাহী

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৮     আপডেট: ০৯ জুলাই ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

সৌরভ হাবিব, রাজশাহী

বিভেদ সরিয়ে দলীয় প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে বিজয়ী করতে রাজশাহী সিটিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পূর্ণোদ্যমে চালাচ্ছেন প্রচার-প্রচারণা। তবে নির্বাচনকে ঘিরে তুষের আগুনে জ্বলছে বিএনপি। 'বড় ভাই' মিজানুর রহমান মিনু ও 'ছোট ভাই' মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়েছে অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যেও। এ বিভেদ নিরসনে ঢাকা থেকে গত মঙ্গলবার রাজশাহী এসেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। প্রবীণ নেতা কবীর হোসেনের বাসায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর শনিবার ফিরে গেছেন তিনি। তবে বিভেদের আগুন কতটা নিভেছে, তা নিয়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছে সংশয়।

নগর বিএনপির তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সিনিয়র নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে মিজানুর রহমান মিনুর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা। যে কারণেই দীর্ঘ ১৭ বছর সিটি মেয়র এবং এক মেয়াদে সদর আসনের সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন তিনি। পুরো উত্তরাঞ্চলেই তিনি বিএনপি নেতা-কর্মীর কাছে অভিভাবকের মতো। কিন্তু রাজনীতিতে তার হাত ধরেই বেড়ে ওঠা নগর যুবদল সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল গত নির্বাচনে মিনুকে হটিয়ে দলীয় মনোনয়ন ছিনিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, মেয়র হওয়ার পর ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নগর বিএনপির সভাপতির পদটিও বাগিয়ে নেন। মিনুকে দমিয়ে রাখতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বিএনপির প্রভাবশালী নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমদের অনুসারী হিসেবে পদ বাগিয়ে নিলেও তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। ফলে তারা চরম বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। যে কারণে নগর বিএনপি কার্যালয় দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকে। কেন্দ্রীয় নেতারা এসেও সেখানে ঠিকমতো সভা করতে পারেননি। বরং তাদের সামনেই দু'পক্ষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে এবং সভা পণ্ড হয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, 'ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীই এবার বুলবুলের পক্ষে কাজ করবে না। মিনু ভাইকে বাদ দিয়ে তাকে মেয়র প্রার্থী করার পর একটা পর্যায়ে নেতাকর্মীরা তা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু যখন মিনু ভাইকে সরিয়ে দিয়ে বুলবুলকে নগর বিএনপির সভাপতি করা হলো, তখন তা আর নেতাকর্মীরা মানতে পারেনি। এ দ্বন্দ্ব এখন আর শুধু মিনু-বুলবুলের নয়; সব নেতাকর্মীর। চাইলেও মিনু ভাই তার কর্মীদের এবার আর বুলবুলের পক্ষে মাঠে নামাতে পারবেন না।' তিনি বলেন, 'বোয়ালিয়া থানা বিএনপির সভায় বিরোধের কারণে অনেক ওয়ার্ডের প্রতিনিধিই আসেননি।' 

বিএনপির আরেক নেতা বলেন, 'গয়েশ্বর দাদা এসেছিলেন। তিনি বড় নেতাদের কথা শুনেছেন। তৃণমূলের কথা শোনেননি। তৃণমূলের অবস্থাও তার জানা নেই। এবার বুলবুলের পক্ষে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে কেউই কাজ করবে না।' 

সিটি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নগর যুবদল সভাপতি ও মিজানুর রহমান মিনুর অনুসারী আবুল কালাম আজাদ সুইট ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, 'সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পরিবর্তন চায়। বর্তমান মেয়র বুলবুলের আচার-ব্যবহার ভালো না। এ সময় নগরীর উন্নয়ন হয়নি। বর্তমান সরকার উন্নয়ন যে করতে দেয়নি- এ বিষয়টিও তিনি মানুষকে বোঝাতে পারেননি।' উল্লেখ্য, বুলবুলকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পরও সুইট স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র তুলেছিলেন। 

তবে বিরোধের কথা মানতে নারাজ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। তিনি বলেন, 'বিএনপি বড় দল। দু-একটি বিরোধের ঘটনা থাকতে পারে। নির্বাচনের সময় সবাই একসঙ্গে মাঠে নামবে। এবারের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক আমি। ৫১ সদস্যের প্রচার কমিটিও হয়েছে। কাজ চলছে।' গয়েশ্বর রায়ের সাংগঠনিক সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দলের ঐক্যবদ্ধতা দেখে তিনি খুশি হয়ে ঢাকায় ফিরে গেছেন। ১৩ জুলাই তিনি আবারও আসবেন।' নগর বিএনপি সভাপতি ও মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলও বলেন, 'বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। ভোট ডাকাতির চেষ্টা করা হলে জীবন দিয়ে হলেও তা ঠেকানো হবে।' 

