নদীতে কুড়ানো নুড়ি

রাতের রাইনে প্রদোষের প্রেরণা

 প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০১৮ | আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৮      

খটকা লেগেছিল, এত আয়োজন করেও শেষ পর্যন্ত রাইন দেখতে পাব তো? উল্লাসকে বাংলায় জিজ্ঞেস করি, আপনার বন্ধু রাস্তা চেনেন তো! আমাকে আশ্বস্ত করা হয়, তিনি খাঁটি ডাচ অ্যাংরি ইয়াং। লং ড্রাইভ, শর্ট ড্রাইভ দিয়ে এসব এলাকা তার ভাজা ভাজা করে খাওয়া শেষ। 

রাতের অন্ধকারে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছিল ডরদ্রেখট থেকে রটারডামের দিকে, এপপ্রেসওয়ে ধরে। ঘড়ির কাঁটায় রাত বেশি না; ৮টা সবে পার হয়েছে। কিন্তু ডাচ শীতের প্রকোপে সড়কে গাড়ির সংখ্যা সীমিত, দৃষ্টিরেখায় কুয়াশার পাতলা পরত। আমাদের গন্তব্য রটারডামের মতো নিশিজাগা নগরের কাছে সবে সন্ধ্যা হলেও সড়কে যেন নেমে এসেছে নিশুতি রাত।

আমরা মানে তিনজন। আমি নেদারল্যান্ডসে এসেছি জেনে স্নেহভাজন রাফিউজ্জামান উল্লাস তার বন্ধুকে নিয়ে জার্মানির সীমান্ত শহর ক্লেভে থেকে দেখা করার জন্য চলে এসেছেন। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছেন তিনি। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও 'নদীময়'। 'রাইন-ওয়াল ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স' একই নদীর দুই ধারাকেই ধারণ করেছে।

ইউরোপের রাইনের সঙ্গে আমাদের সুরমা-কুশিয়ারার বেশ মিল। বরাক যেমন ভারত থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে সুরমা-কুশিয়ারায় বিভক্ত হয়ে নানা পথ ঘুরে ভৈরবের কাছে ফের মিলিত হয়ে মেঘনা নামে সাগরে প্রবাহিত হয়েছে; তেমনই রাইনও জার্মানি থেকে নেদারল্যান্ডসে এসে নেডার রিজিন (বা রিইন) ও ওয়াল নামে দুই ধারায় বিভক্ত হয়েছে। নানা নামে নানা পথ ঘুরে আবার দুই নদীর দুটি ধারা ফের রটারডামের কাছে গিয়ে মিলিত হয়ে 'নিউয়ে মাআস' নামে সমুদ্রে নেমেছে। ডাচ উচ্চারণে 'ওয়াল' নদীর নাম 'বাআল'।

উল্লাসের বন্ধুর নাম ডেনিস উইচম্যান। ডাচ উচ্চারণে তার নামের শেষাংশও 'বিচম্যান'। বিদেশে বসে ঘনিষ্ঠজনের দেখা পাওয়ার সুযোগ যত লোভনীয়ই হোক; রাইন নদী দেখার আকাঙ্ক্ষা যত প্রবলই হোক; এতদূর ড্রাইভ করে ডরদ্রেখটে এসে আবার রটারডামে যাওয়ায় সায় ছিল না আমার। কিন্তু উল্লাসকে সে কথা মানাবে কে! আমাকে রাইন দেখিয়েই ছাড়বেন তিনি। ইন্দোনেশিয়ান রেস্তোরাঁ 'ম্যুলিয়া' থেকে প্রাচ্য-পদে পেট ভরিয়ে আমরা তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম।


এপপ্রেস ওয়েতে যেতে যেতে খটকা লেগেছিল পথের দূরত্ব অনুমান করে। কমবেশি ২৫ কিলোমিটার রাস্তায় এত সময় লাগছে কেন? পথ ভুল করিনি তো আমরা? ডেনিস বললেন, তিনি আমাদের কিন্ডারজিকস বায়ুকল দেখাতে চান। আঠারো শতকে স্থাপিত এই উইন্ডমিল এখন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্য। একটু আমতা আমতা করে ডেনিস তার ইচ্ছে প্রকাশ করেন; ২৩ কিলোমিটার দূরের ওই স্থান দেখিয়ে তবেই রটারডামে যেতে চান। আমি ও উল্লাস প্রায় সমস্বরে আঁৎকে উঠি।

