যত ফাঁদে ফাঁসছে মানুষ

ব্যবসায়িক অংশীদার চাকরি, পদোন্নতি বদলি ও লটারি জেতার নামে প্রতারকরা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

প্রতারণার ফাঁদে প্রতিনিয়ত ফেঁসে যাচ্ছে মানুষ। প্রতারকরা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কেউ ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে হচ্ছে ফতুর। কেউ আবার চাকরির জন্য উৎকোচ দিয়ে হচ্ছে সর্বস্বান্ত। লটারি জেতার নামেও কেউ খোয়াচ্ছে হাজার হাজার টাকা। এ ছাড়া বদলি, পদোন্নতিসহ নানা ফাঁদে ফেলে মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে প্রতারকের দল। প্রতারিত হওয়ার পর কেউ আইনের আশ্রয় না নেওয়ায় প্রতারকরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থান বদল করে ভিন্ন পরিচয়ে আবারও জড়িয়ে পড়ে প্রতারণায়। প্রতারিত লোকজন অভিযোগ না করায় পুলিশও তাদের বিরুদ্ধে নিতে পারে না কোনো ব্যবস্থা।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত লোভ ও প্রতারকদের প্ররোচনায় পড়ে প্রতারিত হয় মানুষ। প্রতিদিন কেউ না কেউ প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে আসে। কিন্তু তাদের মামলা করতে বললে করে না। কেউ আবার প্রতারিত হয়ে নিজের সম্মানহানি মনে করে। অনেকে চাকরি, পদোন্নতি কিংবা বদলির জন্য উৎকোচ দেয়। কোনো ডকুমেন্ট থাকে না এগুলোর। যে কারণে প্রতারকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। মানুষ সচেতন হলে এবং অবৈধ পন্থা এড়িয়ে চললে প্রতারিত হওয়া থেকে রেহাই পাবে।

অনুসন্ধানে উঠে আসা বিভিন্ন প্রতারণার চিত্র চট্টগ্রামের মধ্যম সারির এক গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর কাছে ব্যবসার প্রস্তাব নিয়ে আসে এক দল যুবক। ওই যুবকদের মধ্যে ছিল চীনের কিছু লোক। সবার হাতে দামি ফোন। কথাবার্তায় স্মার্ট। ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে চট্টগ্রামের তারকা হোটেল র‌্যাডিসন ব্লুতে কয়েক দফা বৈঠকও করে তার সঙ্গে। গাড়িতে চড়িয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসে প্রজেক্ট এলাকা। তাদের ওপর আস্থা রেখে ওই ব্যবসায়ী তুলে দেন এক কোটি টাকা। এর পর লাপাত্তা ওই যুবকের দল। পরে বুঝতে পেরেছেন তিনি প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন। কোনো ডকুমেন্ট না থাকায় আইনি ব্যবস্থাও নিতে পারেননি তিনি।

স্কুলছাত্র অনিক দাশের কাছে গত ১১ নভেম্বর দুপুর ১টায় একটি রবি নাম্বার থেকে ফোন আসে। এক ব্যক্তি বলে, রবি গ্রাহকদের মধ্যে করা একটি লটারিতে জিতেছে সে। তাদের দেওয়া একটি নম্বরে ১২০ টাকা রিচার্জ করলে ১৫ হাজার ৫৭০ টাকা পাবে সে। কথা বলার সময়েই এ টাকা রিচার্জ করতে বলে তারা। অনিক ১২০ টাকা রিচার্জ করলে তার মোবাইলে ১৫ হাজার ৫৭০ টাকার একটি এসএমএস আসে। এর পর আরেকটি নাম্বার থেকে ফোন করে বলা হয়, অনিক দ্বিতীয় রাউন্ড জিতেছে। এবার ২০৪০ টাকা বিকাশ করলেই এ টাকা পাবে সে। টাকা বিকাশ করার পর বলা হয় আরও ১২ হাজার টাকা বিকাশ করতে। তাহলেই পুরো টাকা পাবে সে। এভাবে কয়েক দফায় ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। এর পর মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয় তারা।

