নদীতে কুড়ানো নুড়ি

ভাঙনের নদীতে মাছের সংসার

 প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৮ | আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৮      

 শেখ রোকন

আমাদের গন্তব্য ছিল কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের নয়ারচর বাজার। রাজনীতিক ও নদীকর্মী মহির ভাইয়ের মোটরসাইকেলে চড়ে সেখানে যখন পৌঁছলাম, তখন খাড়া দুপুর। বাজার বলতে উপজেলা পরিষদের সড়কের শেষ প্রান্তের দুই পাশের কয়েকশ' গজ সমান্তরালে টিন-কাঠের দোকানপাট। সড়ক সাধারণত কোথাও শেষ হয় না। শেষের প্রান্তেও সরু সরু পথ বের হয়ে যায়। কিন্তু এখানে সেই জো নেই; সড়কের শেষ মাথায় লকলক করে বইছে ব্রহ্মপুত্র। খাড়া কাছাড় দেখে কারও কারও বুকে কাঁপুনি আসতে পারে। কিন্তু স্থানীয়রা অভ্যস্ত। একেবারে পাড়ের ওপর বসে খোশগল্প করছে কয়েকজন।

ব্রহ্মপুত্রের মতো নদী-তীরবর্তী বা চরে যেমনটি হয়- ঘাট, হাট বা বাজার এক স্থানে স্থির থাকে না। ভাঙনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। অবশ্য নাম একই থাকে। নয়ারচর বাজারও তাই। বাজারে 'নতুন মানুষ' কৌতুহল নিযে এগিয়ে এসেছিলেন আব্দুস সাত্তার। তিনি তর্জনী তুলে নদীর মধ্যস্রোত দেখিয়ে বললেন, গত বছর বাজার ছিল 'ওই হানে'। 

উপজেলা পরিষদের রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে গেলে কয়েক একরের বালুকাভূমি। সেখানে আরও কয়েক সারি বাঁশের খুঁটি পোতা। কোনো কোনো খুঁটির ওপর আচ্ছাদন। হাটের দিন এগুলোতে চট ঘিরে তৈরি হয় এক একটি অস্থায়ী দোকান। একটু বাইরের দিকে কসাইয়ের দোকান। সকালেই সম্ভবত গরু বা মহিষ জবাই হয়েছে। রক্তের ধারা জমাট বেঁধে আছে কালচে হয়ে আছে। এরও এক ধাপ নিচে নেমে গেলে পায়ের কাছে কুণ্ডুলি পাকানো প্রবাহ। সেখানে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে মুখ করে ডানে-বামে তাকালে বোঝা যায়, কেন সড়কের খাড়া কাছাড়ের ওপর লোকগুলো নিশ্চিন্ত বসে খোশগল্প করছে। নয়ারচর বাজারের আয়তাকার চার বাহুর নদীবিধৌত দুই বাহু বরাবর জিওটেপটাইল ব্যাগ ফেলেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আইএসও-৯০০১ সনদপ্রাপ্ত 'সারাহ' ব্যাগের ছাপের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে ব্রহ্মপুত্রের ঢেউ।

ওইসব ব্যাগের ওপর বসে মাছ ধরছিলেন কয়েকজন। সাবেক ইউপি সদস্য রুস্তম আলীর হাতে ছিল 'চেঙ্গা বড়শি'। চেঙ্গা মানে ছুড়ে ফেলা। দীর্ঘ নায়লনের সুতার মাথায় বড়শি বাঁধা থাকে। সেখানে 'আদার' বা পচা মাছ কিংবা খোল ছড়ানো শামুক গেঁথে দিয়ে পাড় থেকে দূরে ছুড়ে ফেলতে হয়। কোনো ফাৎনা থাকে না। সুতায় টান দেখে বুঝতে হয়, মাছ বড়শিতে আটকেছে কি-না। সাধারণত শৌখিন ও সচ্ছল মৎস্য শিকারিরা এর ভক্ত। দুই-তিন দিনেও একটি মাছও না আটকাতে পারে। কিন্তু আটকালে তা হবে বড় বোয়াল কিংবা আইড়।

প্রবীণ রুস্তম আলীর অদূরেই ছিপ বড়শি নিয়ে বসে ছিলেন নবীন রফিকুল ইসলাম। ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। সময় কাটাতে ছিপ নিয়ে বসেছেন নদীর পাড়ে। কিন্তু ফাৎনা খুব একটা নড়ে না। তিন ঘণ্টায় মোটে দুটো 'গোলসা' মাছ ধরা পড়েছে। তিনি দৃশ্যত হতাশ।

জিজ্ঞেস করি- 'মাছ কেমন?'

বিরক্ত মুখে জবাব দেন- 'মাছ নাই।'

- কেন? নদীতে তো নতুন পানি। এখনই মাছের সময়।

- যে ভাঙন! মাছ আইব কুন থাইক্যা! ভাঙনের ডরে মাছ ভাইগ্যা গ্যাছে।

আমার অবাক হওয়ার পালা। মাছেরও তাহলে ভাঙনের ভয় আছে! সত্তরোর্ধ আব্দুস সাত্তার বাজার থেকেই আমাদের সাথ ছাড়েননি। তিনি এগিয়ে এসে ব্যাখ্যা করেন- 'হুনেন, মাইনসের যেমন, মাছেরও তেমন বাড়িঘর আছে। সংসারও আছে। নদী ভাঙলে মাইনসের মতো মাছও ভিটাছাড়া হয়।'

- তখন মাছ কী করে? আমি আরও জানতে আগ্রহ প্রকাশ করি।

- 'তহন আর কী করবে! এই আমাগো মতন কাইন্দা বেড়ায়। আজ এহানে, কাল ওহানে! নদী ভাঙন মানে জমিনে-পাতালে সবার সংসারে ভাঙন।'

আমি রফিকুলের হাতে ধরা গোলসা মাছ দুটির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। নয়ারচরের ভাঙনে কি তাদেরও ঘর-সংসার ভেঙেছে? মাছ দুটির ভাইবোন, বাবা-মা কি কোথাও আশ্রয়ের জন্য ঘুরছে আর কাঁদছে? মৃত মাছের ঘোলা চোখে হাসি-কান্নার কোনো প্রতিফলন দেখতে পেলাম না।

শেখ রোকন : লেখক ও গবেষক


  • সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

    সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

  • মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

    মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

  • নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

    নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

  • নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা

    নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা

  • মানুষের বর্ষা, নদীর বসন্ত

    মানুষের বর্ষা, নদীর বসন্ত


সন্ধ্যা নদীর অপরাহ্ন

 শেখ রোকন

দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা নদী দেখেছিলাম প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের প্রিয় ...

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মড়া নদীর নাম দিয়ে কাম কী

 শেখ রোকন

এই এপ্রিলের গোড়ায় গিয়েছিলাম গাইবান্ধা। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীকর্মীদের কর্মশালায় অংশ ...

৩১ মে ২০১৮

নিজের নদী অন্যের মাথাব্যথা

 শেখ রোকন

যাচ্ছিলাম তিব্বত সীমান্তের দিকে। উঁচু উঁচু পর্বত ও নীলাভো স্রোতস্বিনীর ...

১৭ মে ২০১৮

নোনতা নাফ ও বেদনার বলিরেখা

 শেখ রোকন

'নাফ' কেন দেশের সবচেয়ে লবণাক্ত নদ? এর অর্ধেক জল আসলে ...

০৬ মে ২০১৮