রাজনীতি

সাক্ষাৎকার

একতরফা নির্বাচন করতে চায় সরকার :ফখরুল

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০১৮     আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০১৮      

লোটন একরাম

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তার দল আগামী নির্বাচন বর্জন করতে চায় না। সব দলের জন্য একটি 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড'-এর নির্বাচনে তারা অংশ নিতে চান। সে জন্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার প্রয়োজন।

মির্জা ফখরুল বলেন, মহাজোট সরকার গণতন্ত্রের লেবাস পরে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সরকারদলীয় ব্যবস্থার অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিরোধী দলগুলোকে চাপে রেখে একতরফা ভোটের আয়োজন করতে চায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রেখে ক্ষমতায় যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে বুধবার সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে খোলামেলা অনেক কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব। আবার বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। বলেছেন, সময় হলে উত্তর দেবেন। মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকারের চার বছরের একমাত্র সাফল্য গণতন্ত্রকে হত্যা করা।

বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে দশম সংসদ নির্বাচন করে মহাজোট সরকারের চার বছর পূর্ণ করা সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, এই সরকার বিনা ভোটে নির্বাচিত। সংবিধান লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ বেআইনি, অনৈতিক এবং নির্লজ্জভাবে ক্ষমতা দখল করে আছে। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ- সংসদ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করেছে। চার বছরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে ফেলেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, গণতন্ত্রের লেবাস পরে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা। উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তৃত হয়েছে। অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায়। তিনি বলেন, বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনগণের মানবিক অধিকার ও ভোট প্রদানের অধিকার সব ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ সরকারের কোনো সাফল্য দেখি না। সাফল্য একটাই- গণতন্ত্রকে হত্যা করা। সরকার বিরোধী দলের রাজনীতি কেড়ে নিয়েছে। আয়বৈষম্য আরও বেড়েছে। সরকারের মদদপুষ্ট কিছু সংখ্যক ব্যক্তি ও সংগঠন এই অবস্থা কায়েম করে অবিশ্বাস্যভাবে বিত্তশালী হয়েছে। আর বিপুলসংখ্যক মানুষ আরও দরিদ্র হয়েছে। সরকার উন্নয়নের কথা বললেও সড়ক, নৌ ও আকাশ পরিবহন ব্যবস্থা আরও নিম্নগামী হয়েছে। ব্যাপক মুদ্রাস্ম্ফীতি ঘটেছে। বিশেষ করে চালের দাম অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একই অবস্থা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও। সুশাসন নেই কোথাও।

সরকারের একটি সাফল্যও কি চোখে পড়ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, না, একটি সাফল্যও দেখতে পাচ্ছি না। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বড়লোক হয়েছে।

কেন পদ্মা সেতু কি সরকারের বড় সাফল্য নয়- প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, না, এটা সাফল্যের কিছু নয়।

সরকারকে পদত্যাগ করে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করার দাবি তুললেও তা না হওয়াটা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা কি-না- প্রশ্ন করা হলে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, একটা কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির মতো একটি গণতান্ত্রিক দলের পক্ষে এ দাবি আদায় সবসময় সহজ নয়। বিএনপি বিভিন্ন সময়ে সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ এই সরকার দেয়নি। একদিকে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন, অন্যদিকে বিএনপিকে কোনো সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না।

দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন ভুল ছিল কি-না জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, না, তারা ভুল করেননি। তখন ৪০টি রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে যে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল- এই সরকার তা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনী ব্যবস্থা নষ্ট করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধী দলকে যেভাবে দমন করার প্রবণতা দেখিয়েছে, সেটি প্রমাণ করে এ সরকারের অধীনে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

নূ্যনতম শর্ত পূরণ হলেই বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং আর কোনো অবস্থাতেই নির্বাচন বর্জন করবে না- বিশ্নেষকদের এমন হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, তারা নির্বাচন বর্জন করতে চান না। বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলছে, তাতে নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার দরকার, যে সরকার নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে সহযোগিতা করবে।

বিএনপি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের 'রূপরেখা' কবে নাগাদ পেশ করবে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, সঠিক সময়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবেন তারা। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ করে রূপরেখার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার একটি 'নিয়ন্ত্রিত' নির্বাচন করার ষড়যন্ত্র করছে। তবে ওই ধরনের নির্বাচন করলে বিএনপিকে তা প্রতিহত করতে হবে না, জনগণই তা নস্যাৎ করে দেবে।

