সাক্ষাৎকার

বিশেষ সাক্ষাৎকার :আ স ম আবদুর রব

অগণতান্ত্রিক শক্তিকে সমর্থন করি না

 প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

 লোটন একরাম

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, সংবিধানকে সুবিধামতো ব্যবহারের আওয়ামী লীগের প্রবণতা জাতিকে চরম সাংবিধানিক সংকটে ফেলেছে। সরকারবিরোধী যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠছে তার লক্ষ্য এ সংকটের অবসান ঘটানো। তবে তিনি কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি বা পন্থাকে সমর্থন করেন না।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলেন তিনি দেশের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। কেউ প্রধানমন্ত্রীকে দেশের জন্য প্রাণ দিতে বলেননি, প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কোনো একটা গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা কার্যকর করতে পারেন। এতে বর্তমান সংকটের যেমন সমাধান হবে, তেমনি জনগণের ভোট দেওয়ারও সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আ স ম রব এসব কথা বলেন।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ডাকসু সভাপতি রব। অবশ্য পরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মন্ত্রী হয়েছিলেন আ স ম রব আবদুর। বর্তমানে সরকারবিরোধী 'বৃহত্তর ঐক্য জোট' গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন এই নেতা।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হিসেবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন- জানতে চাইলে আ স ম রব বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রশ্নে ২০১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। দলীয় সরকারের অধীনে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে না- এ মৌলিক দাবির উত্থাপক আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করে এটি আদায় করা হয়। অথচ এখন ক্ষমতার স্বার্থে আওয়ামী লীগ তাদের অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা থেকে সরে এসেছে। ২০০৬ সালে বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেয়নি আওয়ামী লীগ। কারণ কেএম হাসানের বিরুদ্ধে অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। অথচ বিচারপতি হিসেবে অন্তর্নিহিত সৎগুণ দিয়ে বহু বছর বিচারপতি পদে এবং প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তা সত্ত্বেও তিনি 'নিরপেক্ষ' হতে পারেননি। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ কোনোটাই হওয়া বাস্তবতার কারণে সম্ভব নয়। যদি কোনো এককালে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হাসানকে বিশ্বাস না করেন- তাহলে আমরা কী করে বিশ্বাস করব শেখ হাসিনাকে। তিনি কীভাবে দলীয় সভাপতি এবং সরকারপ্রধান থেকেও নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকবেন?

তাহলে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কীভাবে সম্ভব- এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ইতিমধ্যে গোলটেবিল করে আমাদের দলের পক্ষ থেকে নয় দফা উত্থাপন করা হয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন।

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন। নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারও নেই বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর জবাবে আ স ম রব বলেন, কে ঠেকাবে? আমরা তো নির্বাচন করতে চাই। আমাদের প্রস্তাবমতো জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবেন- এ ছাড়া উপায় নেই।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে ব্যাপক আন্দোলনে দেশ অচল করে দিয়েছিল। সংবিধানকে সুবিধামতো ব্যবহারের আওয়ামী প্রবণতা জাতিকে চরম সাংবিধানিক সংকটে ফেলেছে।

প্রধানমন্ত্রী নতুন 'বৃহত্তর ঐক্য জোট'কে স্বাগত জানিয়ে এ জোটের 'অগণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় যাওয়ার ইচ্ছা' রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। এ ব্যাপারে একসময়ে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সহায়তাকারী আ স ম রব বলেন, জোটকে স্বাগত জানানোর জন্য তাকে (প্রধানমন্ত্রী) ধন্যবাদ। তবে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি বা পন্থাকে আমরা সমর্থন করি না। দলাদলি, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, সন্ত্রাস- দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। উই ওয়ান্ট জাস্টিস।

সরকার যদি তাদের দাবি না মানে তাহলে কী করবেন- নির্বাচন বর্জন নাকি প্রতিহত করতে আন্দোলনে নামবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জনগণই মূল শক্তি। গণজাগরণ সৃষ্টি হলে কোনো সরকারই তার অহঙ্কারের প্রাচীর দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

বিএনপির সঙ্গে তাদের 'বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য' কবে নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কার সঙ্গে কার বৃহত্তর ঐক্য হবে, তা সময়ের মৌলিক প্রয়োজনেই নির্ধারিত হবে এবং যথাসময়ে আত্মপ্রকাশ করবে।

বৃহত্তর ঐক্যের রূপরেখা তৈরিতে কোন বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঐক্যের ভিত্তি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ও কাঠামোগত সংস্কার। রাষ্ট্র হবে নৈতিক ও মানবিক। অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে জনগণের সাম্য নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক মর্যাদা হবে সব আইনের উৎস। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, পরিবর্তন হবে নির্মম স্বৈরাচারী অমানবিক শাসন ব্যবস্থার।

