আফসু ভাই যখন গরুর হাটে

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ওহাব ওহী

আফসু ভাই বরাবরই ভীতু মানুষ। গরু-ছাগল, ভেড়া-মহিষ থেকে তেলাপোকাকে পর্যন্ত তার ভয়। ক'দিন পরই কোরাবানির ঈদ। এসব কারণেই আফসু ভাইয়ের বউ মর্জিনা ভাবি তার সারা বছরের সঞ্চিত ব্যাংকটুপাটি ভেঙে ফেললেন। সঞ্চিত ৫০ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে আফসু ভাইকে বললেন- যাও, হাটে যাও। কোরবানির জন্য গরু কিনে নিয়ে আসো; সময় কম। দেরি না করে পরের দিনই আমরা আফসু ভাইকে নিয়ে গরুর হাটে রওনা দিলাম। হাটে পৌঁছে গেটের কাছাকাছি আসতেই আফসু ভাই গেটের উপরমুখী হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। পরে উচ্চস্বরে ডিজিটাল প্রিন্টে বড় বড় লেখা পড়তে লাগলেন, হাট! ... হাট!! ... হাট!!! বিরাট গরু-ছাগলের হাট! গরু-ছাগল কিনুন! হাসিল দিয়ে কোরবানি হালাল করুন। লেখাগুলো পড়ে আফসু ভাই কিঞ্চিৎ চিন্তায় পড়ে গেলেন। এটা কেমন কথা! বিরাট গরু-ছাগলের হাট! তার মানে, এই হাটে বড় বড় গরু-ছাগল পাওয়া যায়! কথাটি তো হওয়া উচিত- গরু-ছাগলের বিরাট হাট! অর্থাৎ এই বড় হাটে আপনার পছন্দসই গরু-ছাগল কিনতে পারবেন! আমি আফসু ভাইকে জোরছে একখান ধাক্কা দিয়ে তার সংবিৎ ফিরিয়ে আনলাম। এই আফসু ভাই, কী হলো? ভেতরে চলেন, গরু কিনবেন না? এদিকে হাটের ভেতর প্রবেশ করে আফসু ভাই বড় বড় গরু দেখে টাস্কি খান! নিজের পকেটের ওজন না করেই আকাশকুসুম কল্পনায় একটার পর একটার দাম জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এবার আকার, ওজন ও আয়তন ভেদে প্রতিটি বিশাল বিশাল গরুর বিশেষ বিশেষ আকর্ষণীয় নাম রাখা হয়েছে! কম্পোজ করে সেই নামগুলো আবার প্রতিটি গরুর শরীরে সেঁটে দেওয়া আছে। প্রথমেই আফসু ভাইয়ের চোখে পড়ল ময়ূরী নামক একটি বিশালদেহী গরুর ওপর। আহ, কী মোটাসোটা, নাদুস-নুদুস বডি রে বাবা! গেরস্ত দাম হাঁকলেন পাঁচ লাখ টাকা! আফসু ভাই এদিক-সেদিক সময়জ্ঞান না করেই তৎক্ষণাৎ বলে ফেললেন- মিয়া ভাই, গরুটি কি ৫০ হাজার ট্যাকায় দেওন যায়? গেরস্ত ত্বরিত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন- ওই মিয়া, গরু কিনতে আইছেন; না ফাইজলামি করতে আইছেন! এই টাকা দিয়া তো এইরুম গরুর একটা শিংও কিনতে পারবেন না। যান, ভাগেন! কিন্তু আমাদের আফসু ভাই দমবার পাত্র নন! নেই তেমন লাজ-শরমও! চটজলদি তিনি আবার বলে চললেন- তাইলে ভাই আমারে একটা শিং-ই না হয় দেন; তয় অবশ্যই বাঁ পাশেরটা দিবেন! সেটি অনেক বাঁকানো এবং বেশ বড়! আমি এমন অবাঞ্ছিত কথায় সমূহ সাংঘর্ষিক অবস্থা কল্পনা করে আফসু ভাইকে সেখান থেকে দ্রুত সরিয়ে নিলাম। একটু সামনে এগোতেই দেখি আরেক রূপসী শাবনূরকে! গলায় বাহারি চুমকির মালায় ডাগর ডাগর কাজল চোখে তার রূপমাধুর্য অতুলনীয়! সারা শরীর টকটকে লাল লোমে আবৃত! কতক্ষণ পরপরই মালিক তাকে ব্রাশ দিয়ে আঁচড়ে দিচ্ছেন! দলে দলে লোক এসে শাবনূরকে দেখছে। ব্যাপারি দাম হাঁকিয়েছেন চার লাখ টাকা। দাম শুনে আমি আফসু ভাইকে নায়িকাদের সিরিয়াল থেকে হেঁচকা টানে নিয়ে গেলাম। ঢুকলাম গোলগাল, নাদুস-নুদুস ভিলেন টাইপ মার্কা গরুর গলিতে। কিন্তু প্রবেশমুখেই ঘটল আরেক বিপত্তি। চলতি পথে আফসু ভাই মিশা সওদাগর টাইপের একটি বদমেজাজি দেশি ষাঁড়ের পশ্চাৎদেশে থাপ্পড় মারতেই সেটি উগ্র হয়ে উঠল। বড় বড় চোখে সঙ্গে সঙ্গে সেটি ব্যাক গিয়ারে লাথি মেরে আফসু ভাইকে পাঁচ হাত দূরে গোবর-চনার ওপর ফেলে দিল, যা অনেকটা নিউটনের সেই তৃতীয় সূত্রের মতো- প্রত্যেক ক্রিয়ার একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে, টাইপ!

পরে আমরা সবাই আহত আফসু ভাইকে চ্যাংদোলা করে হাটের কাছাকাছি বিখ্যাত রাজু ফার্মেসিতে নিয়ে গেলাম। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পুরো পায়ে বরফ-ব্যান্ডেজ মেরে তার বউয়ের গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়ে এলাম। তবে আফসোস! আফসু ভাইয়ের এবারের কোরবানিতে গরুটিকেনা হয়ে ওঠেনি!
 
সাভার, ঢাকা।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com