অনিক দাশ জানায়, প্রতারকরা কথা বলার সময় ফোনের লাইন কাটতে দেয় না। লাইনে রেখেই টাকা পাঠাতে বলে। যার কারণে কারও কাছ থেকে বিষয়টি জানারও সুযোগ ছিল না। টাকা পাঠানো এসএমএস ছিল ভুয়া। পরিচিত দোকানদারের কাছ থেকে বাকিতে বিকাশ করেছি। পরে যখন বুঝতে পেরেছি তখন আর কিছু করার ছিল না। বিকাশের দোকানদার যখন টাকার জন্য চাপাচাপি শুরু করে, তখন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছি। পরে মায়ের স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে বিকাশের টাকা শোধ করেছি।

চট্টগ্রামের বন্দর থানা এলাকার বাসিন্দা রবিউল আলম ও ঢাকার বাসাবো এলাকার বাসিন্দা মো. রাশেদুল ইসলাম। দুইজনের সঙ্গে পরিচয় হয় চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ার বলিরহাট এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম জোবায়েরের। চাকরিপ্রার্থী এই দুই যুবককে ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব দেয় ইব্রাহিম। বেকার দুই যুবক বিষয়টি লুফে নেয়। বিনিময়ে রবিউল আলমের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় ৯ লাখ টাকা এবং রাশেদের কাছ থেকে নেয় ৪ লাখ টাকা। তাদের হাতে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নিয়োগপত্রও তুলে দেয়। এই নিয়োগপত্র নিয়ে ব্যাংকে যোগদান করতে গিয়ে জানতে পারে নিয়োগপত্রটি ভুয়া। অভিযোগ প্রসঙ্গে ইব্রাহিম জোবায়েরের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বোরহান কবির ওরফে হুমায়ুন কবির নিজেকে পরিচয় দেয় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের ফুফাতো বোনের স্বামী হিসেবে। পেশা হিসেবে উল্লেখ করে সরকারি কলেজের অধ্যাপক। কর্মস্থল কখনও সিলেট এমসি কলেজ, কখনও রাজধানীর সরকারি বাঙলা কলেজ। এ পরিচয়ে ভাব জমিয়ে

তোলে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে। এর পর কাউকে বদলি আবার কাউকে মফস্বলের কলেজ থেকে শহরে এনে দেওয়ার কথা বলে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা। এসব শিক্ষক প্রতারণার শিকার হলেও সম্মানহানির ভয়ে অভিযোগ করেন না কোথাও। শুধু শিক্ষকদের সঙ্গে নয়; রয়েছে পুলিশের সঙ্গেও প্রতারণার অভিযোগ।

এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের গাড়িচালক মিন্টু নাথ বলেন, হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে পুলিশ লাইনের স্কুল ক্যান্টিনে আমার পরিচয়। নিজেকে মেয়রের চাচাতো বোনের স্বামী হিসেবে পরিচয় দেয়। কথা প্রসঙ্গে আমার স্ত্রীর প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার্থী হিসেবে জানতে পেরে বলে, মেয়রকে বলে তোমার স্ত্রীকে লিখিত পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেব। দু'দিন পর এসে জানায়, এ জন্য আড়াই লাখ টাকা দিতে হবে। গত ২৬ মে তার হাতে আড়াই লাখ টাকা দিই। ফলাফল ঘোষণার পর আমার স্ত্রী লিখিত পরীক্ষায় পাস করেনি দেখতে পেয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সে বলে, বিষয়টি নিয়ে মেয়রের সঙ্গে আলাপ করে দেখি। এর পর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ।

এ প্রসঙ্গে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, 'এ নামে কেউ আমার বোন জামাই নেই। প্রতারণার জন্য এ পরিচয় দিয়েছে। বিষয়টি আমিও শুনেছি। পুলিশকে বলেছি কেউ আমার নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে।'

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর রায়ছটা গ্রামের বাসিন্দা শাকেরুল আজম চৌধুরী সনেট। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেয় নিজেকে। পুলিশের কনস্টেবল ও এএসআইদের কাছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। পদোন্নতি করিয়ে দেওয়ার নামে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চান্দগাঁও থানা পুলিশের এক কনস্টেবল জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে পদোন্নতির জন্য চান্দগাঁও থানার বেশ ক'জন পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শাকেরুল আজম সনেট। প্রতারণার শিকার হয়েছেন জানতে পেরে তার কাছ থেকে টাকা ফেরত চাওয়ার পর থেকে সে লাপাত্তা। তার আর খোঁজ মিলছে না।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com