নদীতে কুড়ানো নুড়ি

পুণ্যতোয়ার পঙ্ক তিমির

 প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০১৮      

 শেখ রোকন

আগের রাতে বন্ধু ও সহযোদ্ধা মোহাম্মদ এজাজ যখন সবাহন সঙ্গী হতে রাজি হলেন, তখন তীর্থদর্শনটি হয়ে দাঁড়াল সময়ের ব্যাপার মাত্র। অবতার পরশুরামের লাঙলের ফলা বেয়ে হিমালয়ের কৈলাস থেকে সমতলে নেমে এসেছিল ব্রহ্মপুত্র। হিমালয় থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন জনপদে মিশে রয়েছে মহানদী ব্রহ্মপুত্রের সেই মহাযাত্রার কাহিনী। সেসবের কয়েকটি 'ঘটনাস্থল' সচক্ষে দর্শনের সুযোগও হয়েছিল। কিন্তু বাকি রয়ে গিয়েছিল ঘরের কাছের 'লাঙ্গলবন্দ'। পর্বতমালা, সিন্ধু দেখতে গিয়েছি বটে, ঘরের কাছের শিশির বিন্দুটি চোখ মেলে দেখা বাকিই রয়ে গিয়েছিল।

বিস্ময়ের বিষয়, প্রথম চোখে পড়েছিল শিশিরকণাই। চৈত্রের প্রথমভাগে শীতলক্ষ্যার কাঁচপুর সেতু পার হয়ে। দু'পাশের না শহর না গ্রামে হঠাৎ যেন দৃষ্টিসীমা কমে এসেছিল। প্রথম ভেবেছিলাম, মহাসড়কের দু'পাশে গজিয়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক শিল্প-কারখানার ধোঁয়া। কিন্তু ভ্রম ভেঙেছিল চষা মাঠ ও পাশের গাছগাছালিঘেরা বাড়িগুলোও যখন চোখের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল। বুঝতে পেরেছিলাম, বসন্তকাল বিদায়ের তোড়জোড় শুরু করলেও প্রকৃতি তখনও শীতের মায়া ছাড়তে পারেনি। ধোঁয়া নয়, অদূরের বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো সাদা পাতলা আস্তরণ আসলে কুয়াশার কারসাজি। এক জায়গায় দেখি, রাস্তার পাশের দুর্বার ডগায় শিশির জমে আছে।


মহাসড়কের পাশ দিয়ে থলে হাতে ত্রস্ত পায়ে হাঁটছিলেন এক প্রৌঢ় নারী। তার কাছে লাঙ্গলবন্দের অষ্টমী স্নানের এলাকার হদিস জানতে চেয়েছিলাম। বললেন, তিনিও সেখানেই যাচ্ছেন, পূজা দিতে। লক্ষ্য করি, তাঁতের শাড়ির ঘোমটার নিচে সাদা চুলের আধিপত্য, সিঁথিতে লাল সিঁদুর। হাতে শাখা, খালি পা। তারপর আমাদের উল্টোদিকে আঙুল তুলে মহাসড়কের পাশের প্রায় অনির্দিষ্ট একটি এলাকা নির্দেশ করলেন- 'উই যে, ওইহানে! বিরিজের বোগল দিয়া নাইম্যা যান, সড়কই টাইন্যা নিয়া যাইব।' গাছপালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে তার নির্দেশনা বোঝার চেষ্টা করি। সামান্য আগেই যে সেতু পার হয়ে এসেছি, তারই নিচ দিয়ে বয়ে গেছে একটি প্রবাহ। হালকা কুয়াশার ভেতর দিয়ে নদীতীরে কালচে সবুজ জনপদ চোখে পড়ে। কান পাতলে ভেসে আসে মানুষের কোলাহল।

আস্ত নদীটি আমারও চোখে না পড়ার কারণ কুয়াশা নয়। 'মহানদী' ব্রহ্মপুত্র এতটা শীর্ণকায় হবে, কল্পনা করাও কঠিন। যদিও আরও শীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কয়েক বছর আগে স্নান এলাকা খনন করে খানিকটা প্রশস্ত করা হয়েছে। কিন্তু মূল ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলায় তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। নদী এখানে যেন অনেকটা বদ্ধ জলাশয়। জমাট জল কালো রঙ ধারণ করেছে। এর নাম 'আদি ব্রহ্মপুত্র'। এই ধারা পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের চেয়েও পুরাতন। পরশুরামের লাঙ্গল এখানে থেমেছিল বলেই এর নাম 'লাঙ্গলবন্দ'। 


মিনিট কয়েকের ড্রাইভে অকুস্থলে পৌঁছে দেখি, সার বেঁধে চলছে নারী, পুরুষ, শিশু, প্রৌঢ়। ঘুমজাগা চোখ ও অবিন্যস্ত পোশাক বলে দেয়, তারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন। তখন সবে সকাল ৭টা। লগ্ন শুরু হবে ১০টার পর। কিন্তু কেউ কেউ আরও আগে থেকেই এসেছেন। রাস্তার পাশে পাতা বিছানায় শুয়ে-বসে তখনও আড়মোড়া ভাঙছেন। লগ্ন শুরু হলেই 'পুণ্যতোয়া' ব্রহ্মপুত্রে ডুব দিয়ে আগে আগে কেটেও পড়বেন। এখানে ১৩-১৪টি নির্দিষ্ট ঘাটে পুণ্যার্থীরা মন্ত্রপাঠ করে ডুব দিয়ে 'পাপমোচন' করে। আগেই জেনেছিলাম, অষ্টমী স্নানের দিন কমবেশি ১০ লাখ মানুষের সমাগম হয়ে থাকে।

