লন্ডনের দিনরাত্রি

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮

তপন মাহমুদ

যে কোনো ভ্রমণ কাহিনী পড়ার সময় আমার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়ের কথা মনে পড়ে। কী চমৎকারভাবে তিনি বলেছেন, ভ্রমণ থেকে ভ্রমণ কাহিনী হয় বটে, তবে সবার হাত দিয়ে ভ্রমণ কাহিনী হয় না। এ একটি বিশেষ চোখের বিশেষ মন দ্বারা বিশেষ যুগের দেখা একটি দেশের চালচিত্র। সে ভ্রমণ কাহিনীতে একটি ভিনদেশের প্রাণ সঞ্চার করতে পারলে তবেই তা সার্থক হয়ে ওঠে। ফারহিম ভীনার 'লন্ডনের দিনরাত্রি' সে-রকম সার্থক একটি ভ্রমণ কাহিনী।

লেখক ফারহিম ভীনার ভাষায় 'লন্ডনের দিনরাত্রি' একটি প্রবাস আখ্যান। বইয়ের ফ্ল্যাপে চমৎকারভাবে এ আখ্যানের নির্যাস তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- লন্ডনের দিনরাত্রি এক অন্যরকম ভ্রমণ কাহিনী। গতানুগতিক ভ্রমণ কাহিনীর মতো এত পাখি- চোখে বর্ণিল ও আনন্দ নগরী লন্ডনকে দেখা হয়নি। এখানে মনুমেন্টের উচ্চতা আর জাদুঘরের উচ্ছ্বসিত বর্ণনার আতিশয্য নেই। এ কাহিনী হপ-অন, হপ-অফ বাসের মতো দৌড়ে দৌড়ে বিগবেন, টাওয়ার অব লন্ডন বা মিউজিয়াম দেখা নয়। এ রানীবাড়ির প্রহরী বদলের রাজকীয় দৃশ্যের মুগ্ধ বর্ণনা নয়। এ ছুঁয়ে-ছেনে ভিন্ন দেশে সংস্কৃতি ও বহুভাষী মানুষকে একটু একটু করে আবিস্কার ও উপস্থাপন। এ উপস্থাপনে লেখক দ্রষ্টব্য বস্তু ও স্থানে সঞ্চার করেন জীবনের উচ্ছ্বাস ও প্রাণের উল্লাস।

'লন্ডনের দিনরাত্রি' কলেবর গাঁথুনি ও বয়ানে যেন মানসম্পন্ন এক উপন্যাস। একই সঙ্গে দূর এক দেশের ইতিহাস, বহু জনপদ ও ভিন্ন সংস্কৃতির এক চলচ্চিত্র যেন। এ কাহিনীর নায়ক চকচকে ও অভিজাত লন্ডনের সাধারণ মানুষ। এ কাহিনীর মূল ঘটনা ভিন্ন সংস্কৃতিতে বয়ে যাওয়া অপূর্ব এক মিলনধারা। এ বই অপূর্বভাবে তুলে ধরেছে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় এক সমাজ। এ কাহিনীতে অভিবাসী সংগ্রামী মানুষদের লেখক বলেছেন, এরা নতুন সংস্কৃতির নতুন মানুষ। এরা ব্রিটিশ রক্ষণশীল সমাজকে বদলে দিচ্ছে- সাহেবের কিচেনে ঢুকে পড়ছে মসলাদার কারি।

এ বইয়ে পাঠক খুঁজে পাবেন সংগ্রামী শিক্ষার্থীকে;খুঁজে পাবেন কাজ পাগল স্বপ্নবাজ এক মানুষকে। নানা কাজের সূত্রে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন বহু মানুষের সঙ্গে। তাতে তার গল্পের ঝুড়ি হয়েছে রূপকথার চেয়েও চমৎকার ও অভিনব। সেই গল্পের ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে আসে হংকংয়ের তরুণী লেই- সে বলে 'মিসরের পিরামিডে কোনো রহস্য নেই। রহস্য আছে মিসরের মানুষে, মিসরের প্রকৃতিতে। নতুন নতুন দেশ ও মানুষ দেখার আনন্দে আত্মহারা পাঠক খুঁজে পাবে খাওয়া-পরায় আপাত সুখী অভিবাসী মানুষ। এ মানুষ বলে, 'মানুষের কোনো দেশ নেই- নিজস্ব মানচিত্র নেই। পুরো পৃথিবীর ওপর রয়েছে তার ন্যায্য অধিকার। এদের কাছে নিশ্চিন্তে বাঁচাই বাঁচা- হলিডের আনন্দই আনন্দ। এ মানুষেরা আনন্দকে কিনে পকেটে পুরে আনন্দ উপভোগ করে। কিন্তু এ কাহিনী তুলে ধরে, কেবল নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকাটাই বাঁচা নয়। হয়তো পৃথিবীর বহু মানুষ জানে না, বাঁচার মতো বাঁচা কাকে বলে! লেখক সেই প্রকৃত মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকা খুঁজতে লন্ডনকে তোলপাড় করে খুঁজেছেন- অভিবাসী মানুষদের জীবনের আদ্যোপান্ত খুঁজেছেন। তুলে ধরেছেন লন্ডনের বহু সংস্কৃতির উদার সুন্দর জীবনে কালো মানুষের প্রতি সহিংসতা ও বিভাজন। তুলে ধরেছেন এসব মানুষের জীবনের তিক্ততা আর বেদনার অন্য এক চিত্র। চেনা লন্ডনের পেছনের অচেনা ও রহস্যময় লন্ডনকে সত্যিই লেখক অপূর্ব মুনশিয়ানায় তুলে ধরেছেন। এক লন্ডনের ভেতর হাজারো লন্ডন। লেখক দারুণভাবে তুলে ধরেছেন সাধারণ ইংরেজের জীবনের বদলে যাওয়া চালচিত্র। া

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com