উৎসবের শাড়ি

০৯ জুলাই ২০১৪

নিশাত তানিয়া

বাঙালি নারী, আটপৌরে শাড়ি। এটি পরিচিত একটি কথা। যে কোনো উৎসব কেন্দ্র করে অথবা যে কোনো সময়ই শাড়ি ভীষণ প্রিয় বাঙালি নারীদের। আর সেটা যদি হয় ঈদের মতো উৎসব, তাহলে তো কথাই নেই।
তাই ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস বাজারে এনেছে শাড়ির সম্ভার। যেহেতু বিশেষ উৎসবকে মাথায় রেখে এগুলো করা হয়েছে, তাই ডিজাইনেও এসেছে ভিন্নতা।
এ বিষয়ে ফ্যাশন হাউস অঞ্জন'সের প্রধান নির্বাহী শাহীন আহম্মেদ বলেন, এবার সবচেয়ে বেশি যে ফেব্রিকসগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো হলো সুতি, সিল্ক ও হাফ সিল্ক। আর সবই নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি। উৎসবকে সামনে রেখে রঙের দিকেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এগুলোর মূল্যও সাধ্যের মধ্যে।
বেনারসি-লাল বেনারসি। আগে বেনারসি বলতে সবাই বুঝত লাল; কিন্তু এখন আর তা নেই। এখন বিভিন্ন ধরনের নকশা ও শাশ্বত সৌন্দর্য ফুটে উঠছে শাড়িতে। এ ছাড়া বাঙালি নারীর সুখে-দুঃখে, নানা উৎসবে এই শাড়ি নানাভাবে জড়িয়ে আছে। চোখ ধাঁধানো বেনারসি নিয়ে হাজির মিরপুরের বেনারসি পল্লী, মিরপুর অরিজিনাল ১০-এ। ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতারা আসছেন সরবে। তাই তাদের চাহিদার কথা ভেবে তৈরি করা হচ্ছে নানা ধরনের শাড়ি, যা সহজেই ক্রেতাদের মন জয় করে নিচ্ছে। আছে তাতে পিটা কাজ, সোনালি রঙের অপরূপ ছোঁয়া। কোনোটা চিরচেনা লাল আবার কোনোটা নীল, সবুজের মতো আকর্ষণীয় রঙ। শাড়ির অনেকটা জুড়ে পাড়ও দেখা যাচ্ছে কোনো কোনোটায়। এগুলোর মূল্য ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু। পাবনা বেনারসি মিউজিয়াম, উপমা বেনারসি, তানহা বেনারসি কর্নার, আল হামদ বেনারসির মতো এমন অনেক দোকানেই পেয়ে যাবেন মনের মতো শাড়ি।
সুতি :সুতি শাড়ির কদর সব সময়ই অনেক বেশি। অনেক হালকা অনুষ্ঠানেও যেমন পরতে পারেন, জমকালো উৎসবেও কিন্তু কম যাই না এই সুতি শাড়ি। দেশি-দশে এসেছে চমৎকার সুতি শাড়ির কালেকশন। এতে ঈদকে সামনে রেখে করা হয়েছে বিশেষ নকশা। হয়ে উঠেছে এক্সক্লুসিভ। দেখা গেছে ব্লক প্রিন্টের আধিপত্য। সঙ্গে আছে হাতে সুতার কাজ এবং এমব্রয়ডারির কাজও। সঙ্গে কোনোটায় আছে হালকা পাথরের কাজ। আবার একরঙা সুতি শাড়িতে তিন-চাররঙা পাড়ও এখন বেশ চলছে। নীল, পোলাপি, সবুজ এসব উজ্জ্বল রঙ আপনার উৎসবকে আরও রাঙিয়ে তুলবে। ৮০০ টাকা থেকেই পেয়ে যাবেন পছন্দের সুতি শাড়িগুলো।
জামদানি
সব বয়সে এবং যে কোনো রঙেই সুন্দর লাগা শাড়ি হলো জামদানি। এমন কোনো দিন, উৎসব, সময়, রঙ নেই জামদানির, যেটা আপনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে না। তাই এবারও ঈদে জামদানির বাজার বেশ জমজমাট। ঈদকে সামনে রেখে ফ্যাশন হাউস আড়ং এনেছে ভিন্ন মাত্রার জামদানি। এ বিষয়ে আড়ংয়ের ডিজাইন ইনচার্জ রুনা আফসানা চৌধুরী বলেন, আড়ংয়ের নিজস্ব একটি আর্কাইভ আছে জামদানির। এবার জামদানিতে যেটা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ সেটা হলো ওমরাই ডাই। এটি শেডের মাধ্যমে করা হয়। এ ছাড়া আছে জামদানির সঙ্গে অন্য একটি প্রিন্টের কাপড় দেওয়া ডিজাইন। আছে কোনো কোনোটার পাড়ে ভিন্নতা। চিকন কাজ দেখা যাবে জামদানির সঙ্গে। এ ছাড়া নকশা করা হয়েছে গতানুগতিকের বাইরে। এগুলোর দাম শুরু হয়েছে ৫০ হাজার টাকা থেকে। আবার সময় নিয়ে চলে যেতে পারেন একদিন ডেমরায়। সেখানে জামদানির হাট বসে। যদি কেউ ফ্যামিলির অনেকের জন্য কিনতে চান, তাহলে সেখানে পেয়ে যাবেন পাইকারি দামে।