ঐক্য গড়ার পথে কী কী অন্তরায় কাজ করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাষ্ট্র গভীর সংকটে। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত এবং রক্তে পাওয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকার নিয়েই সব বাধা দূর করতে হবে।

জামায়াতকে নিয়ে অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আপত্তি রয়েছে, অন্যদিকে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে ড. কামাল হোসেনের আপত্তি রয়েছে বলে গুঞ্জন আছে। এ প্রসঙ্গে আ স ম রব বলেন, জামায়াত প্রশ্নে আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট। বি. চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, আমি ও মাহমুদুর রহমান মান্না প্রতিনিয়ত সভা-সেমিনার, রাজপথের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছি।

বিএনপির সঙ্গে ঐক্য হলে শীর্ষ নেতা কে হবেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে যাচ্ছি। আন্দোলনেই নির্ধারিত হবে জনগণের নেতা কে হবেন।

বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক গুণগত পরিবর্তন হবে কি-না- জানতে চাইলে এই সাবেক মন্ত্রী বলেন, অবশ্যই। আমাদের নয় দফা কর্মসূচি প্রমাণ করে রাজনৈতিক গুণগত উন্নয়ন হবে। যুক্তফ্রন্ট-গণফোরামসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল দল-সংগঠন, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা; বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সভা-সমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এসবের ওপর আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের কর্তৃত্বের অবসান করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার উপযোগী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য আনা, সংসদীয় প্রক্রিয়ার সংস্কার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, সংবিধানের যুগোপযোগী সংস্কার, ন্যায়পাল নিয়োগ, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সংলাপ, সংসদ ভেঙে মন্ত্রিসভা বাতিল করা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বন্ধ ও মুক্তি; কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার; তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দরসহ জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন।

ঐক্য হলে বিএনপির কাছে কয়টি আসন চাইবেন? জবাবে আ স ম রব বলেন, এসব বিষয়ে বলার সময় এখনও আসেনি।

প্রধানমন্ত্রী হাস্যরসাত্মকভাবে বলেছেন, অসময়ে নীরব, সুসময়ে সরব তিনি হলেন আ স ম রব। এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জেএসডি সভাপতি বলেন, এ ধরনের উপলব্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন। তবে উনাকে স্মরণ করে দিতে চা- প্রথমত, পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্য থেকে দেশকে স্বাধীন করার তাগিদে পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুর মাঝে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন যদি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনাবোধে সুসময় মনে হয় তাহলে কিছু না বলাই ভালো। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর হিমালয়সম জনপ্রিয়তা ও অগাধ ক্ষমতা থাকার পরও রাজনৈতিক কারণে তার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন দেশে প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলাম, যার নাম 'জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল'-জাসদ।

আ স ম আবদুর রব আরও বলেন, রক্ষীবাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন সয়ে সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছি। এসব নিশ্চয়ই সুসময় ছিল না। তৃতীয়ত, কর্নেল তাহের হত্যা মামলায় কারাদণ্ডসহ বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে প্রায় ১০ বছর রাজনৈতিক কারণে কারাগারে ছিলাম। এগুলোর কোনোটাই সুসময়ের চিহ্ন বহন করে না। চতুর্থত, ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ একটি ভোটের অভাবে সরকার গঠনের সংকটে পড়েছিল, সেই অসময়ে আমি নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনে ক্ষুদ্র ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা, সেই বিবেচনা আমি সবসময় রাখি। ফলে অপ্রিয় বক্তব্য বা মন্তব্য থেকে বিরত থাকি।



বাংলা ভাষাকে ধারণ করে রেখেছে বাংলাদেশ: গর্গ চট্টোপাধ্যায়

 অনলাইন ডেস্ক

গর্গ চট্টোপাধ্যায়। ইন্ডিয়ান স্টাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং ভাষা অধিকার আন্দোলনের ...

১২ নভেম্বর ২০১৮

এক দল সংসদে থেকে নির্বাচন করলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে না

 আবু সালেহ রনি

সংবিধান সংবিধান না করেই সুষ্ঠু ও সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ...

০৬ নভেম্বর ২০১৮

৭ দফার একটি না মানলেও বিজয় ঐক্যফ্রন্টেরই

 শাহেদ চৌধুরী

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর ...

০৬ নভেম্বর ২০১৮

ভাঙন রোধে নদীর গতিপথ বুঝতে হবে: ড. মমিনুল হক

 অনলাইন ডেস্ক

নদীমাতৃক বাংলাদেশে 'নদী ভাঙন' একটি বাস্তবতা। প্রতি বছর হাজার হাজার ...

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