নদীতে কুড়ানো নুড়ি

নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা

 প্রকাশ : ০৬ মে ২০১৮ | আপডেট : ০৬ মে ২০১৮      

 শেখ রোকন

'নাফ' কেন দেশের সবচেয়ে লবণাক্ত নদ? এর অর্ধেক জল আসলে রোহিঙ্গাদের অশ্রু- ফেসবুকে লিখেছিলাম গত আগস্টে। যদিও সাম্প্রতিক শরণার্থী সংকট দূর থেকে দেখেই এই লেখা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা সংবাদমাধ্যমে।

সরাসরি নাফ নদ প্রথম দেখি ১৪/১৫ বছর আগে। অগ্রজপ্রতিম এক সাবেক ছাত্রনেতার এমফিল গবেষণাকর্ম ছিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে। থাইল্যান্ডের এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। আমি সে কাজের অনানুষ্ঠানিক মাঠকর্মী। দু'জনে মিলে কপবাজারের একটি হোটেলে উঠেছি। সেখান থেকে টেকনাফের দিকে যাচ্ছিলাম সড়কপথে। তখনও সম্ভবত কপবাজার-টেকনাফ 'মেরিন ড্রাইভ' চালু বা পুরোপুরি চালু হয়নি। আমরা যাচ্ছিলাম চট্টগ্রাম-টেকনাফ রোডে নাফ নদের ডানতীর ধরে। তখনও সংবাদমাধ্যমে 'টেকনাফ রোড' নামটি চালু হয়নি। সড়কের পাশের সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে এর আদি ও আসল নামই লেখা- 'আরাকান রোড'।

মনে আছে, শীতের মিষ্টি সকাল। পাহাড়ের গায়ে গায়ে কুয়াশার চাদর। টেকনাফ শহরে ঢোকার আগে একপাশে নাফ নদ। অপর পাশে উঁচু পাহাড়ের কারণে মহাসড়ক একখানে চোখা বাঁক নিয়েছে। সেখানে গাড়ি থেকে নেমে কম দামি কোডাক ক্যামারায় নাফ নদের একটি ছবি তুলি। নদের পটভূমিতে নিজেও দাঁড়িয়ে একবার পোজ দেই। অগ্রজপ্রতিম ক্লিক করেন। এক সফরে হিসেবের ৩৫-৩৬টির বেশি ক্লিক করা যাবে না। ফিল্ম ফুরিয়ে যাবে। এরপর দাঁড়িয়ে চোখের লেন্সেই মস্তিস্কে ধরে নেওয়ার চেষ্টা করি চারপাশের দৃশ্যাবলি।

নদের অপর তীরই মিয়ানমার! নামটি তখনও তত পরিচিত নয়। কপবাজারের জনসাধারণ 'বার্মা' হিসেবেই ডাকছিল। শৈশবে বাড়িতে রক্ষিত পুরনো মানচিত্রে দেখতাম 'ব্রহ্মদেশ'। কল্পনার 'অন্যদেশের' সঙ্গে মিল ছিল না নাফের ওপাড়ের দৃশ্যাবলি। সবকিছু একই তো! নাফের দু'পাড়ের পাহাড় ও প্রকৃতির পার্থক্য কিছু চোখে পড়ছিল না। ওপাশের পাহাড়গুলো একটু বেশি সবুজ! সমতলেও গাছপালা বেশি? এতটুকুই।

হ্যাঁ, খোদ নাফ নদ যেন অন্যরকম। নদীসুলভ স্রোত বোঝা যায় না, বরং সাগরের স্থৈর্য্য। সাগরের মতোই নীলচে পানি। নদীর সমান্তরাল প্রবাহের বদলে সাগরের মতোই আড়াআড়ি ঢেউ। আরও পরে জেনেছি, এই নদীর লবণাক্ততা সবচেয়ে বেশি সাগরের প্রভাবে। মোহনা থেকে অনেকদূর পর্যন্ত আসলে সাগরেরই বর্ধিত অংশ।


