নদীতে কুড়ানো নুড়ি

মানুষের বর্ষা, নদীর বসন্ত

 প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০১৮ | আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৮      

 শেখ রোকন

চিলমারী ঘাট। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তোলা ছবি

আমরা নদী ও মানুষের মিল খুঁজি। তুলনা করে নানা কথা ও কাব্য তৈরি করি। কিন্তু বৈপরীত্যের কথা আমাকে বলেছিলেন এক সঙ্গীত সাধক। আমাদের অঞ্চলে বলে 'বয়াতি'। নিছক সঙ্গীত নয়, যিনি গানের মধ্য দিয়ে দর্শন বয়ান করেন। সাধকের নাম জানা হয়নি। দশক দেড়েক আগের কথা। গ্রীষ্ফ্ম না বর্ষাকাল ছিল, তাও মনে নেই। শুধু নদী ও বৃষ্টিসম্ভবা আকাশের কথা মনে আছে।

মনে আছে, মেঘলা আকাশের নিচে বসে ছিলাম চিলমারী ঘাটে। রৌমারীর নৌকার জন্য অপেক্ষা। সকালেরটা মিস করেছি, বিকালেটার জন্য অপেক্ষা। ব্রহ্মপুত্রের অপর পারের দুই উপজেলা রৌমারী ও রাজীবপুরের সঙ্গে কুড়িগ্রামের বাকি জেলার যোগাযোগ এই নদীপথেই।

চিলমারী-রৌমারী নৌকা যোগাযোগ কয়েক শতাব্দী-প্রাচীন। শৈশবে নিজেও দুই একবার দাঁড়-পালের নৌকায় বিশাল নদী পাড়ি দিয়েছি। সকালে রওনা হয়ে সন্ধ্যায় চিলমারী পৌঁছানো যেত। পথে কোনো চরে থামিয়ে চলত মাঝিদের রান্নাবান্না। সে রান্নার স্বাদ মনে নেই। হলুদ টকটকে ঝোলের মধ্যে আধা ডুবন্ত লাল মুলা এখনন জ্বলজ্বল করে। বিকল্প হিসেবে চিড়ে ভিজিয়ে গুড় ও বিচি কলা দিয়ে খাওয়ার স্মৃতিও অমলিন।

পরবর্তীকালে, নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত 'শ্যালো বোট' এসেছিল। তাতে নদীপথের দূরত্ব ১২-১৩ ঘণ্টা থেকে আড়াই-তিন ঘণ্টায় নেমেছিল। কিন্তু চিলমারী বা রৌমারী ঘাটের অপেক্ষায় ছেদ পড়েনি তখনও। সকালের 'সিরিয়াল' ধরতে না পারলে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা। 

ফুলছড়ি ঘাট। ২০১৮ সালের  এপ্রিলে তোলা ছবি 

ফেসবুক আসার আগে কোথাও নিঃসঙ্গ অপেক্ষার প্রহর কাটানোর অন্য ব্যবস্থা ছিল। এখনও কখনও কখনও আমি সাধারণত চারপাশের মানুষ দেখি, মনোযোগ দিয়ে। তাতে যেমন সময় কাটে, তেমন সময়কেও বোঝা যায়। ঘাটে স্থানান্তরযোগ্য দোকানের কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলাম। দেখি, অদূরেই আরেকটি চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসা একজন আধা-জটাধারী। লুঙ্গি ও ফতুয়া মলিন। ব্রহ্মপুত্রের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ঢেউ গুনছেন, ভ্রম হয়। 

কৌতূহল নিয়ে পাশে গিয়ে বসে দেখি, মুখ শুকনো। সম্ভবত ক্ষুধার্ত। কাঁধে ঝুলানো ঝোলার মুখে উঁকি দিচ্ছে দোতারার ময়ূরমুখী বাঁকানো প্রান্ত। সেখানে আঁকা চোখটাও নদীর ঘোরানো। বুঝতে পারি- সঙ্গীত সাধক, বয়াতি।

বসে থেকে একটু পরে বললাম- 'চা খাবেন?'

