নোয়াখালীর বেদেপল্লীতে হামলা, আগুন

চারদিকে পোড়া গন্ধ, উচ্ছেদ আতঙ্ক

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া ঘরের চাল-বেড়া ও আসবাবপত্র। রান্না করা ভাত, চালও এদিক-সেদিক ছড়ানো-ছিটানো। গতকাল মঙ্গলবার সকালে হয়ে যাওয়া বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রের ছাই। পোড়া গন্ধের সঙ্গে মিশেছে বাসিন্দাদের বিলাপ। এ দৃশ্য নোয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামের বেদেপল্লীর। সোমবার বেদেদের হাতে নির্যাতনের শিকার স্থানীয় এক কিশোরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পুরো বেদেপল্লীতে তাণ্ডব চালানো হয়। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এ তাণ্ডবে বেদেদের অন্তত ৫০টি ঘর ভাংচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় লুটপাট ও বেদেদের মারধর করারও অভিযোগ উঠেছে। শত শত বেদে পরিবার সোমবার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে। হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর বেদেরা এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও তাদের আতঙ্ক কাটেনি।

জানা যায়, সদর উপজেলার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামে বছর দশেক আগে কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুরের কচুয়া, কুমিল্লার চান্দিনা ও ঢাকার সাভার এলাকা থেকে বেদেরা ১০ একর জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। এলাকাটি বেদেপল্লী নামে পরিচিত হয়। এ পল্লীতে সহস্রাধিক বেদে বসবাস করে। শুকনো মৌসুমে আট মাস পল্লীর বাইরে গিয়ে তারা নানা পেশায় আয়-রোজগার করে থাকে। বর্ষা মৌসুমের চার মাস পল্লীতে এসে বসবাস করে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের ওই ১০ একর জমির ওপর চোখ পড়ে স্থানীয় এওজবালিয়া ইউপি সদস্য আমিন ও তার লোকজনের। ২০১৬ সালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পল্লীতে হামলা করে বেদেদের উচ্ছেদের চেষ্টা করেছিল আমিন মেম্বারের লোকজন।

ঘটনার সূত্রপাত :পুলিশ, এলাকাবাসী ও পল্লীর কয়েকজন বেদে নেতা জানান, শনিবার বিকেলে বেদে পল্লীর এক কিশোরী আইসক্রিম কিনতে পাশের বরইতলা নামক স্থানে মহিনের দোকানে যায়। ওই দোকানের ভেতরে থাকা স্থানীয় কিশোর তারেক ও রুবেল ওই কিশোরীকে উদ্দেশ করে অশালীন মন্তব্য করে। ঘটনাস্থলে থাকা কিশোরীর চাচাতো ভাই লিটন এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করে তারেক ও রুবেল। ওইদিন সন্ধ্যায় বেদেপল্লীর কিছু যুবক মাদক বিক্রি করছে- মোবাইল ফোনে এমন দৃশ্য ধারণ করছিল তারেক। পল্লীর দৃশ্য ভিডিও ধারণের খবর পেয়ে এবং আগের ঘটনার ক্ষোভ থেকে কয়েকজন বেদে যুবক তারেককে ডেকে মারধর করে। তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তারেক স্থানীয় সেলিমের চা-দোকানে গরম তেলের কড়াইয়ে পড়ে যায়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান ঝলসে যায়। পরে স্থানীয়রা তারেককে প্রথমে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা নেওয়ার পথে তারেক মারা গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরপর পাঁচ-ছয়শ' লোক সোমবার সকাল ১০টা থেকে দফায় দফায় দুপুর ২টা পর্যন্ত বেদেপল্লীতে হামলা চালায়।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, হামলাকারীরা বেদেপল্লীতে হামলা চালিয়ে ধ্বংসলীলায় পরিণত করেছে। বেদেরা জানান, হামলাকারীরা হামলার সময় বেদেদের বসতঘরে থাকা স্বর্ণালঙ্কার, টাকা-পয়সা, টিভি, টেবিল ফ্যান ও ২০-৩০টি সোলার ব্যাটারি লুট করে নিয়ে যায়। নারীদের মারধরসহ শ্নীলতাহানি করে। আগুনে পুড়ে গেছে বেদেদের জমির দলিল, তাদের ব্যবসায়িক যন্ত্রপাতি ও শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। বেদে নুরুজ্জামান, রাজু, মালা বিবি, তাহেরা খাতুনসহ অনেকে বলেন, সাপের খেলা দেখিয়ে আমরা জীবিকা নির্বাহ করি। শতাধিক বিরল প্রজাতির সাপে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বেদেপল্লীর কয়েকজন নেতা জানান, পল্লীর ১০ একর জমির ওপর স্থানীয় এওজবালিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নূর আলম ওরফে আমিন মেম্বার ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি হেলাল আবাসন প্রজেক্ট করার ষড়যন্ত্র করে আসছে। তারাই গুজব ছড়িয়ে বেদেদের উচ্ছেদের জন্য পল্লীতে হামলার জন্য এলাকাবাসীকে উস্কে দেয়। তারা আরও বলেন, বেদেপল্লীর কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের এখান থেকে উচ্ছেদ করতেই বিভিন্ন সময় মাদক বিক্রিসহ বেদেদের বিরুদ্ধে নানান অপপ্রচার চালিয়ে আসছে স্বার্থান্বেষী মহল।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আমিন মেম্বার বলেন, একটি মেয়েলী ঘটনাকে কেন্দ্র করে গরম তেলে ঝলসে যাওয়া আহত যুবক তারেক মারা যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে তার বাবা বাহার ও স্বজনরা স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর আমরা জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ নেতাকর্মীরা নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর নির্দেশে হামলাকারীদের প্রতিহত করি। বেদেরা আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এদিকে, দগ্ধ যুবক তারেক আজিজের বাবা বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে সোমবার সন্ধ্যায় সুধারাম মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অন্যদিকে বেদে সর্দার জাকির হোসেন বাদী হয়ে ২৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েকশ' জনকে আসামি করে একই থানায় মামলা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে আটক করেছে।

নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলেন, পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হামলার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। হামলার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

ঘটনার পর সোমবার বিকেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাদ্য ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন। এ সময় একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, বেদেরা এদেশেরই নাগরিক। তাদের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।





© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com