গাড়ি আবার ছুটে চলে রটারডামের পথে। কিন্তু একটু যেন ঘোরাপথেই শহরে প্রবেশ করেন, যাতে বিখ্যাত স্থাপত্য 'কিউব হাউজ' দেখা হয়ে যায়। আমরা বলি, এবার তবে রাইন সন্দর্শন হোক। তিনি একটা জায়গায় গাড়ির গতি ধীর করে বলেন, এই হলো 'কোলসিঙাল'। ডাচ রেনেসাঁর প্রতীক, বিশ শতকের গোড়ায় নির্মিত টাউন হল। আমার কাছে তো সব ভবনই একই মনে হয়; একবার তাকিয়ে তাড়া দিই রাইনে যাওয়ার জন্য।

ডেনিস গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে হল্যান্ড ফুটবলের গুণকীর্তন শুরু করেন। তার পর বলেন, এই শহরেই আছে নেদারল্যান্ডসের প্রাচীনতম ফুটবল ক্লাব 'স্পার্টা রটারডাম'। তার ভাষ্যে, সে এক দারুণ জায়গা। সেখানকার স্টেডিয়ামের পাশের গলিতে দাঁড়িয়ে ফুঁকতে খুবই মজা। তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল যুক্ত করে ঠোটের ওপর চেপে ধরে বোঝায়। বলি, ভাই মাফ চাই, দোওয়াও চাই; এই রাতে স্টেডিয়াম দেখার ইচ্ছে নেই, আমাকে রাইন নদীতে নিয়ে চলো। রাত ১১টা নাগাদ আবার আমাকে ডরদ্রেখটের ডেরায় ফিরতে হবে।

ডেনিস মানেন; কিন্তু তার স্থানীয় কোনো আত্মীয়কে ফোন করে সেখান থেকে 'অ্যারাসমাস' সেতু পয়েন্ট যাওয়ার রাস্তা জানতে চান। সেই সেতু কি রাইন নদীর ওপরে? খানিকটা শঙ্কিত আমি জানতে চাই। হুম, সংক্ষিপ্ত জবাব। তারপর সেতুর কীর্তন। হলিউডের বিভিন্ন মুভিতে এই সেতু দেখানো হয়। জ্যাকি চ্যান এখানে শুটিং করতে এসে কী হয়েছিল ইত্যাদি। আমি চুপ থাকি, যাই হোক রাইন দেখতে পেলেই হলো।

শেষ পর্যন্ত আমরা রাইনে পৌঁছি। ততক্ষণে রাত আরও ঘন হয়ে এসেছে। কিন্তু না ঘুমানো রটারডামের আলো ও কোলাহলে সম্পূর্ণ জেগে আছে রাইন। দুই পাশের প্রাচীন ভবন ও নবীন বিনোদনস্থলগুলোর আলো রাইনের বুকে প্রতিফলিত হয়ে এক পরাবাস্তব দৃশ্য তৈরি করেছে। নীলচে আলোর টোপর মাথায় দিয়ে অদূরেই দাঁড়িয়ে অ্যারাসমাস সেতু। যেন আকাশের গায়ে হেলান দেওয়া ক্রিসমাস ট্রি। রাতেও নদীর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্পিডবোট, প্রমোদতরী। তার ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছে অ্যারাসমাস সেতুর আলোকোজ্জ্বল ছায়া। 


আমি ও উল্লাস এদিক-ওদিক দেখছি, ছবি তুলছি। ডেনিসের যেন খুব একটা উৎসাহ নেই। গাড়ি পার্ক করে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছেন শুধু। তার দৃষ্টি রাইনের দুই পাড়ের আলোকোজ্জ্বল ভবন ও চত্বরগুলোতে।

-ডেনিস, নদী দেখবেন না? আমি জানতে চাই।

-রটারডামে এসে রাইন দেখার কী আছে? তার পাল্টা প্রশ্ন।

উল্লাস খানিকটা তটস্থ হন। বন্ধুকে বোঝান- আমার কাছে নদী কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ডেনিস বলেন, 'আই নো, আই নো'। কিন্তু তার দ্বিধা যায় না; পরক্ষণেই বলেন, নদী দেখার জন্য রটারডাম ভালো জায়গা নয়।

আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম শতাব্দীপ্রাচীন 'হল্যান্ড আমেরিকা লাইন' ডেকের ওপর। ১৮৭৩ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত এখান থেকেই আমেরিকামুখী যাত্রী ও মালবাহী জাহাজ ছেড়ে যেত। ডাচ অভিবাসীরা এই পথেই আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছিল। ২০০০ সালে এর দপ্তর ভবনটি 'জাতীয় ঐতিহ্য' ঘোষণা করা হয়। ইঙ্গ-মার্কিন মালিকানাধীন ওই কোম্পানি ভবনের একাংশে এখন গড়ে উঠেছে 'হোটেল নিউইয়র্ক'। জায়গাটা স্বল্পতম সময়ে কাছ থেকে নদী দেখতে সবচেয়ে উপযুক্ত হলেও সম্ভবত পার্কিং-নিষিদ্ধ এলাকা। সে কারণেই একটি পুলিশ কার অদূরে এসে থেমে হেডলাইট জ্বালিয়ে-নিভিয়ে আমাদের সংকেত দিচ্ছিল দেখে ডেনিস দ্রুত গাড়িতে গিয়ে ওঠেন ও আমাদের তাড়া দেন।

গাড়িতে উঠতে উঠতে ভাবি, তার প্রিয় জায়গাগুলোতে না গিয়ে রাইন দেখতে গেছি বলে ডেনিসের মন খারাপ? ডরদ্রেখট ফেরার পথে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে তার কাঁধে হাত রেখে বলি, চিন্তা করবেন না। আমি আরেকবার রটারডাম এলে স্টেডিয়াম, বায়ুকল, সেন্ট্রাল স্ট্রিট- সব দেখব আপনাকে সঙ্গে নিয়েই।

-না না, আপনাকে রাইন দেখাতে পেরে আমি খুবই খুশি। কিন্তু কথা হচ্ছে, রটারডামে রাইন দেখে আপনি মজা পাবেন না। এটা নদী নয়, অন্য কিছুর উপভোগের শহর, ম্যান!

-তাহলে কোথায় যেতে হবে?

-ডেকে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আপনি পানির শব্দ শুনেছিলেন? উত্তর না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞাস করে।

-হ্যাঁ, শুনেছি। মনে পড়ল, স্পিড বোট ও প্রমোদতরীর ঢেউ ডেকের গায়ে লেগে ধপাস ধপাস শব্দ হচ্ছিল।

-এই শব্দ রাইনের নয়, স্পিডবোট ও প্রমোদতরীর ঢেউ থেকে আসা। আমার ভালো লেগেছে এবং আসল রাইনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

-আসল রাইন কোথায়?

-'রিয়েল রাইন' দেখতে হলে আপনাকে আমার গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। আরনেম এলাকায়, শহর থেকে দূরে। সত্যিকারের ডাচ গ্রাম। আমার মা-বাবা সেখানেই থাকেন। আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে রাইনে সাঁতার কেটে ও তীরে সাইকেল চালিয়ে। আই নো সাউন্ডস অব রিয়েল রাইন।

-ঠিক আসে। আরেকবার আসব এবং উল্লাসসহ আপনার সত্যিকারের রাইন দেখতে যাব।

-রাইনের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে আমাদের বাড়িতে কয়েক দিন থাকতে হবে। আমাদের নিজেদের খামার রয়েছে। সেখানে ফসল ও সবজি জন্মে, আমাদের ভেড়ার পাল রয়েছে। আমাদের বাড়ির পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে সুন্দর রাইন- নিশ্চিত ভালো লাগবে আপনার।

উল্লাস আগেই বলেছিলেন, ডেনিস থাকেন জার্মানির ক্লেভে শহরে। অল্প বয়সে অর্থ জমিয়ে নিজেই একটি বাড়ি কিনেছেন। শৈশবের মতো সেই বাড়ির পাশ দিয়েই বইছে রাইন নদী। আর রয়েছে তার গাড়ি চালানোর শখ। কাজও করেন একটি বিশ্বখ্যাত গাড়ির কারখানায়। 

-কেমন সুন্দর? আমি জানতে চাই।

-শান্ত, পাখিবহুল ও মাছে ভরা নদী। পাশে ঢেউ খেলানো ভূ-প্রকৃতি। নদীর পাশ দিয়ে রাস্তা। অনেকে আমাদের এলাকাকে নেদারল্যান্ডসের সুইজারল্যান্ড বলে। আপনি আসুন একবার।

-তো, আপনার রিয়েল রাইনের শব্দটা কেমন?

-সেই শব্দ রাইনের মতোই, আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। সকালে বা সন্ধ্যায় নয়; আপনাকে যেতে হবে খুব ভোরে। যখন আর কোনো শব্দ থাকে না, তখন রাইনের শব্দ শোনা যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও নদী-গবেষক

skrokon@gmail.com



সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী ...

০১ আগস্ট ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