দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ ত্রাণ নয়, পরিত্রাণ চায়

জলাবদ্ধতা নিয়ে সমকালে গোলটেবিল আলোচনা

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

সমকাল প্রতিবেদক



দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার শিকার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ ত্রাণ চায় না, তারা এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চায়। প্রতিবছর গড়ে সাত-আট মাস জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করতে হয় ওই অঞ্চলের মানুষকে। এর প্রভাবে তাদের জীবিকা অর্জনের জায়গা নষ্ট হচ্ছে। সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। দিনে দিনে তারা দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

গতকাল সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলাবদ্ধতা : চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায় শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজক যৌথভাবে সমকাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, নারী কনসোর্টিয়াম ও ওয়াটার লগিং অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্ম (ডব্লিউএলএপি)।

সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সঞ্চালনায় বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোহসীন। সংশ্নিষ্ট বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরিন। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে নারী কনসোর্টিয়ামের ম্যানেজার ও ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইডের মুনীরুল ইসলাম, হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মো. শফিকুল ইসলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক আমিরুল ইসলাম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আবদুল লতিফ খান, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সিনিয়র প্ল্যানার কাজী মো. ফজলুল হক, দিশারী কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ-এর কনসোর্টিয়াম ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল মামুন, উত্তরণ-এর পরিচালক শহিদুল ইসলাম, সেভ দ্য চিলড্রেনের ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার শুক্লা ঠাকুর, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ-এর প্রোগ্রাম অফিসার খাদেমুল রাশেদ, বিজিএমইএর সিনিয়র ডেপুটি সেক্রেটারি মো. মনোয়ার হোসেন, কেয়ার বাংলাদেশ-এর রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ কো-অর্ডিনেটর পলাশ মণ্ডল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক মনিশংকর সরকার।

মূল প্রবন্ধে মাহবুবা নাসরিন বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ নিরন্তর সংগ্রাম করে চলছে। তাই প্রাথমিকভাবে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করতে যশোরের কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলায় এবং সাতক্ষীরার তালা, সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার মানুষের মধ্যে এক গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জলাবদ্ধতার কারণে সেসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জীবিকা অর্জনের জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে। সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। আয় নেই। দিনে দিনে তারা দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, শতকরা ৭৪ ভাগ নারী পানি সংগ্রহ করে থাকে। জলাবদ্ধতার কারণে তাই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। যশোরে নিজের টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করত ৩৬ ভাগের বেশি মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে মাত্র ৯ ভাগ মানুষ পানি সংগ্রহ করতে পারছে।

মো. মোহসীন বলেন, চলতি বছর বন্যার পানি অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি দিন ছিল। এ পরিস্থিতির কারণ খুঁজে বের করতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু সরকার দ্বারা জলাবদ্ধতা নিরসন করা অসম্ভব কাজ। তাই এ কাজে সবাইকে যুক্ত হতে হবে। বর্তমান সময়ে অনেক ভালো কাজ হওয়ার পাশাপাশি অনেক সংস্থা এ কাজে যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যা করছে, তা অকল্পনীয়। তিনি বলেন, সব কাজের মধ্যে অবশ্যই নেগেটিভ কিছু থাকবে। তাই বলে এটা দেখিয়ে পিছিয়ে গেলে হবে না। সরকার প্রতিনিয়তই বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে। প্রান্তিক মানুষের সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা করেই এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তবে সব কিছুর পাশাপাশি সরকারের সীমাবদ্ধতাও দেখতে হবে।

মুনীরুল ইসলাম বলেন, যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিয়ে নারী কনসোর্টিয়াম কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে। এরই মধ্যে অন্তত ৮১টি ইউনিয়নে সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় কাজ করেছে এবং মানুষ এর সুফল পাচ্ছে। সরকারও প্রচুর কাজ করছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণও করা হয়। স্থানীয়রা এ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান চায়। তারা এখন আর ত্রাণ চায় না। তারা পরিত্রাণ চায়।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। আলোচনার মাধ্যমেই একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে মুস্তাফিজ শফি বলেন, আলোচনায় রাজনৈতিক স্বার্থে এবং নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে ভূমির ব্যবহার এবং তার জন্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টির তথ্য উঠে এসেছে। আঞ্চলিক যেসব রাজনৈতিক নেতার কারণে ৬০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের ব্যাপারে গণমাধ্যমে তথ্য তুলে ধরা হবে।

আমিরুল ইসলাম বলেন, সরকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এর সুফল পেতে হলে স্থানীয়দের ধৈর্যশীল হতে হবে। কাছাকাছি সময়ে কপোতাক্ষ নদ খনন করা হয়েছে। স্থানীয়রা এর সুফল পাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অসহযোগিতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পই ভেস্তে যেতে বসে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি নদী খনন করে তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দুদকের মামলায় পড়েছেন। সাধারণত দুর্নীতি নিয়ে বড় হেডলাইন হলেই নানান হয়রানিতে পড়তে হয়।

শহিদুল ইসলাম বলেন, আশির দশকের পর থেকেই যশোর-সাতক্ষীরা অঞ্চলে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। বর্তমানে আরও কয়েকটি জেলায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সুন্দরবন ও আশপাশেও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এসব এলাকা গড়ে ৮/১০ মাস জলাবদ্ধ থাকে। এতে কমপক্ষে ৬০ লাখ মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে জীবনযাপন করে। অনেকেই আবার বাধ্য হয়ে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়ছে।

আবদুল লতিফ খান বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে কাজ করে জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব নয়। এর জন্য সবাইকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। হাওর অঞ্চলে এখনও পানি জমে আছে। জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া যায় নোয়াখালী-চাঁদপুর এলাকায়ও।

শুক্লা ঠাকুর বলেন, জলাবদ্ধতার সময়ে শিশুদের শারীরিক কার্যক্রম কম, বলতে গেলে বন্ধই থাকে। এতে তাদের দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পলাশ মণ্ডল বলেন, জলাবদ্ধতার সময় পুরুষ জীবিকার সন্ধানে অনত্র চলে গেলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিজ এলাকায় থেকে যেতে হয়। ওই সময়ে তাদের নানান সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের যৌন হয়রানি হতে হয়। সামাজিক কুৎসার ভয়ে শিশুকন্যাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। কিশোরীদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে রাজনীতিতে প্রভাবশালীদের কারণে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। প্রভাবশালীরা বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করার কারণেও জলাবদ্ধতা বেড়ে যায়।



© সমকাল 2005 - 2017

সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com