আমরা যখন পৌঁছলাম, তখনও সকাল ৮টা বাজেনি। লগ্ন শুরু সোয়া ১০টা থেকে। বিভিন্ন ঘাটের কাছে প্যান্ডেল সাজিয়ে পুণ্যার্থীদের 'সেবা' দিচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন। শুরুতেই 'বাংলাদেশ লোকনাথ ব্রহ্মচারী সেবক সংঘ' প্যান্ডেল। সেখানে দূর থেকে আসা পুণ্যার্থীরা শুয়ে-বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। রয়েছে সকালের খাবার হিসেবে বিনামূল্যের চিড়া ও গুড়। পাশেই বড় বড় ডেকচিতে দুপুরের ডাল, ভাত, সবজি রান্না চলছে।


পাশের ঘাটে অবশ্য তখনই আসন পেতে বসে গেছেন পুরোহিতরা। তাদের একজন শ্রীধাম চক্রবর্তী। দিন-রাত ধরে পুণ্যার্থীরা এসে তাদের মাধ্যমে ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে ডুব দিতে যাবে। প্রতিবছর তিনি চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ড থেকে এখানে আসেন। শৈশবে এসেছেন বাবার সঙ্গে। গত কয়েক বছর ধরে তার পুত্র সঙ্গে আসছেন। পুণ্যার্থীদের হয়ে পূজা-অর্চনা বা মন্ত্রপাঠ করিয়ে যে দক্ষিণা পান, তা নেহাত কম নয়। লগ্ন শুরু না হলেও কেউ কেউ তখনই ডুব দিচ্ছেন। আমরা থাকতে থাকতেই রংপুরের শিবের বাজার থেকে এলেন দুলাল মোহন্ত। জামা-কাপড় খুলে গামছা কোমরে পেঁচিয়ে ডুব দিয়ে শ্রীধাম চক্রবর্তীর কাছে মন্ত্রপাঠ করে ফের গেলেন ডুব দিতে। যত বেলা বাড়বে ভিড় বাড়তে থাকবে। আদি ব্রহ্মপুত্রের কালো জল, ঘোলা হতে হতে শেষ দিকে তরল কাদায় পরিণত হবে। 

তাড়া থাকলে লগ্ন শুরু না হলেও সূর্যোদয়ের আগে ডুব দেওয়ায় শাস্ত্রে নিষেধ নেই, ব্যাখ্যা করছিলেন শ্রীধাম চক্রবর্তী। মনের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়ানো প্রশ্নটি তার কাছেই জানতে চাই- এই ঘোলা জলে স্নান করলে, পাপ মোচন হবে বটে। শরীর খারাপ করবে না?

- বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর! ধর্মকর্ম শাস্ত্রের বিষয়। পানি কেমন দেখার বিষয় নয়। তিনি হাসতে হাসতে বলেন।

- কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের পানি পরিস্কার থাকলে আরও ভালো হতো না!

- অবশ্যই ভালো হতো। এখন সবাই ডুব দিচ্ছে যে। কিন্তু দেখেন কেমন নাক ধরে। বিশ বছর আগেও আমি নিজে এই নদীতে ধার দেখেছি যে! ওইখান অবধি স্রোত ছিল। হাত বাড়িয়ে ওপারের গড়ে ওঠা বসতিগুলো দেখান তিনি। 

- পবিত্র নদীর এমন দশা নিয়ে শাস্ত্রের কোনো বিধান নেই? আমিও হাসতে হাসতে জানতে চাই।

- শাস্ত্র তো নদীকে পবিত্র বলেছে। শাস্ত্র বলে দিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র তোমার দেবতা, শুধু নদী নয়।

- এই দেবতাকে যারা কলুষিত করছে, তাদের কী হবে!

- তারা পাপী, মহাপাপী! সব নদীই দেবতা। কারণ তারা মানুষ ও জীবজন্তুর তৃষ্ণা মেটায়। এই নদী যারা ময়লা করে, মেরে ফেলে তারা নিশ্চিত নরকে যাবে।

- আর দেবতাকে যারা বাঁধ ও ব্যারাজ দিয়ে আটকে রাখতে চায়? তাদের কী হবে? মুখের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নে তার অভিব্যক্তি বুঝতে চাই ভালোভাবে।

আগের মতো চট করে উত্তর দিলেন না। যেন খানিকটা আনমনা। আমার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নদীর দিকে তাকালেন। ততক্ষণে সূর্য আরও ওপরে উঠেছে। গ্রামের ছায়ায় ঢাকা পড়া নদীতে চকচক করছে আলো। তাতে পানিতে কালো সরের ফাঁকে ফাঁকে পরিস্কার রেখা আরও স্পষ্ট। অদূর দিয়ে যাওয়া নৌ পুলিশের টহল নৌকার ঢেউ পাড়ে এসে ভাঙছে। ঢেউয়ের মাথায় মাথায় চকমক করছে সূর্যের প্রতিফলন। তারপর আমাকেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন- নদী মা না? মাকে কেউ আটকাতে পারে?

খানিকটা থেমে বললেন- 'শোনেন, ব্রহ্মপুত্রকে দেবতারা নামিয়ে এনেছেন। তার পথ মানুষ আটকাতে পারবে না!' তারপর উদিত সূর্যের দিকে প্রণাম করলেন। নদীতে প্রতিফলিত সূর্যের আলোয় তার ফর্সা মুখমণ্ডল তখন লাল টকটকে। 

লেখক: নদী গবেষক


  • সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

    সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

  • ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

    ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

  • মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

    মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

  • নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

    নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

  • নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা

    নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা


সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী ...

০১ আগস্ট ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