'দয়ালের ইচ্ছা হইলে খাওন যায়'- আমার মুখের দিকে অস্বস্তিকর দীর্ঘ সময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে তার পর বললেন। চা মানে, সাথে বিস্কুট, পানি। আর কোনো কথা নেই। সাধক ধূম্রশলাকাও গ্রহণ করবেন কি-না, জিজ্ঞাসা করতে দ্বিধা হচ্ছিল। 

দ্বিধা কাটতে না কাটইে বৃষ্টি নামে। ঝুম বৃষ্টি। বিশাল ব্রহ্মপুত্র যেন তার চেয়েও বড় জল-পর্দায় ঢেকে গেল। নীরবতা ভেঙে নদীর দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন, 'ভালো মাইনসের মনে ব্যথা থাকলে দয়াল আসমানথন পানি ছিটায়।' আর কিছু বললেন না। আমাকে, না কাকে বললেন, তাও নিরুদ্দিষ্ট।

বৃষ্টির কারণে ততক্ষণে ঘাটের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। কোথাও কোলাহল নেই। কেবল বৃষ্টির ঝমঝম আর মেঘের গুড়গুড় শব্দ। চায়ের দোকানের ঝাঁপ চুইয়ে বেঞ্চের এক কোণে পানি পড়ে টপ টপ শব্দ হচ্ছিল। বৃষ্টি ও ব্রহ্মপুত্রের আওয়াজ ছাপিয়ে। বয়াতি গুন গুন করে গাইছিলেন- 'সেই ভালো সেই ভালো...'। লালন শাহের বদলে কেন রবি ঠাকুর? সাধককে জিজ্ঞাস করার দ্বিধাও শেষ পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। সাধকের মগ্নতা ভাঙানোর ভয় কাজ করে থাকতে পারে।


নিজের ভেতরে এই জাতীয় ভাবনার মধ্যেই তার গুনগুন গান শেষ হয়েছিল। তার রেশও শেষ করে, হালকা চালে পা দোলাতে দোলাতে তিনিই জানতে চান- 'গাঙ পাড়ি দিবেন?'

'জি। আর কিছু খাবেন?'

তর্জনী ও মধ্যমা সমান্তরালে দেখিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজ থেকে আলাপ জমানো ও উত্তর না দেওয়ায় মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিই। দোকানদারকে ইশারা করি। বৃষ্টির মধ্যে গ্রাহকহীন দোকানদারও কৌতূহলের সঙ্গে সাধুকে দেখছিল।

না আমি, না দোকানদার; কাউকে কিছু বলেন না বয়াতি। ম্লান হাসেন, আ-অধর লম্বিত গোঁফের ফাঁকে ঝকঝকে দাঁতের আভাস। এর পর দোকানির দিকে হাত বাড়ান।

ধূম্রশলাকা সঙ্গে সঙ্গে না ধরিয়ে দুই আঙ্গুলের ফাঁকে রেখে বলেন- 'গাঙ হইলো ভব-নদীর ছায়া। কেউ পাড়ি দিবার পারে, কেউ পারে না; ডোবে। কেউ সারাজীবন নাও উটকায়া মরে।'

-আর নদী কী উটকায়? খানিকটা বেমক্কা প্রশ্ন করি। উটকানো মানে খোঁজ করা। 

-'গাঙ উটকায় মেগ। এই যে মেগ ডাকে, নদীরে জওয়াব দেয়'- কোমরে গোঁজা দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরাতে ধরাতে বলেন। 

-মেঘ অন্য মাসে নদীর ডাক শোনে না?

-'শোনে, কিন্তু মাইনসে যারে বর্ষাকাল কয়, গাঙের কাছে তা বসন্তকাল। সব জিনিসের যৈবনকাল আছে। গাঙেরও আছে। যৈবনকালে গাঙের ডাকে মেগ জওয়াব দেয়, আসমান থন পানি পড়ে।'

এর পর আবার নিশ্চুপ। তাকিয়ে থাকেন সামনের দিকে। ওপরে গুড়গুড় করা মেঘ, না বৃষ্টি-ঢাকা; ব্রহ্মপুত্রের দিকে তাকিয়ে বোঝা যায় না। আমিও আর কথা বাড়াই না। তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।

লেখক: নদী গবেষক

  • সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

    সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

  • ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

    ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

  • মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

    মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

  • নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

    নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

  • নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা

    নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা


সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী ...

০১ আগস্ট ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