রাজনীতি

বিশেষ সাক্ষাৎকার :আনোয়ার হোসেন মঞ্জু

শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়তে সংবিধানের ভেতর থাকতে হবে

চলমান রাজনীতি

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

লোটন একরাম

জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, আমরা যদি একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়তে চাই, তাহলে সংবিধানের কাঠামোর ভেতর থাকতে হবে। রাজনীতি যেন মারমুখী না হয়ে ওঠে, সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সংলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে তারা অপমান করায় তিনি আলোচনায় বসতে চান না। এর অর্থ এই নয় যে, কোনো না কোনো পর্যায়ে আলোচনা হবে না। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু সংবিধানের মধ্যেই থাকতে হবে।

চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে কিছু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়েও যান ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জেপির এই চেয়ারম্যান। বললেন, সব প্রশ্নের উত্তর তিনি দেবেন না। আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন অত্যন্ত কৌশলে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জানান, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন মনে করেন না তিনি। একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়, আরেকটি জিও পলিটিক্স- দুটি দু'রকম রাজনীতি। আজকের বিশ্বের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় অগ্রাধিকার পায়। একসময়ে পৃথিবীতে দুটি বৃহৎ শক্তি ছিল। সেই অবস্থার এখন পরিবর্তন হয়েছে। এখন রিজিওনাল শক্তি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এককভাবে দুই পরাশক্তি কিছু করতে পারে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি এর নিরাপত্তাও বহুলাংশে সুসংগঠিত হয়েছে। দুটি পরাশক্তির মতো আন্তর্জাতিক শক্তিও তাদের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সে কারণে বাংলাদেশে এমন শক্তির অভ্যুদয় হতে পারে না, যা আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এটা একদিকে যেমন স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, তেমনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে যদি এমন অবস্থা তৈরি করা হয়, যার ফলে আঞ্চলিক শক্তি তাদের নিরাপত্তার জন্য নীতি পুনর্বিবেচনা করলেও করতে পারে। তাই রাজনীতি যেন মারমুখী না হয়ে ওঠে, সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।

বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও সেনা মোতায়েনের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব দলের অংশগ্রহণ পূর্বশর্ত। নানা অজুহাতে সংবিধানের বাইরে গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ এতে শুধু নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। সংবিধানের বাইরে কোনো দাবি যতই যুক্তিযুক্ত হোক না কেন, গণতান্ত্রিক বিশ্ব তা বুঝে উঠতে পারবে না। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে সংলাপ নাকচ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে বাধাও নয় দাওয়াতও নয় বলে জানিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবেই, ঠেকানোর শক্তি কারও নেইও বলেছেন তিনি। এ বিষয়ে জেপির চেয়ারম্যান বলেন, এ প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি আলোচনা করবেন না। কারণ তাকে অপমান করা হয়েছে। সে জন্য তিনি আলোচনায় বসতে চান না। এর অর্থ এই নয় যে, কোনো না কোনো পর্যায়ে আলোচনা হবে না। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে।

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ শর্ত আরোপ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে বললে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, কারও মুক্তির বিষয়ে যদি আলোচনা করতে হয় তা কোর্ট-কাচারির সঙ্গে করতে হবে। কেননা, তিনি আইনের মাধ্যমেই কারাভোগ করছেন। সুতরাং আইনের দ্বারাই তাকে মুক্ত হতে হবে। আমাদের বিচিত্র দেশ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টসহ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার অনেক সরকারপ্রধান ক্ষমতা থাকাকালীন বিভিন্ন অনিয়ম করার জন্য আদালতের মাধ্যমে শাস্তি ভোগ করছেন। সে মতাবস্থায় আমরা আইন-শৃঙ্খলার কথা বলি, কিন্তু সেটা আমরা মানতে চাই না। এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ মানসিকতা আমাদের ভেতর হয়ে আসতে হবে, যদিও তা সময়সাপেক্ষ।

এলজিআরডিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সম্প্রতি পিরোজপুরে এক জনসভায় তাকে আওয়ামী লীগে যোগদানের আহ্বান জানানোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জেপির চেয়ারম্যান বলেন, এলজিআরডিমন্ত্রী একজন রসিক সুবক্তা। এটা তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল না। তিনি তার বক্তব্যে বিশাল সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন, এটা তা বক্তব্যের একটা বৈশিষ্ট্য। সময় ও সুযোগ পেলে তাকে আমি আবারও আমার নির্বাচনী এলাকায় নিয়ে যাব।

আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জেপি) আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে, নাকি পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনেও তারা একে অন্যের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এ জোট আগামী নির্বাচনে আরও শক্তিশালী হবে, না দুর্বল হবে, তা নির্ভর করবে বড় রাজনৈতিক দলের ওপর। 

জোটগতভাবে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগের কাছে ক'টি আসন চাইবেন? এ প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, আসন চাওয়ার ব্যাপারে আমাদের দল আগ্রহী নয়। যদি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করি, তাহলে জোটকে জয়ী করাই লক্ষ্য হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। ভোটের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান রাখতে জোটবদ্ধ হই। এখানে আসন বা মন্ত্রীর ব্যাপারে আমরা অতীতেও আলোচনা করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। এটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর গৃহপালিত বিরোধী দল হতে চান না বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, এটা এরশাদ সাহেবের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এদেশকে তিনি প্রায় নয় বছর শাসন করেছেন। তার গ্রহণযোগ্য সমর্থন রয়েছে বিধায় তিনি পুনরায় ক্ষমতায় আসতে চাইবেন। এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। 

অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য জোট গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এ জোটের 'অগণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় যাওয়ার' ইচ্ছা রয়েছে নিয়ে টিপ্পনীও কেটেছেন তিনি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কেউ এককভাবে বা জোটবদ্ধভাবে এগিয়ে এলে অবাক হওয়ার কী আছে?

ড. কামাল হোসেন গং আদৌ নির্বাচন চায় কি-না, প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিষয়টি সম্পর্কে অভিমত জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, তারা নির্বাচন চান। তবে নির্বাচন অংশগ্রহণের ব্যাপারে কতগুলো শর্ত দিয়েছেন। তাদের নির্বাচনে আসার ইচ্ছাকে জাতীয় পার্টি স্বাগত জানায়।

বৃহত্তর ঐক্য জোট গঠনের প্রশ্নে দেড়শ' আসন এবং দু'বছরের ক্ষমতার ভাগ চান জোটের উদ্যোগী নেতারা। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তার পরও কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় ঐক্য গড়তে একমত হয়েছে বিএনপি ও তার শরিকরা। এ সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে ১৪ দলীয় জোটের শরিক জেপির সভাপতি বলেন, এটা তাদের ব্যাপার। তবে নির্বাচনে কে ক'টি আসন পেলেন, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে। দর কষাকষি করে ৩০০ আসনের মধ্যে দেড়শ' আসন পেতে পারেন। তবে ক'টিতে জিতলেন সেটাও বিবেচনায় রাখা উচিত। জোট গঠন করতে গেলে একে অন্যের প্রতি সম্মান ও সমমানসিকতা তৈরি হতে হয়। এগুলোর অবর্তমান হলে সেই জোটে যদি কখনও ভাঙন দেখা দেয়, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন

তবুও জামায়াত ছাড়বে না বিএনপি

তবুও জামায়াত ছাড়বে না বিএনপি

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের দাবিতে জামায়াতকে ত্যাগ করবে না বিএনপি। ...

সাত বিভাগীয় শহরে হবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল

সাত বিভাগীয় শহরে হবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচার দ্রুত ...

১৯৩ দেশই ভ্রমণ করবেন নাজমুন

১৯৩ দেশই ভ্রমণ করবেন নাজমুন

লাল-সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর পথে এখনও হেঁটে চলেছেন নারী পরিব্রাজক ...

বঞ্চনার শেষ নেই শিক্ষা ক্যাডারে

বঞ্চনার শেষ নেই শিক্ষা ক্যাডারে

মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ১৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা। ...

বেদেপল্লীর বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ

বেদেপল্লীর বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ

পিচঢালা পথের যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু বেদেপল্লীতে প্রবেশের রাস্তা। ...

শেষবেলায় আ'লীগের চমক ড. ফরাসউদ্দিন?

শেষবেলায় আ'লীগের চমক ড. ফরাসউদ্দিন?

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আর মাত্র তিন মাস পর একাদশ ...

জঙ্গিদের বোমা নিষ্ক্রিয় করবে 'যন্ত্রমানব'

জঙ্গিদের বোমা নিষ্ক্রিয় করবে 'যন্ত্রমানব'

হঠাৎ খবর এলো, জঙ্গিরা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা নিয়ে আস্তানায় অবস্থান ...

শেখর-রোহিতের সেঞ্চুরিতে উড়ে গেল পাকিস্তান

শেখর-রোহিতের সেঞ্চুরিতে উড়ে গেল পাকিস্তান

দুবাইয়ের খবর অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়নি ভালো। আয়ের ...