ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে

অপরিকল্পিত নগরায়ন

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ড. এসএম ইমামুল হক

বিশ্বের কোন কোন শহর বসবাসের জন্য সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে খারাপ- কিছুদিন আগে তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। ১৪০টি শহরের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে ঢাকা। ঢাকার এই দুরবস্থার জন্য সবচেয়ে দায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব। ব্যাপক জনঘনত্বের কারণে সব ধরনের সেবা, সুযোগ, সম্ভাবনা- সবকিছু একটা বড় রকমের চাপের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি নগর কর্তৃপক্ষের শৈথিল্য আর অদক্ষতা তো রয়েছেই। নাগরিকরাও কম দায়ী নয়। নাগরিকদের অসচেতনতা, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, আইন না মেনে চলার প্রবণতা ঢাকার এ দুরবস্থা ডেকে এনেছে। নাগরিকরা সচেতন না হলে এত জনঘনত্বের একটি শহরকে বাসযোগ্য রাখা সত্যিই কঠিন।

ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের একটি বড় অংশের মধ্যে আইন না মানার একটি প্রবণতা াবদ্যমান। সব ব্যাপারেই তারা সরকারকে দোষী সাব্যস্ত করে। এটি তাদের মজ্জাগত। লক্ষ্য করেছি, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার মধ্যেই এই প্রবণতা রয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমারও তো দায়িত্ব-কর্তব্য আছে। উন্নত দেশের সঙ্গে অনেকেই বাংলাদেশের তুলনা করেন। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে আইন অমান্য করা। উন্নত দেশগুলো এটি ঠিক করেছে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মধ্যে, প্রয়োজনে বল প্রয়োগে। কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুরে এক ব্যক্তি রাস্তায় ময়লা ফেলেছিল। তার শাস্তি হয়েছে- সে প্রতিদিন লিফট পরিস্কার করবে। প্রতিদিন তা দেখানো হবে টেলিভিশনে। এ ধরনের শাস্তির পর লজ্জায় কেউ কি সেই কাজ পুনরায় করবে? আমাদের দেশে শাস্তির প্রসঙ্গ এলেই গণতন্ত্রের কথা আসে, অধিকারের কথা আসে। গণতন্ত্র মানে তো আইনহীনতা নয়, আইন অমান্য করা নয়। আমি যা খুশি করব, আর ব্যর্থতার দায় চাপাব সরকারের ওপর- এটি হতে পারে না। আমি মনে করি, ঢাকা শহরকে আরও বাসযোগ্য করতে হলে জনসংখ্যার চাপ কমানোর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাবাসীকে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান দিতে হবে এবং খানিকটা জোর করে হলেও তাদের এ কাজগুলো করতে বাধ্য করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে পুলিশের দরকার নেই। প্রতিটি ওয়ার্ড কমিশনারের অধীনে যেসব লোক আছে তাদের বলা হবে, প্রথমে ভালো করে বুঝাও, না হলে কান ধরে ওঠবস করাও। শাস্তির নমনিা থাকলে লজ্জার খাতিরে হলেও মানুষ অভ্যাসে পরিবর্তন আনবে।

পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাই- ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা, সুন্দর, শান্ত, সুশৃঙ্খল নগরী ছিল ঢাকা। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠত। বাসগুলো তখন শুধু স্ট্যান্ডে থামত। আর এখন রাস্তার মাঝখানে হুটহাট বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়। দিন দিন বাস সার্ভিস খারাপ হয়েছে। শুধু তাই নয়, মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধও দিন দিন কমে আসছে। সব বিষয়ে একটি অসুস্থ অস্থিরতা কাজ করছে। তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল কয়েক লাখ। এখন তো দুই কোটির ওপরে। রাস্তাঘাট ছিল ছোট ছোট। মনে পড়ে, হাইকোর্টের সামনের সড়কে সাইকেলের আলাদা লেন ছিল। আমরা অন্যান্য দেশের সিটির উদাহরণ দিয়ে বলি, সাইকেলের আলাদা লেন করতে হবে, অথচ ঢাকাতেই এক সময় এ ব্যবস্থা ছিল। এটি আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। এত ঘরবাড়ি, দালানকোঠা তখন ছিল না। বাতাস

নির্মল ছিল, মানুষ কম ছিল। এত নাগরিক সমস্যাও ছিল না।

ঢাকা শহরে জনসংখ্যা কেন বাড়ছে? এই ঢাকা শহরে ৫০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে। ঢাকায় এত বেশি বিশ্ববিদ্যালয় করতে দেওয়া উচিত হয়নি। স্কুল-কলেজের কথা উঠলে সবাই বলে- ছেলেমেয়েকে ঢাকায় পড়াতে হবে। কেন? সারাদেশে ভালো ভালো স্কুল-কলেজ আছে। সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালে অসুবিধাটা কোথায়? শুধু চিকিৎসার জন্যই অসংখ্য মানুষ ঢাকায় আসে। চিকিৎসকরা মফস্বলে থাকতে চান না, প্রয়োজনে তাদের বাধ্য করতে হবে। ঢাকার পরিবেশের অবস্থা শোচনীয়। তাপমাত্রা বাড়ছে। যথেষ্ট বৃক্ষরাজি নেই। গাছপালা যা ছিল, সেগুলো কেটে আমরা ভবন বানিয়েছি। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। আমাদের স্বাভাবিক ড্রেনেজ সিস্টেম, খালগুলো হারিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরেরবার ক্ষমতায় গেলে খালগুলো ফিরিয়ে আনবেন। এ শহরকে বাঁচাতে এটি ভালো উদ্যোগ। তাকে অগ্রিম ধন্যবাদ।

আমাদের বাসার আশপাশে খোলা জায়গাগুলোয় বড় বড় গাছ না হোক, অন্তত ফুলের গাছ লাগালেও পরিবেশ সুন্দর হয়। ছাদেও রাখা যেতে পারে ফুলের টব। মানুষের সচেতনতা অনেক কমেছে। পরিবেশ ভালো না থাকলে যে মানুষ ভালো থাকবে না- সে বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। নাগরিক, নগরবিদ, নগরপিতা- সবারই সচেতনতা দরকার। না হলে এ শহরকে বাসযোগ্য রাখা যাবে না। বুড়িগঙ্গার আশপাশে গড়ে তোলা হয়েছে অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানা। হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্য পানিতে মিশে দূষণ করবে- সেটি কারও মাথাতেই ছিল না। ফল যা হওয়ার হয়েছে; বুড়িগঙ্গা দূষিত হয়েছে। ভবিষ্যতের কথা কেউ চিন্তা করেনি। পরিবেশ দূষিত করতে ৫ থেকে ১০ বছর লাগে। আর ১০০ বছরেও দূষিত পরিবেশকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় কি-না সন্দেহ! বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করতে হবে। দূষণ বন্ধে জোর মনিটরিং করতে হবে।

ঢাকার যানজট অসহনীয়। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকা আদর্শ নগর হয়ে ওঠেনি। ফুটপাত বেদখল। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং আর রিকশা-ভ্যান সড়কের অনেকটাই দখল করে রাখে। গাড়িচালক ও পথচারীরা ট্রাফিক আইন মানে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অনুযায়ী যানবাহন চলাচল করে না। কেন এ রকম হবে? পুলিশের হাতের ইশারার সেকেলে সিস্টেম বিলোপ করে ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু করতে হবে। ঢাকার চারপাশে নদীপথ কাজে লাগাতে পারলে যানজট কমত। নদীপথগুলো সচল করার জন্য সরকার চেষ্টা করেছে। এখানে সব সময় একটি দুষ্টচক্র কাজ করে। তাদের বিরূপ আচরণের কারণে এটি সম্ভব হয়নি। নদীপথ চালু হলে যাত্রী হবে না- এটি আমি বিশ্বাস করি না। হাতিরঝিলে নৌকা পারাপার সিস্টেম চালু আছে, সব সময় নৌকাভর্তি যাত্রী থাকে।

ঢাকা বড় হচ্ছে। নতুনভাবে যে এলাকাগুলো গড়ে উঠছে, সেগুলো পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। ঢাকা শহরে জনসংখ্যা একটি বড় সমস্যা। আমার মনে হয়, এই জনসংখ্যার অর্ধেকেরই কোনো কাজকর্ম নেই। তারা ঢাকায় আসে কাজের খোঁজে। গ্রামে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না, অথচ তারা ঢাকায় এসে রিকশা চালায়। ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে রিকশা উঠিয়ে দিতে হবে। বাড়াতে হবে পাবলিক পরিবহন। মেট্রো রেল, ইউলুপ, নতুন নতুন উড়াল সেতু হলেও ঢাকার জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমার মনে হয়, দ্বিতীয় একটি রাজধানী হওয়া উচিত। আমি চাই, সেটি হোক বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায়। দ্বিতীয় রাজধানী হলে ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমবে। সচিবালয় ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হলে জনসংখ্যার চাপ অনেকটাই কমত। সব মন্ত্রণালয় ঢাকায় থাকতে হবে কেন? যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেতে পারে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বরিশালে। কৃষি মন্ত্রণালয় সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে ময়মনসিংহ কিংবা উত্তরবঙ্গে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব ভালো উদ্যোগ।

শিল্প প্রতিষ্ঠান যতটা সম্ভব ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করতে হবে। সব গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান ঢাকা শহরে থাকতে হবে কেন? এসব গার্মেন্টের পণ্য নৌপথে বিদেশে পাঠানো হয়। বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে কিছু যায় না। যায় চিটাগাং থেকে, নয় তো নারায়ণগঞ্জ কিংবা চাঁদপুর থেকে। তেজগাঁও শিল্প এলাকা যখন করা হয়েছিল, তখন এটি মূল ঢাকার বাইরে ছিল। পাশেই ছিল বালু নদী। এখন কোথায় সেই নদী? এখন এটি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে চলে এসেছে। ঢাকাকে বাঁচাতে এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন- শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা কী হবে? তাদের থাকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান করবে। ঢাকার বাইরে জীবন নির্বাহ ব্যয় অনেক কম। এতে তাদের সাশ্রয়ও হবে।

শিল্প-কারখানা সরিয়ে নেওয়া হলে ঢাকার ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে দেশের গ্রামগুলোকে শহরায়িত ও সেখানে সমান সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। তবেই ঢাকামুখী মানুষের স্রোত বন্ধ হবে এবং আরও বসবাসের উপযোগী ও আদর্শ নগরী হবে ঢাকা।

উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
imamhuq@hotmail.com

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com