রিহার্সেল

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

তাহসিন আহমেদ

'কানা বুঝেন, কানা? আমি হইলাম কানা। চোখে দেখতে পারি না। আপনি তো দেখেন।' হড়বড় করে বলে গেল রোদচশমা পরা মেয়েটি। মার্কেটে এসেছি একটা ছুরি কিনতে। চায়নিজ ছুরি। সবসময় পকেটে নিয়ে ঘুরব। কোনো ভারী পকেটওয়ালাকে দেখলেই বের করে বলব, 'যা আছে সব দিয়ে দে, নইলে পেট গালায় দেব।'

মার্কেটে ভিড়টা একটু বেশি। হঠাৎ করেই এই কানা মেয়েটার সঙ্গে ধাক্কা খেলাম।

'সমস্যা হ্যাঁ? মেয়ে দেখলেই ধাক্কা মারতে ইচ্ছে করে? ছোটলোক কোথাকার'- এতক্ষণে চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলেছে মেয়েটি। চোখ দুটো বেশ সুন্দর। রবিদার মতো করে বলা যেতেই পারে, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।

ততক্ষণে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে আমাদেরকে ঘিরে। মেয়েটির চোখ থেকে যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে আগুনের গোলা বের হচ্ছে। সুযোগ থাকলে এই আগুনে ভস্ম হতেও আপত্তি ছিল না। কিন্তু সুযোগ নেই। এই আগুনে পোড়া যায় না, বড়জোর অপমানিত হওয়া যায়।

ধাক্কা লাগার পর আমি আস্তে করে বলেছিলাম, 'সরি'। মেয়েটা কি সরির অর্থ জানে না? এবার আরও আস্তে বললাম, দুঃখিত। এই দুঃখিত জ্বলন্ত আগুনে পেট্রোলের মতো কাজ করল। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল সুন্দর চোখওয়ালা।

'কী ছেলেরে বাবা! আবার বলে সরি। আরে আপনি তো পুরুষ। যেখানে আপনার কোনো অপরাধ নেই, সেখানে আপনি সরি কেন বলেন? উল্টো অপবাদ দেওয়ায় আমাকে আপনি ধমক দেবেন। তা না...'

এই মেয়ের নিশ্চয় মাথায় সমস্যা আছে। পাওনা টাকা পাওয়া বন্ধুর সঙ্গে লোকে যেভাবে কথা বলে সে রকম বলা শুরু করেছে। নদীর স্রোতে ভেসে থাকা পল্গাস্টিকের বোতলের মতো সময়ে সময়ে স্থান বদলায়। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। মুরব্বির মতো এক লোক বিদ্যুৎগতিতে এসে আমার কলার ধরল। 'কী? ইভ টিজিং কইরা আবার পলাস? এক থাপ্পড়ে তোর তেরটা দাঁত ফালায় দেব।' মুরব্বির চোখেমুখে হিংস্রতা। আমি বললাম, 'বাকি উনিশটা কার জন্য রেখে দেবেন?'

মুরব্বির হাত থেকে কলারটা ছাড়িয়ে মার্কেটের ভেতরে ঢুকে গেলাম। চায়নিজ ধারাল চকচকে ছুরির দাম ৫০০ টাকা। ভাবা যায়? দামাদামি করে ৪২০ টাকা দিয়ে কিনে ফেললাম। ধারাল অংশ ঢেকে রাখার জন্য রাবারের কভারও লাগানো আছে। পকেটে রাখতেই গুণ্ডা গুণ্ডা একটা ভাব চলে এসেছে।

আমাকে যেহেতু 'যা আছে সব দিয়ে দে নইলে পেট গালায় দেব' ডায়ালগ দিতে হবে, তাই বারবার এটা রিহার্সেল করা প্রয়োজন। আমি রিহার্সেল করতে করতে মার্কেট থেকে বের হলাম। রোদচশমাওয়ালা মেয়েটা বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে একটা ধাক্কা মারল। বলল, 'শোধবোধ হয়ে গেছে। আপনি আমাকে মারছিলেন, আমি আপনাকে মারলাম। বাই দা ওয়ে, একটা কথা ছিল।'

আমি ছুরিটা বের করে বললাম, 'যা আছে সব দিয়ে দে, নইলে পেট গালায় দেব।'

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com