টাঙ্গাইল
চওড়া জরির পাড়, সঙ্গে সুতার পিটা কাজ অথবা মাঝে মধ্যে একটা করে কলকে, ব্যস এমন একটা টাঙ্গাইল শাড়ি অনায়াসে নজর কাড়বেই সবার। এটার ভালো লাগাটা কখনোই কমার নয়। এবার বাজারে দেখা যাচ্ছে একরঙা শাড়িতে চওড়া পাড়। তাতে পিটা করে সোনালি সুতার কাজ। আবার ছোট ছোট বুটি দিয়ে শাড়িকে করে তোলা হচ্ছে ব্যতিক্রম। তবে টাঙ্গাইল শাড়ির পাড় তো মন কাড়া আছেই, সঙ্গে ভরাট কাজের আঁচলও কিন্তু কম যায় না সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে। আঁচলে কখনও কলকের ছোঁয়া, কখনও বা ময়ূর নকশা করা। গাঢ় রঙের টাঙ্গাইল শাড়িই বেশি টানছে ক্রেতাদের। এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যেই এগুলো পাবেন। ফ্যাশন হাউস টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির ও তাদের নিজস্ব ডিজাইন নিয়ে ক্রেতাদের উপহার দিচ্ছে নজর কাড়া সব শাড়ি।
সিল্ক
সিল্কের বাজার কিন্তু এখন বেশ রমরমা। অনেক ধরনের সিল্ক শাড়ি আছে। জুট সিল্ক, কোটা সিল্ক, চন্দ্রমুখী সিল্ক, পার্বতী সিল্ক, মার্চ রাইজ সিল্ক। একেকটার ডিজাইন এক এক ধরনের। সঙ্গে আছে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এগুলোতে আছে নিচের দিকে চিকন একটানা পাড়। আবার কোনোটা পাড়বিহীন এক ঢালা প্রিন্ট। সিল্কের শাড়িতে পাবেন কুচি প্রিন্ট। শুধু সামনের দিকে এক রকম। যারা পুরোপুরি সিল্ক পরে অভ্যস্ত নন তারা নিতে পারেন হাফ সিল্ক। আবার রাজশাহী সিল্কেও পাবেন মন মাতানো ডিজাইন। আর এগুলোর ফেব্রিক্সগুলো এই সময়ের জন্য খুবই উপযোগী। এগুলোর মূল্য ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। সব ফ্যাশন হাউসই তাদের নিজস্ব সিল্ক কালেকশন বাজারে এনেছে। আড়ং এনেছে তাদের আকর্ষণীয় আড়ং সিল্ক। এগুলো অনেকটাই ঈদ এবং বর্ষা ঋতুকে মাথায় রেখে করা। আবার অঞ্জন'সে আছে সিল্কের বিশাল সম্ভার। এর মধ্যে কটন সিল্ক ও হাফ সিল্ক ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে। আর পিওর সিল্কগুলো ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু।
মসলিন
ঢাকার বিখ্যাত মসলিনের শাড়ির কথা আমরা ইতিহাসেও পড়েছি। সেই শাড়ির চলন কিন্তু সারা জীবনই অন্য রকম। এখনও বাজারে মসলিনের শাড়ির চাহিদা অনেক। হালকা সোনালি অথবা ধূসর রঙের মসলিন আপনাকে করে তুলবে অনন্য। এগুলোর কোনোটায় থাকছে সুতার কাজ। আবার কোনোটায় পিটা কারচুপি। আর জরির পাড় হলে তো কথাই নেই। শাড়ির আঁচলে ও পাড়ে থাকছে অন্য কাপড়ের করা নকশা। নিউমার্কেট ও চাঁদনী চকে পাবেন মনের মতো মসলিনের শাড়ি। সেখানে পাবেন মসলিনের কাপড়ও। পছন্দ মতো রঙের কাপড় কিনে করে নিতে পারেন নিজের মতো ডিজাইন। বসাতে পারেন কাতান পাড়ও। এতে শাড়িটা ভারি হবে।
তসর :তসরের কাপড় কথাটা শুনলেই একটা কেমন জানি ঐতিহ্যের কথা মনে পড়ে। তাই এ আভিজাত্যের চাহিদা এখনও অনেক। ঈদের মতো সবচেয়ে বড় উৎসবকে সামনে রেখে বাজারে এখন তসর শাড়ির কদর জমজমাট বললেই চলে। তসরের শাড়ি কী নকশা করা অথবা একরঙা সব কিছুতেই ব্যতিক্রম। আসমানি রঙের শাড়ির সঙ্গে গাঢ় মেরুন পাড় আবার সবুজের সঙ্গে সোনালি জরির ছোঁয়া_ এসব দিয়ে বেশ নজরকাড়া তসর বাজারে হাজির। আবার কেউ চাইলে নিতে পারেন তসর সিল্কও। এই শাড়ির বৈশিষ্ট্য হলো রঙে। প্রতিটা রঙই যে কোনো বয়সের নারীদের মানিয়ে যাবে অনায়াসে।
