নদীতে কুড়ানো নুড়ি

বঙ্গীয় তটিনী ও বার্মিজ তরুণী

 প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৮ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮      

গড়াই নদীতে লালন শাহ সেতুর ওপর

অন্যরা সহাস্যে মেনে নিলেও কেবল বার্মিজ তরুণি আমার কথায় সায় দিচ্ছিলেন না। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসের কথা। মিয়ানমার থেকে জনা ছয়েক পরিবেশকর্মী এসেছেন বাংলাদেশের নদ-নদী দেখতে। তরুণী তাদেরই একজন। দলটিকে নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নদী দেখাচ্ছি আমি। ওই নদীর প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করছি। সঙ্গে সঙ্গে সেই আপ্তবাক্যটিও 'হাতে-কলমে প্রমাণ' করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু মুখে না বললেও ভাবেসাবে দলের একমাত্র নারী সদস্য একমত হচ্ছিলেন না।

কথাটা আমি সুযোগ পেলেই বলি। বিশেষত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তরুণদের উপস্থিতিতে; রিভার অলিম্পিয়াডের নানা পর্বে, রিভার ক্যাম্পে এই বক্তব্যে তরুণরা উচ্ছ্বসিত হতো। বার্মিজ বন্ধুদেরও বলছিলাম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে- নদীতে গেলে মন ভালো হয়। খাবারে রুচিও বাড়ে। এসব 'ক্লিনিক্যালি প্রমাণিত'। মন খারাপ থাকলে, বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য হলে, বিষন্নতা ভর করলে, ক্ষুধামন্দা দেখা দিলে, নদীর পাড়ে চলে যান মন ভালো হবে।

সদ্য গণতান্ত্রিক পরিবেশে এসে প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্যোগী মিয়ানমারের ওই দলটির কাছে এসব কথা স্বভাবতই নতুন ছিল। বাংলাদেশের নদী, এর বহুমাত্রিকতা, উজানের দেশের সঙ্গে জটিলতা- প্রভৃতি বিষয়ে জানতে তারা খুবই আগ্রহী। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। আমিও মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে উজ্জীবিত। আর প্রত্যেক নদী দেখা শেষে একটি প্রশ্ন করি- ভালো লাগছে না? তারা প্রায় সমস্বরে বলেন 'অবশ্যই!'

তিস্তা ব্যারাজ

শুধু তরুণী বিষন্ন। কুষ্টিয়ায় গিয়ে গড়াই নদী দেখাই, রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে গিয়ে গড়াইয়ের সঙ্গে ঠাকুরের সম্পর্কের কথা বলি; তার মন ভালো হয় না। ইশ্বরদীতে গিয়ে গঙ্গা নদী, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন সেতু দেখে অন্যরা উচ্ছ্বসিত, তরুণী চুপচাপ, মনমরা। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রাচীনত্ব ও গুরুত্ব, লালন সেতুর তলায় গিয়ে দেখা ভূমিকম্পনিরোধক প্রযুক্তি সফরকারীদের চমকৃত করে; কিন্তু তিনি নির্বিকার। নীলফামারী গিয়ে তিস্তা ব্যারাজ দেখে সবাই উত্তেজিত, তিনি ধুধু বালুচরের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবেন। লালমণিরহাটের পাটগ্রাম গিয়ে পুরাতন ধরলা দেখে সেই ভাবনা যেনো আরও গভীর হয়। তিনবিঘা করিডোর যেতে পথে পরে ছোট্ট নদী সানিয়াজান। তাদের বলি, এটাও আন্তর্জাতিক বা অভিন্ন নদী। কিন্তু স্বীকৃত নয়। সবাই হৈ হৈ করে নেমে সানিয়াজানের সঙ্গে ছবি তোলেন; কিন্তু তরুণী গাড়ি থেকেই নামেন না। নদীর মন ভালো করার ক্ষমতা তার কাছে গিয়ে যেনো লোপ পেয়ে যায়।

ঘাঘট, করতোয়া, বাঙালী প্রভৃতি নদী দেখতে দেখতে তিন-চার দিনের সফরের শের্ষ প্রান্তে আমরা সিরাজগঞ্জ পৌঁছাই। বঙ্গবন্ধু সেতুর উজানে সিরাজগঞ্জ শহরের কাছে আমার সামনে আবির্ভূত হয় 'মহানদী' ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা। তার বিশালতা, তার বৈভব, তার গাম্ভীর্য, তার গর্জনের কাছে আগে দেখা নদীগুলো যেনো নস্যি। আগের নদীগুলো ছিল শুকনো, প্রবাহশূন্য, তলদেশ ব্যাদান করে থাকা; আর ব্রহ্মপুত্রে ঘূর্ণি দিয়ে দিয়ে বইছে টগবগে ও টলটলে প্রবাহ। যতদূর চোখ যায় নদী, দিগন্ত রেখা পর্যন্ত নদীরই দখলদারিত্ব। দলটিকে ব্যাখ্যা করি, কেন ব্রহ্মপুত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। কারণ উজান থেকে আসা মোট প্রবাহের অর্ধেকের বেশি আসে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে। 'একদিকে সাকিরা, অন্যদিকে বাকিরা' কপি করে বলা যায়- একদিকে যমুনা চলে, অন্যরা সব একদলে। বড় কথা, এই নদী এখনও 'ইনট্যাক্ট'। উজানে পানি প্রত্যাহারের অভিশাপ এখনও স্পর্শ করেনি। তাদের বলি, অতীশ দীপঙ্কর ও ব্রহ্মপুত্রের সম্পর্কের কথা।

যমুনায় সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধের ওপর

গোটা দল উদ্বেলিত হয় ব্রহ্মপুত্রের বিশালত্ব অনুধাবন করতে পেরে। সেই সুদূর চীন থেকে এসেছে এই নদী! একই নদীর পাঁচ নাম! এবং এই প্রথমবারের মতো প্রতিনিধিদলের তরুণী সদস্যও দৃশ্যত মুগ্ধ। প্রশ্ন করছেন, পানি স্পর্শ করছেন, নদীর সঙ্গে নানাভঙ্গিতে ছবি উঠছেন। হাসছেন, একবার দেখলাম গুনগুন করে গাইছেন। আগের বিষন্নতা উধাও।

ব্রহ্মপুত্র সন্দর্শন শেষে গাড়িতে উঠে তাকে বলি-

- দেখলেন তো, নদী মন ভালো করে দেয়! রিভার ক্যান মেক পিপল প্লিজেন্ট অ্যান্ড হ্যাপি।

- হ্যাভ টু বি ফ্রি ফ্লোয়িং অ্যান্ড ক্লিন ফার্স্ট। নদী তখনই মন ভালো করতে পারে, যখন সেটা ভরা, মুক্তপ্রবাহ ও দূষণমুক্ত থাকে।

বাংলাদেশের তটিনী সম্পর্কে আমার বহুল কথিত আপ্তবাক্যটি পূর্ণাঙ্গ করে বলেন বার্মিজ তরুণী।

লেখক: সাংবাদিক ও নদী-গবেষক

skrokon@gmail.com




সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী ...

০১ আগস্ট ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