প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ এবং কিছু কথা

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মহিউদ্দিন খান মোহন

অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এক বক্তৃতায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ধন-সম্পদের দিকে গা না ভাসিয়ে নিজেদের আদর্শিক নেতা হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। গত ৩১ আগস্ট গণভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা স্মরণে ছাত্রলীগ আয়োজিত সভায় তিনি ওই আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, 'নিজেদের আদর্শিক নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আদর্শ নিয়ে নিজেকে গড়ে তুললেই ইতিহাসে তোমরা মূল্যায়ন পাবে, স্থান পাবে। কিন্তু ধন-সম্পদের দিকে গা ভাসালে হারিয়ে যাবে।'

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে তার এ বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনীতিতে অবক্ষয়ের যে ধারা বহমান রয়েছে, তাতে শীর্ষ নেতা- নেত্রীরা যদি তাদের উত্তরসূরিদের সৎভাবে ও সৎপথে চলতে পরামর্শ না দেন, আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতে পারে। আমাদের সমকালীন রাজনীতিতে আদর্শের যে সংকট চলছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কাছে এখন আদর্শ গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিত্তবৈভব গড়ে তোলা। ফলে সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতি বা রাজনীতিকদের আগের মতো শ্রদ্ধা বা সম্মানের চোখে দেখে না। কিছু দুর্নীতিবাজ ও আদর্শচ্যুত রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কারণে মানুষ গোটা রাজনীতিই এখন মানুষের কাছে প্রশ্নবোধক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারণে এখনও যারা সততার সঙ্গে রাজনীতি করতে চান, আদর্শকে সমুন্নত রেখে পথ চলতে চান, জনগণ তাদের দিকেও সন্দেহের আঙুল তোলে।

রাজনীতি কোনো পেশা নয়, ব্রত। অতীতে যারা এ ব্রত গ্রহণ করেছেন, তারা দেশ ও মানুষের জন্য ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করেছেন, জনকল্যাণে ব্যয় করেছেন নিজের সহায়-সম্পদ। আমরা যদি আমাদের এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে দৃকপাত করি, তাহলে মানবকল্যাণে আত্মোৎসর্গকারী অনেক রাজনীতিকের দেখা পাব। ভারতে যিনি 'বাপুজী' হিসেবে সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয়, সেই মহাত্মা গান্ধীর জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করলে একজন মানবদরদি রাজনীতিকের ছবিই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে। তেমনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন বিশ্নেষণ করলেও আমরা দেশ ও জাতির স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দেওয়া মহান রাজনীতিকদের সন্ধান পাব। তারা কখনোই অর্থ-সম্পদ, বিত্তবৈভব গড়ার চিন্তা করেননি, চেষ্টা তো দূরের কথা। এমনকি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি রাজনৈতিক কারণে বিরুদ্ধবাদীদের দ্বারা সমালেচিত, তার বিরুদ্ধেও কেউ দুর্নীতির কোনো অভিযোগ তুলতে পারেননি। আমাদের ওই পূর্বসূরিদের সে চারিত্রিক বল ছিল। তারা সব ধরনের দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। আর সে জন্যই তারা আজও আমাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন।

কিন্তু আজ যখন আমরা আমাদের রাজনীতিকদের দিকে তাকাই, ব্যথায় হৃদয় কুঁকড়ে যায়। এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতার নৈতিক অধঃপতন এতটাই হয়েছে যে, আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের বিবেকে বাধে না। তারা দল একটা করে এবং বক্তৃতা-ভাষণে নিজেদের সে দলের আদর্শের সৈনিক হিসেবে বাগাড়ম্বরও করে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যখনই অর্থবিত্তের প্রশ্ন আসে, তখনই তাদের চেহারা পাল্টে যায়। তারা হয়ে ওঠে অর্থ-লোলুপ। নীতি আদর্শ শিকেয় তুলে রেখে তারা পরধন আহরণে মত্ত হয়ে ওঠে।

মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমে এ শ্রেনির রাজনৈতিক নেতাদের কীর্তি-কলাপের কাহিনী প্রকাশিত হয়, যা দেখে বা শুনে বিবেকসম্পন্ন মানুষরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এদের কেউ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, কেউ নেতৃত্ব দেন টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি কিংবা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি দখলে, কেউ মাদক সম্রাট হিসেবে 'খ্যাতি' অর্জন করেছেন, কেউ স্বীয় স্বার্থে প্রবৃত্ত হয়েছেন প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো গর্হিত কাজে। যারা আইন প্রণেতা, তারাই যখন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নানা ধরনের অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়, সমাজের পেশাদার অপরাধীরা তখন তো উৎসাহিত হবেই।

আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক চিত্রটা কী? সর্বত্র দুর্নীতি-অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি অফিস-আদালতে ঘুষ এখন আর লুকিয়ে লেনদেনের বিষয় নেই। প্রকাশ্যে রীতিমতো চলে দরকষাকষি। অনেক বছর আগে একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তৃতা শুনেছিলাম। সরকারি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, 'সরকারি কর্মচারীদের কথা পরিস্কার। তাদের নীতি হলো- চাকরি করি বেতন পাই, কাজ করি পয়সা খাই।' এ কথার মর্ম নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। একটি সুস্থ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে নীতি ও আদর্শের বিস্তার ঘটাতে হবে। কারণ একটি দেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনীতিক ও রাজনীতির বাইরে যারা আছেন, তাদের সবারই সমান দায়িত্ব রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলো, আমরা অধিকাংশ মানুষ সে দায়িত্ব পালন করি না।

বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে নীতি-আদর্শের চর্চা আছে কিনা, তা একটি বড় প্রশ্ন। কর্মীরা দলের আদর্শ বোঝার চেয়ে নেতার নামে স্লোগান দেওয়া এবং তার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তারা ধরে নেয় যে, নেতার প্রভাব ব্যবহার করে অর্থবিত্ত গড়ার সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আর সে জন্যই সরকারি কাজের টেন্ডার দখলে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-ক্যাডারদের কখনও কখনও রক্তক্ষয়ী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে দেখা যায়। আর এসব ক্ষেত্রে নেপথ্য কারিগরদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হয় সংশ্নিষ্ট দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীরা। অথচ এ সময়ে তাদের রাজনীতির আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে জ্ঞান আহরণে সময় ব্যয় করার কথা। কেন তারা এমন বিপথে চলছে? এ প্রশ্নের জবাব একটাই- তারা একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতার স্বার্থের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। আর কর্মীরা যখন চোখের সামনে নেতাদের অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে দেখে, তখন তারাও উৎসাহী হয়ে ওঠে বিপথে চলতে। এখানে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। বেশ কয়েক বছর আগে দেশের ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়া চলাকালে একটি জেলার এক ছাত্রনেতা এসে আমাকে অনুরোধ করে বলল, আমাদের দলের অমুক নেতার সঙ্গে তো আপনার ভালো সম্পর্ক, তাকে বলে আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটি পদের ব্যবস্থা করে দিন। প্রশ্ন করলাম- কেন? তুমি তো জেলা কমিটির সেক্রেটারি আছই। কেন্দ্রীয় পদ কী দরকার? জবাবে সে যা বলেছিল, তাতে আমি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। সে বলেছিল- 'দেখুন, কেন্দ্রীয় একটি পদ থাকলে এলাকায় টেন্ডার-ফেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করা সহজ হয়।' আমি তাকে পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছিলাম এই বলে যে, তোমাদের মতো কর্মী থাকলে একটি রাজনৈতিক দলের সূর্য ডুবতে বেশি সময় লাগবে না।

অবস্থাটা দেখুন। আগে ছাত্ররা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতো দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মোৎসর্গের প্রত্যয় নিয়ে। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কোনো চিন্তা তাদের মধ্যে থাকত না। আমাদের দেশের বরেণ্য অনেক রাজনীতিকই ছাত্ররাজনীতি করে এসেছেন। পরবর্তীকালে তাদের কারও কারও পদস্খলন বা নৈতিক স্খলন ঘটেনি, তা অবশ্য নয়।। হয়তো বিত্তবৈভবের মোহ তাদেরকে বশ করে ফেলেছে। তবে ছাত্র অবস্থায় তারা কখনোই এখনকার ছাত্রনেতাদের মতো অর্থ-সম্পদ গড়ার সংগ্রামে লিপ্ত হননি। আগে ছাত্রনেতাদের দেখা যেত প্যান্ট, হাওয়াই বা টি শার্ট পরে রিকশা বা বাসে চড়ে চলাফেরা করতে। এখনকার ছাত্রনেতাদের কেউ কেউ পাজেরো-প্রাডো গাড়ির মালিক, কারও কারও রয়েছে রাজধানীতে বাড়ি বা ফ্ল্যাট। কেউ আবার রাজধানীর অভিজাত এলাকায় লাখ টাকা ভাড়ার বাসায় যাপন করে বিলাসবহুল জীবন। এসবের উৎস কোথায় তা বোধ করি বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিত্তবৈভব গড়ারা যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বর্তমানে আমাদের সমাজে চলছে, তা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, ভেবে দেখা দরকার। সমাজ আজ অনিয়ম-অনৈতিকতার করালগ্রাসে পতিত। নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ গা ভাসিয়ে দিয়েছে ধন-সম্পদের পাহাড় তৈরির স্রোতে। এ সর্বনাশা স্রোতে ভেসে যাওয়ার হাত থেকে এদের উদ্ধার করতে হবে। নইলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমরা দোষী হয়ে থাকব।

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ যে, তিনি তার নিজ ঘর থেকেই কাজটি শুরু করেছেন। সাবধান করেছেন নিজ দলের কর্মীদের। কিন্তু তার এ নির্দেশনা তার দলের ওই কর্মীরা কতটা আমলে নেবে, এ প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই উঠতে পারে। কারণ, গত প্রায় দশ বছরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সারাদেশে যেসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর জানা আছে। এমনকি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী একটি অংশের কর্মকাণ্ডের কারণে ত্যক্তবিরক্ত প্রধানমন্ত্রী বছর আটেক আগে সংগঠনটির অভিভাবকের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন! শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি সরে যাননি; তবে ছাত্রলীগের কর্মীদের যথেষ্ট শাসন করেছিলেন। ছাত্রলীগ নেতারাও তাদের মূল নেত্রীর কাছে ওয়াদা করেছিল, কোনো ধরনের খারাপ কাজ না করার। কিন্তু হতাশার কথা হলো, তারপরও পত্রিকার পাতা খুললেই তাদের নানা অপকর্মের খবর পড়তে হয়।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের পরামর্শ তার সংগঠনের কর্মীরা কতটা আমলে নেবে, জানি না। তার এ আহ্বানের গুরুত্ব কম নয়। এটা শুধু আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ নয়, দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রযোজ্য। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা যদি তাদের নিজ নিজ সংগঠনের কর্মীদের সুপথে চলার পরামর্শ দেন, অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন, তাহলে রাজনীতিতে বিরাজমান অবক্ষয়ের প্রবণতা হয়তো অনেকাংশেই হ্রাস পাবে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com