বাইক্কা বিলে...

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বুনোফুলের গাছের ভেতর দিয়ে সরু সিঁথির মতো কাঁচা মাটির পথ পেরিয়ে এগিয়ে চলছি। পথিমধ্যে ঝরা পাতা যেন তার কাব্যগাথা রচনা করেছে। বাইক্কা বিল ঘুরে এসে লিখেছেন সুমন্ত গুপ্ত

বাংলার রূপ যে বর্ষাতেই সবচেয়ে সুন্দর-সে বন্দনা আছে শত লেখকের গল্প-কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে এখনকার নতুন কবি- কার লেখায় নেই বাদলা দিনের বন্দনা! তবে লেখকের দেখার চোখ এখন অনেক সাধারণের মধ্যে প্রভাবিত। তাই বর্ষাকাল হয়ে ওঠে ভ্রমণকাল। বর্ষায় পাহাড় যেমন সবুজে ঘেরা, ঠিক বিল যেন আরও বেপরোয়া। গত বর্ষায় সকালবেলা বের হয়েছি আমি আর আমার ভ্রমণ সঙ্গী সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত। আমরা আছি চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে। আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি শ্রীমঙ্গলের পথে-প্রান্তরে। লাউয়াছড়া ফরেস্ট থেকে আমাদের গন্তব্য বাইক্কা বিল অভিমুখে। আকাশের মন ভালো নেই, তাই একটু পরপর অঝোর ধারায় বর্ষণ হয়েই চলেছে। বৃষ্টির মাঝে আমাদের তিন চাকার গাড়ি এগিয়ে চলছে তার নিজস্ব ছন্দে। এদিকে আমার ভ্রমণসঙ্গী বৃষ্টির স্পর্শ পেতে তার হাত বাড়িয়ে দিল সামনের দিকে। আমরা এগিয়ে চলছি, মাঝে মধ্যে রাস্তার করুণ দশা আমাদের হাঁপিয়ে তুলছে। চলছি তো চলছি, পথ যেন আর শেষ হয় না। এদিকে পেটে চলছে রাম-রাবণের যুদ্ধ, তাই পেটে কিছু দেওয়া খুব অত্যাবশ্যক। আমাদের পাইলট মহোদয়কে বললাম কোনো খাবারের দোকানের সামনে গিয়ে কিছু সময়ের বিরতি দিতে। কিছু দূর যেতেই তিনি ঘোষণা দিলেন যে, স্যার, এখানে কিছু খেয়ে নেন। গাড়ি থেকে নেমে হোটেলের নাম দেখে খুব খুশি হলাম 'বাইক্কা বিল রেস্টুরেন্ট'। মনে মনে খুশি হলাম এই বুঝি চলে এসেছি বাইক্কা বিলে। পাইলট সাহেবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, বাইক্কা বিল আরও ভেতরে। যাই হোক, আমরা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। স্বল্প সময়ের ভেতর একজন এলেন হাসিমুখে। কী খাবেন- কৈ মাছ, রানী মাছ, দেশি সরপুঁটি, পাবদা, আইড়, গুলশা, চিতল মাছ। এতগুলো নাম শুনে আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম কোনোটা রেখে কোনটা খাব। শেষ পর্যন্ত রানী মাছ, দেশি সরপুঁটি, পাবদার অর্ডার দিলাম। গরম গরম ভাত এনে দেওয়া হলো, সঙ্গে চাহিদা মতো হরেক মাছ। সবকিছুই গরম গরম পরিবেশন করা হলো। আমি পাতে লবণ বেশি খাই, তাই আমার কাছে তরকারিতে লবণ খানিক কম হলেও অসাধারণ লাগছিল স্বাদ। পেট পূজা শেষ করে আমরা আবার গাড়িতে চেপে বসলাম। বলে রাখা ভালো, হাইল হাওরটি বর্ষায় ১৪ হাজার হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত হয় এবং শুস্ক মৌসুমে ৩১টি বিল ও বেশক'টি খালে খণ্ডিত হয়ে চার হাজার হেক্টর জলাভূমিতে সংকুচিত হয়ে যায়। হাইল হাওর এলাকার ৬০টি গ্রামের ৩০ হাজার বসতবাড়িতে প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার মানুষ বাস করে। পশু চারণা, পশুখাদ্য আহরণ, গৃহনির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ, খাদ্য ও ঔষধি হিসেবে শাক-পাতার প্রয়োজনে হাওরের ওপরই নির্ভরশীল এসব মানুষ। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম বাইক্কা বিলে প্রবেশমুখে। তিন চাকার গাড়ি থেকে নেমে আমরা পদব্রজে এগিয়ে গেলাম। প্রবেশমুখে বড় নামফলকের দেখা পেলাম। বাঁ দিক ধরে হাঁটলে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এক কিলোমিটারের মতো হবে। আর ডান দিক ধরে হাঁটলে ১০০ মিটার দূরত্ব হবে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের। আমরা বাঁ দিক ধরেই এগিয়ে গেলাম। অসাধারণ পরিবেশ চারপাশে পাখিদের কলকাকলি। এর মাঝেই আমরা এগিয়ে চললাম। বৃষ্টির দেখা পেয়ে কাঁচা মাটিতে ফুটে থাকা বুনোফুলের সঙ্গে একটা সোঁদা গন্ধ এসে নাকে লাগছে। বুনোফুলের গাছের ভেতর দিয়ে সরু সিঁথির মতো কাঁচা মাটির পথ পেরিয়ে এগিয়ে চলছি। পথিমধ্যে ঝরা পাতা যেন তার কাব্যগাথা রচনা করেছে।



লেখা ও ছবি: সুমন্ত গুপ্ত

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com