এদিকে রাজশাহী সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে জয়ী করতে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগ। ইতিমধ্যে দলটির শীর্ষ নেতারা ঢাকায় বৈঠকও করেছেন। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাকে আরও ছয় মাস আগেই দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবুজ সংকেত দেন। তখন থেকেই তিনি প্রচারণার পাশাপাশি দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় নেতা শহীদ কামারুজ্জামানের ছেলে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে নিয়ে সংগঠনে কখনোই কোনো বিরোধ ছিল না। তবে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্যান্য নেতার মধ্যে কম-বেশি বিরোধ ছিল। এদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের বিরোধ ছিল বেশি প্রকট। এসব নিয়ে গত ২১ জুন ঢাকায় সংসদ ভবনে জেলার এমপি ও শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী-১ আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ আসনের সাংসদ শাহরিয়ার আলম, রাজশাহী-৫ আসনের সাংসদ কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারা, রাজশাহী-৪ আসনের সাংসদ এনামুল হক, সংরক্ষিত আসনের এমপি বেগম আখতার জাহান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা অংশ নেন। বৈঠকে তারা দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। 

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, 'বৈঠকে দূরত্বের অবসান ঘটেছে। লিটনকে বিজয়ী করতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করব- এমন ঐকমত্যে এসেছেন নেতারা।' 

জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী জানান, আসাদের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে। বৈঠকে তার (আসাদের) সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, রাজশাহী অঞ্চলে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে তাদের বিজয়ের প্রথম ধাপ হবে রাজশাহী সিটি নির্বাচন। সিটি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের কাজ করার অনুমতি পাওয়া গেলে তারা দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে লিটনের জন্য ভোট চাইবেন। এ নির্বাচনকে তারা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছেন।' 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংসদ শাহরিয়ার আলম বলেন, তাদের মধ্যে 'ছোট-খাট মান-অভিমান' থাকলেও লিটনকে মেয়র হিসেবে দেখার বিষয়ে কোনো বিরোধ নেই। আইনি জটিলতা না থাকলে তারা মন্ত্রী-এমপিরাও প্রচারণায় অংশ নেবেন এবং যে যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করবেন।

নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, তার সঙ্গে কোনো নেতার ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব বা দূরত্ব নেই। নেতাদের প্রত্যাশা পূরণের জায়গায় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কারও কারও ক্ষোভ থাকতে পারে; তবে গত নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাও হালকা হয়ে গেছে। এর পরও নেতাদের চাপা দ্বন্দ্ব-ক্ষোভ দূর করতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের আমন্ত্রণে তারা ঢাকায় বসেছিলেন। মনের দুঃখ-ক্ষোভ দূর করে সেখানে একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় প্রতিটি মহল্লায় কমিটি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ এখন আগের তুলনায় অনেক ঐক্যবদ্ধ। আগামী নির্বাচনে নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করার লক্ষ্যে সবাই কাজ করছেন।

আরও পড়ুন

নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১

নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১

নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মমতাজ বেগম (৫০) নামে এক সবজি ...

ময়মনসিংহে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

ময়মনসিংহে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

ময়মনসিংহে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সুমন নামের একজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ...

আওয়ামী লীগ ছাড় দেবে সর্বোচ্চ ৭০ আসন

আওয়ামী লীগ ছাড় দেবে সর্বোচ্চ ৭০ আসন

১৪ দল ও মহাজোটের শরিকদের জন্য ৬০ থেকে ৭০টি আসন ...

একাধিক আসনে লড়তে পারেন যারা

একাধিক আসনে লড়তে পারেন যারা

রাজনীতির নানামুখী হিসাব-নিকাশের কারণে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক আসনে ...

আক্রান্ত হয়েও জানেন না অর্ধেক মানুষ

আক্রান্ত হয়েও জানেন না অর্ধেক মানুষ

দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। নারী-পুরুষ-শিশু সব ...

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক এমএনএইচ বুলু ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর রোড ...

দণ্ড স্থগিত না হলে প্রার্থিতা বাতিল: ইসি

দণ্ড স্থগিত না হলে প্রার্থিতা বাতিল: ইসি

একাদশ সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ...

২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন পাশের সনদ দেয় তারা

২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন পাশের সনদ দেয় তারা

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে ...