বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

হাসনাইন ইমতিয়াজ

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১০-১২ বছর আগেও খোদ রাজধানীতে রাত-দিনে অসংখ্যবার বিদ্যুৎ চলে যেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হতো অন্ধকারে। দুর্ভোগের অপর নাম ছিল লোডশেডিং। কিন্তু দিন পাল্টে গেছে। এখন প্রচণ্ড গরমের দিনেও আগের মতো বিদ্যুৎ যায় না। খুব বেশি হলে ঘণ্টাখানেকের বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেড করা হয়। তাও প্রতিদিন হয় না। এতেই বোঝা যায়, পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন কারওয়ান বাজারের বাসিন্দা খুরশিদ জাহান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিটি বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে অনেক খুশি।

শুধু খুরশিদ জাহান নন, পরিসংখ্যানও বলছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সাফল্য এসেছে গত ১০ বছরে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, গত নয় বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণের বেশি বেড়েছে। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াট। যদিও প্রতিদিন ব্যবহার করা হয় কমবেশি ১০ হাজার মেগাওয়াট। আরও নতুন নতুন কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। নতুন চুক্তি হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। আসছে বিদেশি বিনিয়োগ। চলতি মাসেই ষাট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ছয় হাজার মেগাওয়াটের দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে।

বর্তমান সরকারের টানা দুই মেয়াদের শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতে এই ব্যাপক সাফল্য এসেছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে বিদ্যুৎ দিতে চায়।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে। সে সময় বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। কিন্তু প্রতিদিন ব্যবহার করা যেত মাত্র তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় যা ছিল খুবই কম। ফলে গ্রাম-গঞ্জে দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকত না। ঢাকাতেও তিন-চার ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হতো না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাহত হতো শিল্প-কারখানার উৎপাদন। চারদিকে ছিল বিদ্যুতের জন্য হাহাকার।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সমস্যার সমাধানে তিন ধরনের উদ্যোগ নেয়। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। ব্যয়বহুল হলেও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বিধান পাস করা হয়। সরকারের এসব উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তে থাকে। ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলো অধিকাংশ তেলভিত্তিক। এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়। দাম বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ায় জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়নি। বিশেষ করে শিল্প খাতে বিদ্যুতের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের পুরোটা জনগণের ওপর না চাপিয়ে সরকার ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। একসময় গ্রামগঞ্জে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়।

এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় দেশে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের তিনটি বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী বছরই উৎপাদনে আসার কথা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলছে। দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় এ প্রকল্প নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে লক্ষাধিক কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার থেকে বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে এরই মধ্যে এক হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও জোর দিচ্ছে সরকার। ২০২১ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য পদ্ধতিতে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে ৫০ লাখ ঘর সোলার হোম সিস্টেমে বা সৌরবিদ্যুতে আলোকিত হচ্ছে। সৌরশক্তিতে চলছে সেচপাম্প। ৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটের বড় বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেও চুক্তি সই হয়েছে। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উইন্ড ম্যাপিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। উদ্যোগ রয়েছে বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বর্জ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সমঝোতা চুক্তি সই করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

প্রতিটি উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ২৭১টি উপজেলা পুরোপুরি বিদ্যুৎ সেবার আওতায় এসেছে। বাকিগুলো আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে বলে জানিয়েছে আরইবি।

দুর্গম চর ও দ্বীপগুলোতেও বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে সরকার। যেখানে গ্রিড বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে সোলার মিনি গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার লক্ষ্য নির্ধারণ করছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজেটে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে নয় গুণের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এ খাতে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ২৭ থেকে ১২১টিতে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল ২০০৯ সালে তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। বর্তমানে ১১ হাজার ৩০৬ মেগাওয়াট। গত নয় বছরে নতুন করে এক লাখ ৯৫ হাজার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রাহকসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দুই কোটি ৯৯ লাখে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর পরিমাণ ৪৭ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস ২০০৯-এর ১৬ দশমিক ৯ থেকে ১২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, উন্নয়নের পূর্বশর্তই হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে বিদ্যুৎ কার্যকরী অবদান রাখছে। তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে বিদ্যুৎ খাতে ৮২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এরই মধ্যে ২২ বিলিয়ন বিনিয়োগ হয়েছে। এ খাতে আরও গতি আনতে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া।

এ বিষয়ে বুয়েটের শিক্ষক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার সাফল্য দেখিয়েছে। এখন তাদের উচিত এর গুণগত মান উন্নয়নে নজর দেওয়া। গ্রাহককে সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ দিতে স্থায়ী ও বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত উৎপাদনে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।



© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com