অনন্য মুক্তিসংগ্রামী, শিল্পোদ্যোক্তা

স্মরণ

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মোস্তফা হোসেইন

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের ডেপুটি সেক্রেটারি পর্যায়ের হাতেগোনা কয়েকজন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে বর্তমান বৃহত্তর পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরুল কাদের অন্যতম। তবে তার ভূমিকা শুধু সমর্থনে সীমিত ছিল না। সংঘটিতভাবে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিলেন ওখানে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত উদ্যোগে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনাকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছিল এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। ১৭টি খণ্ডযুদ্ধের অধিকাংশেই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হওয়ার কারণেই হয়তো এটা সম্ভব হয়েছিল। তার অবিস্মরণীয় কাজ ছিল মুক্ত পাবনায় বাংলাদেশের প্রশাসন চালু। 'বাংলাদেশ সরকার' (তখনও জানতেন না বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে গণপ্রজাতন্ত্রী নামে) লেখা রাবার স্ট্যাম্প দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার এবং স্কুল-কলেজ, পোস্ট অফিস-ব্যাংক-ট্রেজারি চালু করেছিলেন সেখানে। শুধু তাই নয়, মন্ত্রিপরিষদের আদলে সেখানে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদও গঠন করেছিলেন। স্থানীয় এমএনএ এবং এমপিএরা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের প্রধান।

২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা শুরু করলে সর্বত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। চলে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ। তার আগেই নুরুল কাদের প্রকাশ্যে পাবনায় সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। পাবনা শহর ও গ্রামের বিভিন্ন এলাকা হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে গেলে তিনি চলে যান মেহেরপুর। সেখানে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরের এসডিওসহ সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করেন। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয় বৈদ্যনাথতলায়। সেই অনুষ্ঠানেরও অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালন করেন ক্যাপ্টেন হাফিজসহ বাঙালি সেনা অফিসাররা। ১৭ এপ্রিলের আগেই তিনি আসহাবুল হক হেবা ডাক্তারসহ কয়েকজনকে নিয়ে ট্রেজারি ও ব্যাংকের অর্থ একত্রিত করেন, যা পরবর্তীকালে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত সরকারে হস্তান্তর করা হয়। এই অর্থ হাতে থাকায় মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ করা সহজ হয়।

বৈদ্যনাথতলায় সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠানের পর নুরুল কাদের চলে যান কলকাতা। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অন্যতম সহযোগী এবং সচিব হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথম অবস্থায় তাকে সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই পালন করতে হয়। কারণ একমাত্র তারই বড় ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছিল। পরে তাকে জেনারেল বিভাগের সচিব (সংস্থাপন) নিয়োগ করেন প্রধানমন্ত্রী। ততদিনে খন্দকার আসাদুজ্জামান, এইচটি ইমামসহ কয়েকজন অফিসার কলকাতায় পৌঁছে যান।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণের পর মুজিবনগর থেকে সরকার ঢাকায় স্থানান্তরেও তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ঢাকায় সচিবালয়ে একাত্তরে যেসব কর্মকর্তা কাজ করেছিলেন, তারা আত্মগোপন করেন কিংবা স্বেচ্ছায় কারাজীবন বেছে নেন। ওই অবস্থায় তিনি বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য পোষণকারীদের নিয়ে সচিবালয় চালু করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। সত্তরের দশকে দ্বিতীয় ঐতিহাসিক কাজের পথিকৃৎ হলেন তিনি- বাংলাদেশে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে গার্মেন্ট ব্যবসা চালু। আজ যে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের এবং ৫০ লাখ শ্রমিকের পোশাক শিল্প, তার ভিত তিনিই তৈরি করে দিয়েছেন।

নারী শ্রমিকদের প্রাধান্য দিয়ে টেক্সটাইল পল্লী করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সে জন্য জায়গাও নিয়েছিলেন। টেক্সটাইল পল্লীতে শ্রমিক পরিবারগুলোর প্রত্যেকেই হতো উৎপাদনের শক্তি। ঘরে ও কারখানায় দুই জায়গাতেই হতো কাজ। ব্যতিক্রমী ধারার এ কাজটি শুরু করার আগেই তিনি চিরবিদায় নেন। ১৯৯৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর লন্ডনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিসংগ্রামের অনন্য সৈনিক এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাতের পথিকৃৎ এ মহৎপ্রাণ মানুষটির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

সাংবাদিক, লেখক

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com