সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আরও ১০ লাখ মানুষ

প্রকাশ: ১৭ মে ২০১৮     আপডেট: ১৭ মে ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু কাওসার

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা ব্যাপক বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা যায়, আসন্ন বাজেটে অতিরিক্ত ১০ লাখ দরিদ্র জনগণকে নতুন করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন বয়স্ক ও বিধবা, মাতৃত্বকালীন, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সামাজিক কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৬৮ লাখ উপকারভোগী সরকারের কাছ থেকে সরাসরি নির্ধারিত অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে এই সংখ্যা ৭৮ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। 


মূলত নির্বাচনী ভাবনায় ভোটারদের তুষ্ট করতে একসঙ্গে এত বেশি গরিব জনগণকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। এর আগে এক বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ দরিদ্র জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভাতার অঙ্ক বাড়ানো হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাতার অঙ্ক অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে জনপ্রতিনিধিরা চান, ভাতা এবং আওতা দুটিই বাড়ানো হোক। 


জানা যায়, গত ৩০ এপ্রিল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আগামী বাজেট সামনে রেখে আরও বেশি সংখ্যক দরিদ্র জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদসহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে উপস্থিত অর্থমন্ত্রী ছাড়া বাকি সবাই আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাতা বাড়ানোর দাবি করেন। তবে অর্থমন্ত্রী জানান, ভাতা বাড়াতে হলে অনেক বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। একসঙ্গে এ খাতে বেশি অর্থের জোগান দেওয়া কঠিন। পরে উপকারভোগীদের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভাতা বাড়তে পারে। 


সূত্রমতে, এবার মাতৃত্বকালীন ভাতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এদের আওতাও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে একজন দরিদ্র মা মাসিক ৫০০ টাকা মাতৃত্বকালীন ভাতা পান। এ ভাতা ৮০০ টাকা করা হচ্ছে। সারা দেশে এখন ৬ লাখ দরিদ্র মা মাতৃত্বকালীন ভাতা পান। আসন্ন বাজেটে এর আওতা আরও এক লাখ বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমানে দুগ্ধদানকারী গরিব কর্মজীবী মা মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা পান। এটিও ৮০০ টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। এখন দুই লাখ উপকারভোগী এ কর্মসূচির আওতায় আছেন। এ সংখ্যা আরও ৫০ হাজার বাড়ানো হচ্ছে। 


মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও সুখবর থাকছে। মাসিক সম্মানী ভাতা না বাড়লেও সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বৈশাখী ভাতা পাবেন মুক্তিযোদ্ধারা। এর পরিমাণ মূল ভাতার ২০ শতাংশ। 


বর্তমানে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ভাতা ১০ হাজার টাকা। এ হিসাবে বৈশাখী ভাতা পাবেন দুই হাজার টাকা। বাজেটের পর আগামী জুলাই থেকে তা কার্যকর হবে। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা দুই ঈদে সমপরিমাণ দুটি বোনাস পান। এই সুবিধা অব্যাহত থাকছে। বর্তমানে দেড় লাখ মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পান। আসন্ন বাজেটে এ সংখ্যা দুই লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। 


বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সবচেয়ে বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে। এর মধ্যে বয়স্ক, বিধবা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি; ক্যান্সার, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তথা বেদে সম্প্রদায় ও তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, হিজড়া জনগোষ্ঠী ও চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন অঙ্কের মাসিক ভাতা দেওয়া হয়।


এর বাইরে ত্রাণ-দুর্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ২২ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় ১৩৬টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন। যেমন :পেনশন সুবিধা এক ধরনের সামাজিক কর্মসূচি। এতে বছরে সরকারের ব্যয় হয় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আবার কম দামে গরিবদের চাল দেওয়া, ভিজিডি, ভিজিএফ, ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ন্যাশনাল সার্ভিসের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালায় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ অর্থ এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে এ খাতে সর্বমোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির আড়াই শতাংশ। আগামী বাজেটে এ খাতে মোট বরাদ্দ ৬৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। 


আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করেছিল। পরবর্তীকালে সব সরকার জনকল্যাণে এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। কিন্তু পদ্ধতিগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে এর সুফল পুরোটা মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।


তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিভিন্ন ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে। প্রতি বছর এ খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও এর সুফল আশানুরূপভাবে উপকারভোগী বা টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছে না। বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত মনে করেন, প্রকৃতভাবেই টার্গেট জনগোষ্ঠীর কাছে এ সুবিধা পৌঁছাতে হবে। 


সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, অনিয়ম রোধে বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান প্রক্রিয়ায় অটোমেশন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় ভাতার অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরিভাবে উপকারভোগীদের হিসাবে চলে যাবে। পরীক্ষামূলক কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, গোপালগঞ্জ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ পদ্ধতি চালু হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী এ মাসের শেষে এটি উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। 