জর্জেট-পার্টি, দাওয়াত অথবা দৈন্দিন কাজে খুব দ্রুত পরিপাটিভাবে অংশ নিতে জর্জেট শাড়ির তুলনা হয় না। সহজেই আপনি নিজেকে তৈরি করে নিতে পারেন এতে। তাই ঈদের খুশির সঙ্গে নিজেকে স্মার্ট দেখাতে বাজারে এসেছে জর্জেট শাড়ির কালেকশন। এক্সক্লুসিভ কিছু ডিজাইন নিয়ে জর্জেট শাড়িও মন কেড়েছে ক্রেতাদের। বি-প্লাস এবং বিশালের জর্জেটে পাবেন ব্যতিক্রমতার ছোঁয়া। কোনোটায় বড় বড় ফুল-লতা-পাতা দিয়ে প্রিন্ট আবার কোনোটা ছোট ছোট ফুলে ভরা। নিজের পছন্দমতো পাড় ও পাড়বিহীন সব কালেকশনই আছে এখানে। সাদা-কালোর মিক্স প্রিন্টি, মেরুন-আকাশির ফ্লোরাল ডিজাইন_ সবই পাবেন শোরুমে। এগুলো সবই নিজস্ব ডিজাইন থেকে তৈরি করা হয়েছে বর্তমান ট্রেন্ড অনুযায়ী। দাম শুরু হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে।
কাতান
রিমির বিয়ের পর প্রথম ঈদ। শাড়ি তো অবশ্যই কিনবে। কারণ যে কোনো বড় অকেশনে সে শাড়িই পরে। তাই এবার ঠিক করেছে কাতান নেবে। সেই চিরচেনা কাতান তো আছেই। সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু নতুনমাত্রা। যেমন জুট কাতান। আর মনোরম কাজ করা অপেরা কাতানের তো তুলনা নেই। এগুলোর রঙ এবং নকশাতেই আছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। কাতান শাড়ির মনমাতানো আঁচল তো আছেই। যে রঙেরই শাড়ি হোক না কেন, তাতে থাকবে সোনালি কাজ করা। মিরপুর ১০-এ গেলেই পাবেন কাতান শাড়ির রাজ্য। ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হবে এর মূল্য।
মায়ের জন্য শাড়ি
ঈদে নিজের সাধ্যের মধ্যে শপিং করা হয় বাড়ির সবার জন্যই। আর সবার আগে ভালোবাসা, আনন্দ, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ থেকে যেটা কেনা হয় সেটা মা অথবা শাশুড়ির শাড়িটা। তাই হয়তো একটু সচেতনতার সঙ্গেই এটি কেনা হয়। খেয়াল রাখতে হয় রঙ কাপড়ের দিকে। যেটা পরে আরাম পাওয়া যাবে। তাই সামারকে সামনে রেখে ঈদ কালেকশনে ফ্যাশন হাউস অঞ্জন'সে এসেছে মায়েদের বিশেষ শাড়ি। সুতি শাড়ির মধ্যে ব্যতিক্রম রেখে আনা হয়েছে এগুলো। রঙ খুব একটা গাঢ় না আবার হালকাও না। মার্জিত একটা উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যাবে শাড়িগুলোতে। এগুলোর দাম পড়বে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা।
শিশুর শাড়ি
সাড়ে তিন বছরের মেয়ে লিরা। মায়ের শাড়ি পরা দেখে শখ হয়েছে এবার ঈদে সে শাড়ি পরে মায়ের মতো বড় হয়ে যাবে। তাই এবার শপিংয়ের লিস্টে প্রথমেই আছে লিরার জন্য লাল টুকটুকে একটা শাড়ি। এমন অনেক বাচ্চা বায়না ধরে বসতেই পারে শাড়ি পরে বড় সাজার। আর তাদের বায়না রক্ষা করতে চলে চান ধানমণ্ডি হকার্সে। সেখানে পেয়ে যাবেন ঠিক বড়দের আদলেই ছোট্ট শাড়িটি। পাড় বসানো অথবা হালকা প্রিন্ট করা শাড়ি আপনার সোনামণিকে সত্যিই বড় বানিয়ে দিতে পারে। লাল, হলুদ, বেগুনি এসব গাঢ় রঙই শিশুদের বেশি আকৃষ্ট করে। একটু খেয়াল করে দেখে নেবেন ফেব্রিক্সটি। যেন এই গরমে শিশু পরে আরাম পায়। এগুলোর দাম পড়বে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।

© সমকাল 2005 - 2018

সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com