নদীতে কুড়ানো নুড়ি

বঙ্গবন্ধুর নদী বাইগার

 প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৮ | আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৮      

বেশ কয়েক বছর আগে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের কথা। বাগেরহাট থেকে ঢাকা ফেরার পথেই ঠিক করেছিলাম যত তাড়াই থাকুক, এবার আর না দেখে ছাড়ছি না। মধুমতী নদীতে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিকালেই ভেতরে ভেতরে উত্তেজেনা বোধা করছিলাম। খানিকটা প্রকাশও হয়ে গিয়েছিল বোধহয়। সহযাত্রী বন্ধু বললেন, এত নদী দেখেও আপনার নদী নিয়ে উত্তেজনা কমে না! আমি উত্তর না দিয়ে রহস্যময় হাসি দেই।

আমি তো জানি, নদীটি আর দশটি নদী থেকে কেন আলাদা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের শৈশবের নদী নিয়ে আমার আগ্রহ পুরানো। সেই সূত্রে জেনেছিলাম মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর শৈশবের নদী অসমাবতী। ভারত তাদের রাষ্ট্রের স্থপতির শৈশবের ছোট্ট নদীটিকেও যথাসাধ্য সংরক্ষিত রেখেছে। অসমাবতী পরিণত হয়েছে পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশবের নদীটি যেন অনেকের অচেনা। খানিকটা অবহেলিতও নয় কি? 

বঙ্গবন্ধুর শৈশবের নদীর নাম 'বাইগার'। এটি অন্তত আরও দুই নামে পরিচিত- বাগিয়া বা বাঘিয়া। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার বর্ণি বাঁওর থেকে উদ্ভূত। পরে গোপালগঞ্জের বিল অঞ্চল ছুঁয়ে বঙ্গবন্ধুর সমাধি এলাকার পাশ দিয়ে ডুমুরিয়ার কাছে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে ছোট্ট ও স্বচ্ছতোয়া নদীটি। একধারা মধুমতিতে নেমেছে, অপরটি চলে গেছে কোটালিপাড়ার দিকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'আমার পিতা শেখ মুজিব' প্রবন্ধে লিখেছেন- 'বাইগার নদীর তীর ঘেঁষে ছবির মত সাজানো সুন্দর একটা গ্রাম। সে গ্রামটির নাম টুঙ্গিপাড়া। বাইগার নদী এঁকে বেঁকে গিয়ে মিশেছে মধুমতি নদীতে। এই মধুমতি নদীর অসংখ্য শাখা নদীর একটা হলো বাইগার নদী। নদীর দু'পাশে তাল তমাল, হিজল গাছের সবুজ সমারোহ। ... আমার আব্বার শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠো পথের ধুলোবালি মেখে। বর্ষার কাঁদা পানিতে ভিজে।'

সেই ছায়া-ঘেরা, সবুজ জনপদ টুঙ্গিপাড়ায় যখন পৌঁছলাম, তখনও যেন এলাকাটি আড়মোড়া ভেঙে জাগেনি। সেপ্টেম্বরের সকালে বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ ঘিরে ছিল শরতের স্নিগ্ধতা। পুরো কমপ্লেক্স ঘুরে পেছন দিকের ফটক দিয়ে টুঙ্গিখাল পেরিয়ে হাঁটা দূরত্বে টুঙ্গিপাড়া থানার সামনের বাইগার নদীর তীরে গিয়ে দাঁড়ালাম।

দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে যেন বিস্ময় ও বিষাদ খেলা করছিল মনে। বঙ্গবন্ধুর শৈশবের নদীটি দেখার জন্য প্রায় এক দশক ধরে পরিকল্পনা করছিলাম। এই নদীতে মিশে রয়েছে তার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। শিশু মুজিব এই নদীতেই সাঁতার কেটে, স্নান করে, বৈকালিক হাওয়া খেয়ে বড় হয়েছেন। পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, সেই নদীর এই হাল!


নদীতীরে একটি অর্ধসমাপ্ত ঘাট। অদূরে বালাডাঙ্গি সেতু পেরিয়ে টুঙ্গিপাড়া থেকে পাকা সড়ক চলে গেছে কোটালীপাড়ার দিকে। সবে বর্ষাকাল শেষ হয়েছে বলে নদীটিতে তখনও পানি টলমল ছিল। কিন্তু ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, নদীসুলভ স্রোত যেন বড়ই দুর্লভ। উজানে ও ভাটিতে যতদূর চোখ যায়, চাক চাক কচুরিপানা। পানি হাতে নিলে বোঝা যায়, শরতের সোনাঝরা সকালের রোদে অদূর থেকে স্বচ্ছতোয়া মনে হলেও আদতে মজা রঙের বদ্ধ পানি। অভিজ্ঞতা থেকে জানি, শুকনো মৌসুমে যখন উৎসে পানির টান পড়বে; তখন এই পানি আরও ঘোলা হবে। আরও জেঁকে বসবে কচুরি পানা ও শ্যাওলা। আরও কমে যাবে টিমটিমে প্রবাহ।

আমরা যখন নদী দেখছিলাম, ছবি তুলছিলাম, পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন কৌতুহলী ভ্যান চালক। শুকনো পাকানো চেহারা, দাঁড়িতে সাদার ভাগ বেশি। পরনে ফতুয়া ও লুঙ্গি। এতদিনে তার নাম ভুলে গেছি। তিনি খানিকটা বিস্মিত। বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ ছেড়ে আমরা নদীর কাছে কী করছি!

প্রশ্নটা মুখ ফুটে করেই ফেললেন। বুঝতে পারছিলাম তার তাড়া নেই। আবার দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে আমাদের কাণ্ডকারখানার শেষ দেখার ধৈর্য্যও নেই। বললাম, নদী দেখি। তার ভাষ্য, নদীটি আর আগের মতো নেই। আগে এই পথে নৌকা তো বটেই, বড় বড় লঞ্চ চলত। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুম ছাড়া নৌকা চালানো ভার। এই নদী দেখে কী হবে!

-মহাত্মা গান্ধীর নাম শুনেছেন? আমি আলাপ তুলি।

- শুনবি না ক্যা?

- ওনার ছোটবেলার একটা নদী আছে। সেটা কেমন জানেন?

- দ্যাশের নদীর খবর রাকতি পারি না, আবার বিদ্যাশ!

- কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত এই নদী তো ভালো রাখা উচিত না? 

- উচিত হবি না ক্যা! কিন্তু যাগো রাখার কথা, তাগো সেই তাল নাই।

- আপনাদের এলাকার লোকজন এই নদী পরিস্কার রাখতে পারেন না?

- নদী পরিস্কার রাকপে কীসের জন্যে? ভ্যানের সিটে উঠতে উঠতে বললেন। তারপর প্যাডেলে সূচনা-ভর দিয়ে বললেন 'সব খালি খায়ার তালে আছে'!

ফিরতে ফিরতে ভাবি। টুঙ্গিপাড়া কেবল বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি নয়, শেষ নিদ্রাস্থলও। প্রকৃতি কেবল সেখানে একটি নয়নাভিরাম নদীই দেয়নি, নদীটিতে জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর শৈশব ও কৈশোরের অমূল্য স্মৃতি। জাতির জনকের স্মৃতিময় বাইগার সংস্কার ও সংরক্ষণ কি কঠিন কাজ? 


লেখক: সাংবাদিক ও নদী-গবেষক

skrokon@gmail.com 




সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী ...

০১ আগস্ট ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