কৈশোরে বন্ধু পরিবার

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জোহরা শিউলী

'আমার যখন প্রথম পিরিয়ড হয় তখন আমি আসলে এ বিষয়টার ব্যাপারে তেমন জানতাম না। আমাকে কেউ বলে দেয়নি যে একটা সময় আমার এমন হবে। তাই হঠাৎ করে নিজের এমন পরিস্থিতিতে আমি ভড়কে উঠি। আমার তেমন কেউ বন্ধু  ছিল না। এমনকি আম্মুও বলে দেয়নি শারীরিক এমন একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে আমাকে। কী যে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছিলাম আমি তখন!'

নিজের কৈশোরের কথা এভাবেই বলছিলেন আঞ্জুমান আরা। এমন কৈশোর হয়তো অনেকেই পার করেছেন তার মতো। কিন্তু নিজের মতো তার মেয়ের জীবনটা যেন এমন না হয় সেজন্য মেয়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুঝিয়ে দেন যে, তার শরীরে এমন পরিবর্তন হতে পারে।

অনেক কিশোর-কিশোরীর মা বুঝতেও পারেন না, তাদের এভাবেই সন্তানদের পাশে থাকতে হবে। সন্তানের নতুন এই পরিবর্তনে তাই তারা হকচকিয়ে যান। সৃষ্টি হয় ভুল বোঝাবুঝির। সন্তানের বয়ঃসন্ধিতে বাবা-মা কী করতে পারেন সেই পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা।

পরিবর্তন স্বাভাবিক : বয়ঃসন্ধিতে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের জন্য বেশ খানিকটা সংকট বা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই এ সময় সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত নজর দিতে হয়। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়ে হঠাৎ করেই শারীরিকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা এটা মেনে নিতে পারে না। মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্রণ ওঠা শুরু করে, ঋতুচক্র শুরু হয়। ছেলেদের মুখে দাড়িগোঁফের রেখা ফুটে উঠতে থাকে। কণ্ঠস্বর বদলে যায়। শিশু যখন কৈশোরে পা দেয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সে বেশ আবেগপ্রবণ থাকে। এ সময় তারা যে কোনো ব্যাপারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। এ কারণে অনেকেরই মনে হয়, শান্তশিষ্ট ছেলে বা মেয়ে হঠাৎ কেন রাগী হয়ে উঠল। এ সময় মেয়েদের দৈহিক কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। সাধারণভাবে ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে মেয়েদের নিয়মিত ঋতুচক্র শুরু হয়।

সচেতন করুন আগে থেকে : সবকিছু মিলিয়ে হঠাৎ করেই আমূল পরিবর্তন হয়। এ ক্ষেত্রে যদি মেয়েকে বলে দেওয়া না হয় যে, কিছুদিনের মধ্যেই তোমার এ রকম সমস্যা হতে পারে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক। তাহলে তারা সচেতন হতে পারবে, কোনো মানসিক চাপে থাকবে না। অনেক সময় দেখা যায়, মেয়েরা হঠাৎ করে মোটা হয়ে যায়। তাই এ সময় হালকা ব্যায়াম এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। তবে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হয়, সেটা মানসিক। হঠাৎ করে তারা তাদের শারীরিক পরিবর্তনগুলো মেনে নিতে পারে না। সেক্ষেত্রে বাবা-মা বা পরিবারের যারা বয়স্ক সদস্য আছেন তাদের খোলামেলা কথা বলতে হবে। এ সময় সন্তান সবকিছু শেয়ার করতে চাইবে না। তার সেই সংকোচ দূর করতে হবে। বাবা-মার পাশাপাশি স্কুলের টিচারদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে শারীরিক পরিবর্তনের ব্যাপারটি বোঝাতে পারলে সন্তান বেশি সমস্যায় পড়বে না। আর এ ধরনের সমস্যায় চিকিৎসার চেয়ে কাউন্সেলিং বেশি উপকারী। কাউন্সেলিং করা যেতে পারে। সন্তানের বাবা-মা বা পরিবারের সবচেয়ে কাছের বন্ধু কাউকে দিয়েও এসব কথা বলানো যেতে পারে।

