হিংসে হয়!

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অনিমেষ আইচ

'অনুকরণ নয়, অনুকরণ নয়, নিজেকে খুঁজুন, নিজেকে জানুন, নিজের পথে চলুন।'
-ডেল কার্নেসি

কর্ণকুহরে এই কথার প্রতিধ্বনি যেন শুনতে পাই সব সময়। নিজের পথ আবিস্কার করা কি সত্যিই খুব সহজ? আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে না হলেও খুব একটা কঠিনও কিন্তু নয়। এই বাংলার রয়েছে সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সুতরাং আমাদের কি দায় অচেনা সংস্কৃতির দাসত্ব করার। এত কঠিন করে না বলে যদি সহজে বলতে চাই তবে বলতে হয়, এ সময়ের দর্শক রুচি এবং নির্মাতাদের দায় নিয়ে সবিনয়ে কিছু পেশ করতে চাই আজ আমার এই বয়ানে।

ভিউ, লাইক, ফলোয়ার- এই কতিপয় শব্দে ইদানীং আমরা আচ্ছন্নপ্রায়। বিষয়টিকে একেবারে যে অগ্রাহ্য করা যায়, তা না। তবে এই নেশায় বেশিক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকলে বাঙালি জাতি যে চিরস্থায়ী চোরাবালিতে আটকে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। অতিসম্প্রতি আমরা যারা দিবস-রাত্রি ফেসবুক এবং তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়ায় মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে বসে আছি, তারা কিছু বিকৃত এবং রুচিহীন কর্মকাণ্ডকে [সেফুদা, হিরো আলম ইত্যাদি ইত্যাদি] তাচ্ছিল্য করতে গিয়ে মনের অজান্তেই তাদের উদ্ভট কর্মকাণ্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা করে ফেলছি। অনেক না-বুঝ সাধারণ মানুষরা ভাবছে, এসব বিকৃততাই হয়তো বা সফলতার অন্যতম হাতিয়ার। আমি নিশ্চিত সামনে গণ্ডায় গণ্ডায় এসব সেফুদা, হিরো আলম পাইপলাইনে অপেক্ষা করছে। এখন শুধু সময়ের বিবর্তনে তাদের বিকৃততা ভিন্নরূপ পাবে। এই একই চিত্র আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক সময়ের টেলিভিশন নাটকে। একটা সময় ছিল, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালা আমাদের জাতি গঠনে কি ভীষণ প্রভাবই না

সৃষ্টি করত। আমরা যারা অগতির গতি বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখে বড় হয়েছি, তাদের অনেক নৈতিক শিক্ষার-আশ্রয়স্থল ছিল ওই বুড়ো বোকা বাসকটা। এখন আর তা সম্ভব নয়। আমাদের হাতে নানা রকম অপশন। আমরা আমাদের অঙ্গুলিহেলনে খুব সহজেই প্রবেশ করতে পারি অসম্ভবের জগতে। তার পরও আমরা যারা নতুন কন্টেন্ট নির্মাণ করি অথবা যারা [টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ] কন্টেন্ট বাছাই করি, তাদের কি কোনো দায় নেই? কমেডি, স্যাটায়ার পৃথিবীব্যাপী একটি পরিচিত ও জনপ্রিয় ফর্ম। চার্লি চ্যাপলিনের চেয়ে বড় কমেডিয়ান তো আর পৃথিবীতে কখন জন্মায়নি। তার প্রতিটি কাজ দেখলে কি শুধুই হাসি পায়, নাকি মনের অজান্তে চোখের কোনায় জলও জমে? চেতনাবিহীন ভাড়ানো কোনো কাজের কথা নয়। তাতে যতই লাইক কিংবা ভিউ থাকুন না কেন?

ইদানীং লক্ষ্য করছি, আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রোফাইল পিকচারে ওই উন্মাদের [সিফাতউল্লাহ] ছবি এবং লেখা 'কী হিংসে হয়' যুক্ত করেছেন। মনে মনে নিজেকে বিরাট চালাক ব্যক্তি ঠাওরেছেন। তিনি কি সত্যিই চালাক, নাকি কোনো বোকার স্বর্গে তার বসবাস- তা ভেবে জেরবার। আমার কাছে ভিউ বা লাইক সত্যিই কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। আমার দেশের প্রথিতযশা কবি নির্মলেন্দু গুণ কিংবা লেখক শিক্ষক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ফলোয়ার সংখ্যা হয়তো শূন্য কিংবা খুব সামান্য। সে তুলনায় তথাকথিত খুল্লামখোলা অনেক মডেল/নায়িকার ফলোয়ার সংখ্যা অসংখ্য অজস্র। তার মানে কি ধরে নেব ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের চেয়ে সেই জনৈক মডেল সমাজের অধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব? নিশ্চয়ই নয়। সুতরাং ভিউ-লাইকই কিন্তু জীবনের শেষ কথা নয়। আমি এবার ঈদ অনুষ্ঠানমালায় অসংখ্য অসাধারণ টিভি নাটক দেখেছি। যার নেই লাখ লাখ ভিউ কিংবা ভুঁইফোঁড় অনলাইন পত্রিকার রেটিং। এখন সময়টাই এমন যে নিজের ঢোল নিজেকেই পেটাতে হয়। পেটাতে পেটাতে ফেটে গেলেও বাজাতে হবে। এই বাদ্য বাজানার ভিড়ে নিভৃতে অসংখ্য মাটিবর্তী মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। তারা অনুকরণ। অনুসরণ নয়, পেয়ে যায় তার নিজস্ব গান। া

লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com