সরকার কোনো দাবি না মানলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি-না প্রশ্ন করা হলে কৌশলী উত্তর দেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, তারা বিশ্বাস করেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই বিরোধী দলের দাবি মেনে নেবেন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন।

সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জাতিসংঘ এবং প্রভাবশালী পশ্চিমা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন কি বিএনপি পাবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পর থেকে জাতিসংঘসহ গণতান্ত্রিক দেশগুলো তাদের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবির প্রতি সমর্থন দেখিয়ে আসছে।

জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনকে অনেকে বিএনপির জন্য বোঝা বলে মনে করছেন। এ সম্পর্কে মন্তব্য চাওয়া হলে মির্জা ফখরুল বলেন, তারা বারবার বলে আসছেন যে জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো আদর্শিক সম্পর্ক নেই। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রশ্নে যে জোট হয়েছিল- এখনও তারা সে রকম জোট করেছেন। শুধু বিএনপি একা নয়, '৯৬ সালে আওয়ামী লীগও জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছে। সুতরাং সব ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিকে জড়ানো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতায় এলে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং মুক্তচিন্তার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেও কথা উঠছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দিয়ে মুক্তচিন্তার বিস্তৃতি ঘটিয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতায় এলে মুক্তচিন্তার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মনে করাটা শুধু অনুমাননির্ভর ও উদ্দেশ্যমূলক। এখন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকদের বিরুদ্ধে ১০০টি পর্যন্ত মামলা হয়েছে, তা তারা দেখতে পাচ্ছেন না।

বিচারাধীন মামলার রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাজা হলে দলটিতে নেতৃত্ব শূন্যতার আশঙ্কা করছেন কি-না প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, এ প্রশ্ন অমূলক।

বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটে ভাঙন এবং মূল বিএনপিকে বাইরে রেখে একাংশকে নির্বাচনে নেওয়ার আশঙ্কাও করছেন দলের অনেকে- এ সম্পর্কে মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের শঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই। দলের নির্বাচনের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি নির্বাচনের জন্য সব সময়ই প্রস্তুত। দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা 'ভিশন-২০৩০' দেওয়া হয়েছে। ৫১টি জেলায় নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিগত নির্বাচনের আগে সংলাপের জন্য টেলিফোন করে প্রধানমন্ত্রী অপমানিত হয়েছেন বলে আর কোনো সংলাপ হবে না- এ কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে সরকারি দল। এ সম্পর্কে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি দল মিথ্যাচার করছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, তারা আশা করেন যে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এটাই একমাত্র পথ।

নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে নেওয়া হবে না বলে মন্ত্রীরা বক্তব্য দিয়েছেন। এ সম্পর্কে মির্জা ফখরুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আগেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। জনসমর্থনের দিক থেকে দেশের অন্যতম বৃহত্তম দল বিএনপিকে বাইরে রেখে কোনো সরকার ও নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে না।

সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল অতীতের ঐতিহ্য অনুযায়ী গণতন্ত্র উত্তরণে জনগণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্রেরও এগিয়ে আসা উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

বিষয় : সাক্ষাৎকার

পরবর্তী খবর পড়ুন : ভালো-মন্দের ৪ বছর

আরও পড়ুন

এক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

এক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে মো. আবদুল হামিদের ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে ...

পরিবেশের সর্বনাশ

পরিবেশের সর্বনাশ

'ত্রিশ বছর আগেও চার-পাঁচটি জেলেপল্লী ছিল সাভারের সাধাপুর থেকে ধামরাই ...

একই সুতোয় দুই বাংলা

একই সুতোয় দুই বাংলা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল আর বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ- এ দুই এলাকায় যেসব ...

আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী বিএনপিতে অস্থিরতা

আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী বিএনপিতে অস্থিরতা

একক প্রার্থী নিশ্চিত থাকায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ...

মেয়ে হয়ে জন্মানোই ছিল অপরাধ!

মেয়ে হয়ে জন্মানোই ছিল অপরাধ!

প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় বাবার চাওয়া ছিল পরেরটি ছেলে হোক। ...

ভালো হওয়ার সুযোগ পাবে 'বিপথগামীরা'

ভালো হওয়ার সুযোগ পাবে 'বিপথগামীরা'

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে এক তরুণকে ...

রিয়ালের স্বস্তির জয়

রিয়ালের স্বস্তির জয়

সবশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে সেভিয়াকে বিধ্বস্ত করে লা লীগায় জয়ের ...

পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভের মুখে ওবায়দুল কাদের

পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভের মুখে ওবায়দুল কাদের

গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক পদ নিয়ে ...