আদর্শবাদী এক রাজনীতিক

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রক্তিমা চক্রবর্ত্তী

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মানুষ হিসেবে সমাজে তিনি মনুষ্যত্ব ও মহত্ত্বের যে নিদর্শন রেখে গেছেন, তা কখনোই ভোলার নয়।

নাটোরবাসীর ছায়া ও ভরসার জায়গা ছিলেন শংকর গোবিন্দ চৌধুরী, তার চার কন্যার বাবুজি। বয়স নির্বিশেষে অন্য প্রায় সবার 'শংকর কাকা'। তার পিতা বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট জ্ঞানদা গোবিন্দ চৌধুরী ছিলেন নাটোরের জমিদার। শিক্ষিত পরিবারে শংকর গোবিন্দ চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ৪ মার্চ। নাটোর ও বগুড়ায় পড়া শেষে কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ- সব ধরনের আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন সক্রিয়। রাজপথ থেকে সংসদ- সবখানে তার উপস্থিতি ছিল সরব। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আবার নিজে সাধারণ কর্মীর মতো কাজ করেছেন। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কোনো প্রলোভন বা হুমকি তাকে  গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তাকে এক বছর কারাবরণ করতে হয়।

বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ নম্বর সেক্টরের জোনাল কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্যও ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে নাটোরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি একাধিকবার ঐতিহ্যবাহী নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে নাটোর সদর আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আমৃত্যু ছিলেন নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। মনুষ্যত্ব, নীতি ও আদর্শের পথিক শংকর গোবিন্দ চৌধুরীকে কখনও কোনো ধরনের হুমকি বা প্রলোভন নত করতে পারেনি। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি নাটোর রানী ভবানী মহিলা কলেজের (পরে সরকারি কলেজ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ ছাড়া নাটোর বনলতা হাই স্কুল, বড়গাছা হাই স্কুল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী উচ্চ বিদ্যালয়সহ নাটোরের ডায়াবেটিক সেন্টার ও সুগার মিল তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্ব্বী প্রার্থীদের পোস্টারে ছেয়ে যায় দেয়ালের পর দেয়াল। তার পরও তিনি পোস্টার লাগাবেন না। তার কঠোর হুঁশিয়ারি- 'ছবি দিয়ে চেনাতে হবে শংকর গোবিন্দ চৌধুরীকে?' সাধারণত তৎকালীন সল্ফ্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের সদস্যরা জনগণের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব করতেন না। কিন্তু তিনি কখনও জাতি-ধর্ম-বর্ণকে মনুষ্যত্বের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। 'সবার উপরে মানুষ সত্য'- এ নীতিতে বিশ্বাসী তিনি ছিলেন। গোঁড়ামি বা সংকীর্ণতা  তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে ছিলেন সমান জনপ্রিয়।

১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাটোরে 'শংকর গোবিন্দ চৌধুরী আধুনিক স্টেডিয়াম'-এর উদ্বোধন করেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার শংকর গোবিন্দ চৌধুরীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত করে।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com