স্বদেশী

মৈশাসীর আলোকবর্তিকা

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আকেল হায়দার

মোহাম্মদ মিয়ার জন্ম সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মৈশাসী নামক গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। গোটা গ্রামে তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সে সময়ের এন্ট্রান্স পাস করেছিলেন। নিজ বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে হেঁটে প্রতিদিন স্কুলে যেতেন। বর্ষার সময় ভীষণ কষ্টকর হয়ে যেত। প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে রাস্তা ডুবে নদীর মতো হয়ে যেত। একদিনের ঘটনা তিনি বলেন, এক বর্ষার দিনে নৌকা করে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। কিন্তু ভাগ্য এতটাই নির্মম ছিল যে, মাঝপথে নৌকাটা ডুবে যায়। সাঁতার কেটে নিজে রেহাই পেলেও বইগুলো সব ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টির পানিতে। উপায়ান্তর না দেখে পরে স্কুলের পাশেই এক বাড়িতে লজিং টিউটর হিসেবে থাকার ব্যবস্থা করা হলো। তখন বয়স সবে ১৩।

এন্ট্রাস পাসের পর বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সার্ভেয়ার। কাজ শুরু করেন প্রশিক্ষক হিসেবে। তিনি ছিলেন একজন নিবন্ধিত ও প্রশিক্ষিত জরিপকারী। ১৯৬২ সালে ২৬ বছর বয়সে তৎকালীন আজাদ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখে ব্রিটেনে কমনওয়েলথের হয়ে কাজ করার জন্য আবেদন করেন। আত্মবিশ্বাস আর ইচ্ছাশক্তির বলে আবেদন করে অপেক্ষা করতে থাকেন ফল কী হয় তা দেখার জন্য!

ভাগ্যবিধাতা সঙ্গেই ছিলেন, তিনি নির্বাচিত হন ব্রিটেনে প্রত্যাশিত সেই কাজের জন্য। পরিবারের সবাইকে রেখে ১৯৬৩ সালে তিনি ইংল্যান্ড চলে আসেন। আসার সময় মায়ের কাছে তার প্রতিজ্ঞা ছিল, বছর দুয়েক পরেই কিছু অর্থ সঞ্চয় করে দেশে ফিরে কোনো একটা ব্যবসা শুরু করবেন। তিনি ব্রিটেনে থাকাকালে তার এক ভাই, বোন ও মা কলেরায় আক্রান্ত হয়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান।

মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আসার সময় মা আমাকে একটা লেদারের সুটকেস দিয়েছিলেন। যেখানে ছিল একটা ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি আর একটা ছোট ইংরেজি গ্রামার বই। বইয়ের ভাঁজে রাখা ছিল একটা ১০ টাকার নোট। মায়ের দেয়া সেই সুটকেস আর ডিকশনারি আজও সযত্নে রাখা আছে আমার কাছে।

ইংল্যান্ডে প্রাথমিকভাবে তিনি কারখানায় কাজ নেন। রোসেইনডেলে গঠন করেন বাংলাদেশি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। কাজ শুরু করেন বাস কন্ডাক্টর হিসেবে। ক্রমাগত প্রসন্ন দিন হাতছানি দিতে থাকে। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে শুরু করেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। ক্রমান্বয়ে পাঁচটি রেস্টুরেন্টের মালিক হন। পাশাপাশি চালু করেন ক্যাটারিং সার্ভিস। এক সময় তা বিক্রিও করে দেন। অবসরে চলে গিয়ে শুরু করেন বই লেখা। ইংরেজিতে লেখা তার প্রথম বই 'ওল্ড ওয়ার্ল্ড নিউ লাইফ'। এতে তিনি ইংল্যান্ডে তার প্রথম দিককার সময়ের ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন। অন্য তিনটি বই তিনি লিখেছেন বাংলায়। 'ফ্রম মৈশাসী টু ল্যাঙ্কশায়ার', 'মাদার', গাইডিং লাইট'। মাকে নিয়ে ও শিক্ষার দিকনির্দেশনা নিয়ে লেখা। তিনি তার বইয়ের আড়াই হাজার কপি বিনামূল্যে তার গ্রামের শিশুকিশোরদের মাঝে বিতরণ করেছেন, যাতে তারা এসব বই পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়।

প্রাক্তন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পত্তির মালিক মোহাম্মদ মিয়া তার সম্পদের বেশিরভাগই ব্যয় করেছেন তার গ্রামের দরিদ্র শিশুদের লেখাপড়ার কাজে। মৈশাসীর প্রায় পাঁচশ' ছাত্রকে তিনি বৃত্তি দিয়েছেন। অনুদান দিয়েছেন স্থানীয় স্কুলের উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের জন্য। তিনি বলেন, যথেষ্ট অর্থকড়ি থাকা সত্ত্বেও আমি কখনও বিলাসিতা করিনি। নিজের জন্য ঠিকমতো জামা-কাপড় পর্যন্ত কিনিনি।

তার মতে, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই সব। সদিচ্ছা আর চেষ্টা থাকলে জীবনে অনেক কিছুই করা সম্ভব। ভাগ্যের ওপর নিজেকে সঁপে না দিয়ে পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দিয়ে অর্জন করতে হয় নিজের লক্ষ্যবস্তুকে।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com