যাহোক, তখন বেশি গবেষণার সুযোগ ছিল না। গবেষক বড় ভাই তাড়া দিচ্ছেন। রোহিঙ্গা নিয়ে গবেষণায় এসে নদী দেখার কী আছে! ওদিকে টেকনাফে 'এফজিডি' নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে। আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে একদল রোহিঙ্গা শরণার্থী।

টেকনাফে একটি বাড়িতে আমরা মুখোমুখি হই একদল মানুষের। মূল গবেষক বড় ভাই, আর তার স্থানীয় ভরসা আরেক বড় ভাই-ই কথা বলছিলেন। স্থানীয় বড় ভাইয়ের পরিবারও অনেক আগে নাফ নদের ওপাড় থেকে এসেছিলেন। এখন তারা অর্থে, সমাজে, রাজনীতিতে প্রভাবশালী। সদ্য সীমান্ত অতিক্রম করা রোহিঙ্গাদেরও বড় ভরসা। তিনি রোহিঙ্গাদের বক্তব্য 'বাংলা' করে দিচ্ছিলেন। যদিও কিছু কিছু বাক্যের মূলভাব ধরতে সমস্যা হচ্ছিল না, চট্টগ্রামের ভাষার মতোই। আমি শুনছিলাম, লিখছিলাম আর ছবি তুলছিলাম।

অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই নারী। এক-একজনের সঙ্গে একাধিক শিশু প্রৌঢ় একজন পুরুষ ঘনঘনই নারীদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা জুড়ে দিচ্ছিলেন।

ছয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি নাফ সাঁতরে টেকনাফে এসেছিলেন। বাকিরা কে কোথায় জানেন না। শৈশবের এক রাতে নিজেদের উঠোনে বাবা-মাকে নিহত হতে দেখার পর রাতেই যেদিকে দু'চোখ যায় পালিয়েছিলেন। তিনি বাংলাও বোঝেন ও চট্টগ্রামের একসেন্টে বলতে পারেন। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করি-

: আপনার আগের বাড়ি কোথায় ছিল?

: নাফ হালের ইয়ানে।

: কোন এলাকা?

: আরাকান। 

: এখন কোথায় থাকেন? তার পৈতৃক বাড়ির ভৌগোলিক অবস্থান জানার চেষ্টায় হাল ছেড়ে দিয়ে জানতে চাই।

: নাফ হালের ইয়ানও।

: না না, এলাকার নাম কী?

: আরাকান, ন বুইজ্জ!

: এই যে নাফ নদী দেখছেন না? মানে নাফ হাল। এর ওই পাশে আরাকান, এই পাশে বাংলাদেশ। ভাবলাম তিনিই বুঝতে ভুল করছেন। পণ্ডিতি করে বোঝাতে যাই।

: হাল কিল্লাই বর্ডার হইবো! ইয়ান ব্যাকগুন আরাকান। আরাকানত পাহাড় বর্ডার। হাল ন হইত! বুইজ্জনি, বদ্দা?

তার শেষ বাক্যের মধ্যে মিশে থাকে খানিকটা হতাশা-ক্ষোভ। খুব সম্ভবত খানিকটা বেদনাও। আমি তার 'পোট্রেট' তোলায় মনোযোগ দেই। খোঁচা খোঁচা দাড়ির জঙ্গল বলিরেখায় বিভক্ত। হতে পারে বয়সের কারণে, হতে পারে বেদনার কারণে। তবে চোখে যেন উজ্জ্বল আলো। আশা না অশ্রু থেকে? কম দামি ক্যামারার লেন্সের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় না।

লেখক : নদী গবেষক



  • সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

    সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

  • ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

    ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

  • মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

    মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

  • নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

    নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

  • মানুষের বর্ষা, নদীর বসন্ত

    মানুষের বর্ষা, নদীর বসন্ত


সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী ...

০১ আগস্ট ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