রুম পাঁচ সতিন (৫০৩) কে ওখানে?

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

স্নিগ্ধা আফসানা রোশনী

দীর্ঘদিন ছুটি কাটিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরলে যা হয়। বাড়ির পরিচিত বিছানা ছেড়ে নতুন রুমে নতুন বিছানায় ঘুম বাবাজি ধরা দেবে সহজে- এটা ভেবে ভুলই করেছিলাম! হলের বিছানাও যা আরামদায়ক! হাসপাতালের বিছানার মতো লোহার একফালি বিছানা! নিজেকে রোগী রোগী লাগে। তাতে নড়াচড়া করলে ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ শোনা যায়। খানিকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর আমি হাল ছেড়ে দিলাম। রুমের মধ্যে নাক ডাকার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। হালকা, মাঝারি আর ভারি নাক ডাকার শব্দ। আমার সতিনরা খুব আরামে ঘুমাচ্ছে। আমার ঘুম গেল কোথায়? ওদের আরামের ঘুম দেখে হিংসাও হলো। ইচ্ছা করছে ঘাড় ধরে সবকয়টাকে তুলে দিই। তা করলে আমার কপালে দুঃখ থাকতে পারে বলে বাদ দিলাম। শুয়ে শুয়ে কী আর করা, আমি মন দিয়ে ওদের নাক ডাকা শুনতে লাগলাম। একজন যেন আরেকজনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাক ডাকছে! সকালে এদের খবর করতে হবে। আপাতত কিছু করার নেই বিধায় আমি এটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে নিয়ে নিলাম।

বারান্দায় টিমটিম করে একটা লাইট জ্বলছে, হলের লাইটের অবস্থাও যেমন! ভুতুড়ে আলোয় বাইরেরটা খুব অদ্ভুত লাগছে। খানিকটা আমাদের রুমের ভেতরেও এসে পড়েছে। আলো-ছায়ার খেলা আর ওদের নাক ডাকা শুনতে শুনতে চোখ লেগে এসেছে প্রায়। বারান্দায় কিছু 'ধপ' করে পড়ার শব্দে লেগে থাকা ঘুম ধুয়ে-মুছে গেল।

রাত-বিরাতে যে কোনো শব্দ অনেক জোরে কানে লাগে, টুকটাক শব্দও অনেক বেশি মনে হয়। আর রাতে এমনিতেও অনেক শব্দ শোনা যায়। ওসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না। আমি পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ব ভাবছি। একটা ছায়া তখন ঠিক আমার সতিন টুম্পা-টু'র জানালার সামনে এসে দাঁড়াল!

নিজের স্নায়ুর ওপর আমার ভালো দখল আছে। তবুও বুকের মধ্যে হূৎপিণ্ডটা লাফ দিল বলেই মনে হলো। একটা লাফ দিয়ে শান্ত হলো না, আরও লাফালাফি শুরু করল যখন ছায়াটা এক পাশের জানালায় টুকটুক শব্দ করতে শুরু করে দিল!

বিছানায় উঠে বসলাম। আমার রুমমেটদের ঘুম দেখে গা জ্বলে গেল। এত কী ঘুম, হ্যাঁ? শব্দে কি ঘুম ভাঙবে না, নাকি? ছায়া ঠকঠক করেই যাচ্ছে জানালায়। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে ওটার প্রধান ইচ্ছা ঘরে ঢুকে পড়া! আমি চিৎকার করে রুমমেটদের ডাকব কি-না ভাবছি। চিৎকার করার চেষ্টা করে দেখলাম গলা দিয়ে ঘড়ঘড় আওয়াজ বের হচ্ছে।

কোনো মতে বিছানা থেকে নামলাম, টুম্পার বিছানার কাছে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে ওঠানোর চেষ্টা করতে হবে। কাজ হবে কি-না জানি না। এই মেয়ের যা ঘুম, আশপাশে একটা বোমা ফাটলে তবে তার ঘুম ভাঙলেও ভাঙতে পারে! এক ফাঁকে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি ছায়ামূর্তি গায়েব।

আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা খেলে গেল। এটা ভূত না তো? যদি অদৃশ্য হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে? এতক্ষণে ঢুকে পড়েছে নাকি? আয়াতুল কুরসি মনে করার চেষ্টা করলাম। দরকারের সময় ঠিকঠাক মনে পড়তে চায় না।

দোয়া-কালাম পড়ে মনে একটু সাহস এলো। বারান্দায় হাঁটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

এত রাতে কে হাঁটে! ওই ছায়ামূর্তিটাই হাঁটছে?

