সাহিত্য ও সংস্কৃতি

বাংলার প্রাণের উৎসব

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

দীপন নন্দী

নতুন এক ভোর; যা প্রাণিত করছে বাঙালিকে। মনে করিয়ে দিচ্ছে ফেলে আসা শিকড়ের কথা। যে সকাল খুঁজে নিচ্ছে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। অন্য দিনের সূর্যোদয়ের চেয়ে বছরের প্রথম দিনে জেগে ওঠা সূর্যের ভিন্নতা রয়েছে। পহেলা বৈশাখ অন্য দশটা দিনের চেয়ে আলাদা কীভাবে, তা বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান- 'সেই তো একইভাবে সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়, দিনের আলো নিভে যায়, ঘনায় আঁধার। তারপরের দিন বা আগের দিনের থেকে পহেলা বৈশাখ তবু আলাদা। কেননা, পহেলা বৈশাখকে আমরা ভালোবাসার চোখে দেখি এবং এই দেখার একটা তাৎপর্য রয়েছে।'

পঞ্জিকার পাতা বদলে আজ শনিবার সেই পহেলা বৈশাখের দিন। আবহমান বাংলার গ্রামীণ উৎসব এখন ছুঁয়েছে নগর জীবনও। সর্বত্র উদযাপিত হচ্ছে বাংলার উৎসব, উচ্চারিত হচ্ছে

বাঙালিয়ানার জয়গান; যে গানের সুরে আপন শক্তিতে জেগে ওঠার শুভক্ষণ আজ। গ্রামীণ জীবনকে আলিঙ্গন করে উঠে আসা উৎসবের আশ্রয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে রুখে দেওয়ার শপথ ঘোষিত হয় এই দিনে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আমরা কায়মনে বাঙালি হওয়ার প্রার্থনা জানাই।

সংস্কৃতি জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, ছায়ানট সভাপতি অধ্যাপক ড. সন্‌জীদা খাতুন বললেন, 'দেশের অধিকাংশ মানুষই বাঙালিত্ব কাকে বলে জানে না। সে কারণেই গালে পতাকা, একতারা এঁকে বাঙালি হওয়ার চেষ্টা করে। মূল বিষয়টি অনুধাবনের চেয়ে সেখানে হৈ-হুল্লোড়টাই মুখ্য হয়ে ওঠে। মনের সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ হলে মানুষ বদলে যায়। আমরা সেই বদলানোর চেষ্টাই করেছি। তবে পুরোটা সফল হতে পারিনি। তারপরও আমরা আশাবাদী। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। মানবিক উৎকর্ষ সাধনে নিরন্তর কাজ করতে হবে।'

সন্‌জীদা খাতুন বলছিলেন নিরন্তর কাজ করার কথা। আনিসুজ্জামান পরামর্শ দিলেন বঙ্গাব্দকে নিয়মিত ব্যবহারের। তিনি বলেন, 'আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার নেই বললেই চলে। হঠাৎ করে কাউকে বাংলা তারিখ জিজ্ঞেস করলে প্রায়ই ঠিক জবাব আসে না। যদি বাংলা মাসের হিসাবে আমরা মাস-মাইনে পেতাম, আদালতে আমাদের ডাক পড়ত, বিদ্যুৎ-গ্যাস-টেলিফোনের বিল দিতে হতো, তাহলে বাংলা তারিখ আমাদের ঠিকই মনে থাকত। তবু যে বছরের প্রথম দিনে আমরা অনুষ্ঠান করে, আড়ম্বর করে তাকে আবাহন করি, তাও মিথ্যে নয়। আমাদের যে একটা নিজস্ব বর্ষপঞ্জি আছে, আমরা যে সকল ক্ষেত্রে পরনির্ভর নই, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে চাই, অন্যকে জানাতে চাই। তাই এমন আয়োজন।'

এত কথা যে পহেলা বৈশাখ নিয়ে তার উৎপত্তি কোথা থেকে। এ প্রশ্নের জবাব মিলে ইতিহাসের পাতায়। যেখানে বলা হয়েছে, বৈদিক যুগে বাংলা সনের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খান সর্বপ্রথম বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় খাজনা আদায় শুরু করেন। এ বিষয়ে লোকগবেষক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান নিজস্ব অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে জানান, সম্ভবত সতেরো শতাব্দীতে মুর্শিদকুলি খান সে সময়ের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস নির্ধারণ করেন। তিনি বলেন, 'একটা সময় বর্ষবরণ গ্রাম বাংলার উৎসব ছিল, শহরে বিচ্ছিন্নভাবে হতো। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ঢাকায় বর্ষবরণ উৎসব হতো, তবে সেটা ব্যাপক ভিত্তিতে ছিল না। পাকিস্তান হওয়ার পর বাঙালি মুসলমানরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় নববর্ষ পালন শুরু করে।'