আজকাল একটা সমস্যা আমাদের সমাজে বেশ প্রকট হয়ে উঠতে দেখা যায়। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা সহজেই বয়সজনিত ভুলগুলো করে বসে। তাই এ ব্যাপারে তাদের সচেতন করতে হবে। কারও সঙ্গে অবাধ খোলামেলা সম্পর্ক রাখা ভালো নয়, ভুল করলে তার মাশুল দিতে হবে চড়াদামে। এ বিষয়ে সন্তানকে সচেতন করতে হবে। যৌনতা সম্পর্কেও তাকে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। সর্বোপরি সামাজিক অনুশাসন এবং পারিবারিক বন্ধনটা দৃঢ় করতে হবে।

প্রয়োজন মানসিক সাপোর্ট : বয়ঃসন্ধিকাল আসলে জীবনের একটি ক্রাইসিস মোমেন্ট। সন্তানরা এ সময় যেমন ক্রাইসিসে থাকে বাবা-মাও তেমন একটু অপ্রস্তুত থাকেন। হঠাৎ করে চেনা ছেলেমেয়েগুলো কেন অচেনা আচরণ করতে থাকে। এ সময় তারা নিজেদের একটা আইডেনটিটি খুঁজে পেতে চায়। ওরা একটু স্বাধীনতা চায়, সেই সঙ্গে শারীরিক পরিবর্তনের দুশ্চিন্তা তো থাকছেই। এ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে ওরা একটু একান্তে নিজেদের মতো সময় কাটাতে চায়। বাবা-মা অনেক সময় এ প্রাইভেসিটা পছন্দ করেন না। তারা ভাবেন যে, তারা কী করছে, কেন একা সময় কাটাচ্ছে। এ জায়গাতে যেমন তাদের একটু স্বাধীনতা দেওয়া প্রয়োজন তেমনি বাবা-মাকে একটু সচেতন থাকতে হবে। তার বন্ধু বাছাই, কার সঙ্গে মিশছে এ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে খেয়াল রাখতে হবে। তার প্রত্যেক পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ না করে তার সম্পর্কে সামগ্রিক আইডিয়া রাখতে হবে- কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে ইত্যাদি। তা ছাড়া এ সময় কিশোর-কিশোরীরা তাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। ফলে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে, যা সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। এ সময় বাবা-মায়ের কাছে যদি সন্তান প্রয়োজনীয় পরামর্শ, দিকনির্দেশনা না পায় তাহলে তারা ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। চিন্তার কারণ সেখানেই।

এ বয়সে সন্তানরা না ছোট না বড়, তাই তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে। শারীরিক যে পরিবর্তনগুলো আসে সে সম্পর্কে তার পূর্ব ধারণা না থাকলে সে স্বাভাবিক হতে পারে না। সবার সামনে আসতে একটু সংকোচ একটু দ্বিধা বোধ করে। তাই এ সময় বাবা-মাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে হবে।

সচেতনতা শুরু হোক ঘর থেকে : বয়ঃসন্ধিলেই মেয়েদের ঋতুচক্র শুরু হয়। এ সময় যে কোনো মেয়ে ঘাবড়ে যায়। তাই বিষয়টি তাকে কিছুদিন আগে থেকেই জানাতে হবে। হাতে তুলে দিতে হবে পরিচ্ছন্ন ন্যাপকিন। বাংলাদেশে শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি মেয়ে তাদের মাসিক চলাকালীন অস্বাস্থ্যকর কাপড় বা টিস্যু ব্যবহার করে, যাদের শতকরা ৯৭ ভাগের বেশি নারী নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন। এমনকি চিরকালীন বন্ধ্যাত্বও হতে পারে।

এত বেশিসংখ্যক নারীর ন্যাপকিন ব্যবহার না করার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে লজ্জা এবং সংকোচবোধ। আমাদের দেশে মেয়েদের এ বিষয়টিকে বেশ লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন কিশোরীকে সুস্থ সবল থাকতে সচেতন হতে হবে এই বিশেষ দিনগুলোতে।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com