হাঁটার স্টাইল খুব বাজে। পা ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে হাঁটার শব্দ। যে হাঁটছে তার পায়ে একটা চটি টাইপ কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে। খুব বিরক্ত হলাম। মানুষ হোক আর ভূত হোক- জুতায় শব্দ করে হাঁটা খুব খারাপ অভ্যাস। এ কারণে স্টু্কলে কম কান টানা তো খাইনি! নিজের বাম কানটাকে ডান কানের থেকে সামান্য লম্বা লাগে আমার। শব্দ করে কেউ হাঁটলে আমার ইচ্ছা করে কান টেনে লম্বা করে দিতে।

যাই হোক, বিরক্তি কেটে গেল আমার। সেই জায়গা দখল করে নিল ভয়। ঘটনা অ্যানালাইসিস করে দেখা যাক। কারও হয়তো ঘুম আসছে না, সে সময় কাটাতে হাঁটতে বেরিয়েছে!

আচ্ছা ঠিক আছে, হাঁটতে বেরিয়েছে খুব ভালো কথা। আমাদের দরজা টাকাটাকির দরকার কী? সে কি একা বোধ করছে! আমি যখন কে কে বলে ডাকলাম তখন কি তার মুখে ব্যথা ছিল? সে কোনো উত্তর দিল না।

আমি বেশিক্ষণ পরিস্থিতি অ্যানালাইসিস করতে পারলাম না। ক্রমাগত হাঁটার শব্দ আমার মনোযোগ নষ্ট করে দিল। বারান্দার এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে! না, ভয়কে জয় করার সময় হয়েই এলো। দরজা খুলে দেখা যাক বরং!

আবারও আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে নিলাম। ভয়ের মহাওষুধ এটা। ভূত-প্রেত কাছে আসতে পারে না!

সাহস করে দরজাটা খুললাম। আমার বান্ধবীরা বেশ মন লাগিয়ে ঘুমাচ্ছে, ওদের ডেকে তুললে মার খাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তবে বেশি ভয় পেলে ভিন্ন কথা। এক চিৎকার দিয়ে সবাইকে উঠিয়ে দেওয়া যাবে!

দরজাটা খুলতে অন্য সময় তেমন শব্দ হয় না। আজ সামান্য ফাঁকা করতেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। কোনো এক চ্যানেলে একবার একটা ভূতের সিনেমা দেখেছিলাম। সেখানে ভূতটা যতবার ঘরে ঢুকত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হতো দরজায়। এখন ঘুরে ফিরে আমার সেই সিনেমার কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে।

মাথাটা সামান্য বের করে দেখার চেষ্টা করলাম, যা দেখলাম তাতে আমার অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা!

কেউ একজন সাদা গাউন টাইপের একটা পোশাক পরে (ভূত সাদা কাপড় কেন পরে সবসময়!) ছাদের দিকে হেঁটে গেল এবং অদৃশ্য হয়ে গেল।

মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার আগে আমি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম এবং এক লাফে মশারির মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

মুখের ওপর বৃষ্টি হচ্ছে, তাও আবার মুষলধারে, বৃষ্টি কেন শুধু মুখেই পড়ছে, শরীর ভিজছে না- এ রকম চিন্তা-ভাবনাও আমার মাথায় চলে এলো। অদ্ভুত একটা অনুভূতি নিয়ে আমি চোখ মেলে তাকালাম। ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছুক্ষণ আমি নিজের মাঝে থাকি না। ধাতস্থ হতে খানিক সময় লাগে। আর কেউ যদি ধাক্কাতে ধাক্কাতে ঘুম ভাঙায় তাহলে তো কথাই নেই।

মুখের ওপর বৃষ্টি হচ্ছে, সঙ্গে বজ্রপাতের ধাক্কা! আমি এক ঝটকায় উঠে বসলাম। কোথায় আছি কী করছি, কিছুই বুঝতে পারলাম না। এক দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাব কি-না চিন্তা করছি, এর মাঝে বীথির চিৎকার শুনতে পেলাম!