সূত্র জানায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় বর্তমানে 'বয়স্ক ভাতা' হচ্ছে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। বর্তমানে ৬৫ বছর থেকে বেশি বয়স্ক অসচ্ছল ব্যক্তি মাসিক নগদ ৫০০ টাকা ভাতা পাচ্ছেন। সারাদেশে মোট ৩৫ লাখ মানষ এ ভাতা পান। আসন্ন বাজেটে ভাতা অপরিবর্তিত রেখে এদের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে বাড়িয়ে ৪০ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আরেকটি বড় কর্মসূচি হচ্ছে বিধবা ভাতা। বর্তমানে ১২ লাখ ৬৫ হাজার বিধবা মাসে ৫০০ টাকা হারে এ ভাতা পাচ্ছেন। নতুন বাজেটে আরও এক লাখ ৩৫ হাজার উপকারভোগী বাড়ানো হচ্ছে। ফলে বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে মোট ১৪ লাখ। ভাতার অঙ্ক একই থাকছে। 


প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি সুবিধাভোগীর সংখ্যা বর্তমানে ৮০ হাজার। আরও ১০ হাজার মানুষকে এ সুবিধা দেওয়া হবে। এখন চার স্তরে প্রতিবন্ধীদের বৃত্তির টাকা দেওয়া হয়। যেমন :প্রাথমকি স্তরে ৫০০ টাকা,মাধ্যমিকে ৬০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক ৭০০ টাকা, উচ্চতর শিক্ষায় ১২০০ টাকা। সূত্র জানায়, প্রতিবন্ধীদের জন্য বৃত্তির টাকা সব স্তরেই বর্তমানের চেয়ে গড়ে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা করে বাড়ছে। 


ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক ও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত গরিব রোগীদের এককালীন নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে সরকার। এর পরিমাণ প্রতি রোগী ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে ১০ হাজার রোগী আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। আসন্ন বাজেটে আরও পাঁচ হাজার রোগীকে একই হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং তাদের ছেলেমেয়েরা মাসিক ভাতাসহ নানা সুবিধা পাচ্ছেন। বর্তমানে ৩৮ হাজার এ সুবিধা ভোগ করছেন। নতুন করে আরও পাঁচ হাজার জনকে এ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুবিধাভোগী ছেলেমেয়েদের বৃত্তির টাকা বিভিন্ন স্তরে গড়ে ৩০০ টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা আর সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা মাসিক বৃত্তি দেওয়া হয়। 


বর্তমানে সাড়ে সাত হাজার হিজড়া ৭শ' টাকা হারে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। আগামী বাজেটে এদের সংখ্যা বাড়িয়ে ৮ হাজার করা হচ্ছে। তবে ভাতা অপরিবর্তিত থাকছে। এ ছাড়া চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করছে সরকার। বর্তমানে ৩০ হাজার চা শ্রমিক নগদ সহায়তা পাচ্ছেন। প্রত্যেককে এককালীন ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। নতুন বাজেটে আরও ১০ হাজার চা শ্রমিককে সহায়তা দেওয়া হবে। তবে টাকার অঙ্ক একই থাকছে। 

আরও পড়ুন

বিএনপি নেতা আমীর খসরু কারাগারে

বিএনপি নেতা আমীর খসরু কারাগারে

চট্টগ্রামে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক ...

ব্যবহারকৃত তেলে রান্না স্বাস্থ্যের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

ব্যবহারকৃত তেলে রান্না স্বাস্থ্যের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

রান্নার জন্য তেল অপরিহার্য। যেকোন কিছু ভাজা থেকে শুরু করে ...

জামালপুরে ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা

জামালপুরে ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা

নারী সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে চরিত্রহীন বলায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ...

মেসিবিহীন এল ক্লাসিকো

মেসিবিহীন এল ক্লাসিকো

রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে গেছেন। তাকে ছাড়া লস ব্লাঙ্কোসরা ধুকছে। ...

আমার বর্তমানকে উৎসর্গ করেছি তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য: প্রধানমন্ত্রী

আমার বর্তমানকে উৎসর্গ করেছি তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য: প্রধানমন্ত্রী

তরুণ প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছেন উল্লেখ ...

ঢাবি 'ঘ' ইউনিটের ভর্তি কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ চেয়ে রিট

ঢাবি 'ঘ' ইউনিটের ভর্তি কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ চেয়ে রিট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত 'ঘ' ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ...

গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে  যা করণীয়

গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে যা করণীয়

শহর ছাড়িয়ে আজকাল গ্রামের অনেক বাড়িতেও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা ...

চাঁদপুরে গোপন বৈঠককালে জঙ্গি সন্দেহে আটক ৭

চাঁদপুরে গোপন বৈঠককালে জঙ্গি সন্দেহে আটক ৭

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে গোপন বৈঠককালে জঙ্গি সন্দেহে ৭ জনকে আটক করেছে ...