আমি ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালাম। ও বিনা কারণে এত রেগে আছে কেন- কিছুই বুঝতে পারছি না। রাগ করা যে শরীরের জন্য কত খারাপ, সেটা ওর জানা থাকা উচিত!

কিছু বলার আগে ও মোটামুটি ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর।

'তোকে যে গত এক ঘণ্টা ধরে ঘুম থেকে ওঠানোর চেষ্টা করছি, টের পাস না, নাকি? মরণ ঘুম দিয়েছিস? কৃম্ভকর্ণের খালাতো বোন একটা।'

এবার আমি রেগে গেলাম।

'ঘুম থেকে উঠিনাই খুব ভালো কথা, তাতে তোর কী? তুই কোন আক্কেলে আমার গায়ে পানি দিচ্ছিস শুনি?'

বীথির হাতে জেরিনের লাল পানির জগ।

ও তাড়াতাড়ি সেটা পেছনে লুকানোর চেষ্টা করল। লাভ কী তাতে? আমি যা দেখার দেখে ফেলেছি!

'আরে পানি ঢালার আইডিয়া টুম্পার, আমি শুধু...'

টুম্পার দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। বেশিরভাগ সময়ই হয় না।

টুম্পা দ্বিগুণ ক্ষেপে গেল, 'বলি মহারানী আপনি ঘুমাতে চান ঘুমাবেন, কিন্তু আপনার ক্লাস কি আমি করে দিয়ে আসব?'

খুলে রাখা কৌটার মুড়ির মতো মিইয়ে গেলাম। ঠিকই তো, আমার ক্লাস তো আর ওরা করে দেবে না!

বাকি ছিল জেরিন, সে হাসতে হাসতে বলল, 'ভেজা কাপড় পাল্টান আফা, আপনার যে ঠাণ্ডা লাগে সেটাও আপনাকে আমাদের মনে করিয়ে দিতে হয়।'

দাঁতে ব্রাশ ঘষতে ঘষতে বাথরুমে হাজির হলাম। যেহেতু আমি দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি, বাকিদের বাথরুম পর্ব এর মাঝে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। যা ভেবেছি তাই, বেসিনের সামনে শুধু স্বর্ণাকে দেখা যাচ্ছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের চেহারা দেখছে!

আমি হাসলাম ওকে দেখে, ও হাসি ফিরিয়ে দিল না।

কপাল কুঁচকে বলল, 'তোরা সব একেকটা কুম্ভকর্ণের খালাতো বোন!'

একটু আগে রুমের মধ্যে খানিকক্ষণ ওদের সঙ্গে এ কথা শুনে এসেছি, আবার!

চোখ পাকিয়ে বললাম, 'হয়েছেটা কী?'

"কাল রাতে ঘুম আসছিল না বলে হাঁটাহাঁটি করলাম, একা একা ভালো লাগে না। কতক্ষণ তোদের দরজা ধাক্কা দিলাম। কী ঘুম রে বাবা, কেউ ওঠে না। 'ঘোড়া বেইচা' ঘুমিয়েছিস নাকি?"

আমি হাঁ হয়ে গেলাম। দোয়া-কালাম পড়তে পড়তে আমার অবস্থা খারাপ, রাতে ঘুমাতে পারিনি, সকালে পানিতে ভিজেছি। এখন শুনি কুম্ভকর্ণ? ক্ষীণ গলায় বললাম,

'তুই কাল সাদা জামা পরেছিলি নাকি?'

'হ্যাঁ, কেন, রাতে যে তোদের রুম থেকে ঘুরে এলাম। তুই বললি আমার সাদা গাউনের মতো তুই বানাবি। ভুলে গেলি! বলি মন থাকে কোথায়, হ্যাঁ?'

রাগে আমার গা জ্বলে গেল। আমি ভয়ে অস্থির আর ইনি গল্প করার জন্য রাত ৩টায় দরজা ধাক্কিয়েছেন!

ওকে ঘটনাটা বললাম এবং কী ভুল করলাম তা বলার পর বুঝলাম। এর থেকে একটা মাইক ভাড়া করে বললেও খারাপ হতো না!

দাঁত মাজতে মাজতে টের পেলাম স্বর্ণা বারান্দা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। একটু পরই হাসির শব্দ পেলাম। অনেক মেয়ে একসঙ্গে হেসে উঠলে কী একটা কাণ্ড হয় তা বলার মতো না।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com