বর্তমানে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে মুখ্য হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, যা প্রবর্তনের কৃতিত্ব পুরোটুকুই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি শান্তিনিকেতনে প্রথম ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলার প্রান্ত থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে বর্ষবরণের আয়োজন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল, এই চেষ্টা প্রতিরোধেরও অংশ হয়ে গিয়েছিল বর্ষবরণের আয়োজন। এ বিষয়ে শামসুজ্জামান খান বলেন, 'রবীন্দ্রবিরোধিতা রবীন্দ্রনাথের প্রতি আমাদের প্রেম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের প্রভাতি আয়োজনে বড় একটা অংশজুড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের গান এবং এখনও তা আছে। বর্ষবরণের এই আয়োজনের সঙ্গে স্বৈরাচারী এরশাদের সময় প্রতিবাদী মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করতে শুরু করেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষকরা। সব মিলিয়ে এখন ঢাকায় যেভাবে বর্ষবরণ হয়, কলকাতাতেও হয় না। এমনকি আমাদের দেশের জেলা-উপজেলাতেও বর্ষবরণের সার্বজনীন আয়োজন ছড়িয়ে গেছে সবখানে।'

কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান যুক্ত করলেন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটটিও। তিনি বলেন, 'বর্ষবরণের আয়োজন শহুরে নয়, এটা গ্রামীণ। মূলত মুক্তিযুদ্ধের পর এ উৎসব শহরের মধ্যবিত্তদের কাছে অবশ্যপালনীয় হয়ে ওঠে। যার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংশ্নিষ্টতা রয়েছে। কারণ, এখানে মেলার বিষয়টি সম্পৃক্ত; যা থেকে অর্থ আয় হয়। বর্তমানে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন পোশাক কেনা, উপহারের আদান-প্রদান। এগুলো মন্দ নয়। কারণ, এতে উৎসবের প্রাণময়তা বৃদ্ধি পায়।' তবে এতকিছু করতে গিয়ে নববর্ষের আবেগকে পেছনে না ফেলারও পরামর্শ দেন তিনি।

গ্রামবাংলার বর্ষবরণের সঙ্গে শহুরে বর্ষবরণের বেশ অমিল রয়েছে বলে জানান ইতিহাসবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বৈশাখের মেলায় যেতাম। নানাবাড়ির মেলায় হরেক রকমের জিনিস কিনতে পারা তার অন্যতম একটি আর্কষণ ছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালে ঢাকায় এসে নাগরিক জীবনে পহেলা বৈশাখের ভিন্ন অভিজ্ঞতা পাই। নগরে পহেলা বৈশাখ শুধু বাঙালিত্বকে উদ্‌যাপনের নয়, এর মধ্যে একটি দ্রোহী চেতনা কাজ করে।'

সংস্কৃতিজনদের মন্তব্যের রেশ ধরে বলা যায়, ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনের মধ্য দিয়ে শহুরে জীবনে বর্ষবরণ ব্যাপকতা লাভ করে, যা আজ অর্ধশতাব্দী পেরিয়েছে। কিন্তু এ পথচলা এত সহজ ছিল না। ২০০১ সালে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বোমায় রক্তাক্ত হয়েছে। তবে আয়োজন থেমে থাকেনি, উৎসবপ্রিয় বাঙালি এর পর থেকে বর্ষবরণে আরও বেশি অংশ নিতে শুরু করে।

আনিসুজ্জামান বলেন, 'রমনা বটমূলে বোমা হামলার পর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা কি আগামী বছরে এখানে আবার আসবে? নিঃসংকোচে তারা জবাব দিয়েছিল, আমরা আবার আসব। এরপর প্রতিবছরই নিরাপত্তার বেষ্টনী পেরিয়ে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। আপন সংস্কৃতির আলোয় লড়াই করে যাওয়া বাংলাদেশের এটাই শক্তি।'

ভয়াল সেই দিনের কথা স্মরণ করে সন্‌জীদা খাতুন বলেন, 'বোমা হামলার সময় আমরা বুঝেছিলাম, শুধু গান গেয়ে কিছু হয় না। এর সঙ্গে শিক্ষার প্রয়োজন আছে। আমাদের দেশটা শিক্ষাবঞ্চিত। তাই বলে সবসময় রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকলে ব্যর্থ হবো। শুধু শহরে বসে সংস্কৃতিচর্চা করলে হবে না। যেতে হবে গ্রামের মানুষের কাছে। মুক্তিযুদ্ধের কথাবার্তা, ইতিহাস, মানবতার ব্যাপার, ধর্মের নামে যে অন্যায় হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।'

রমনায় বোমা হামলা করেও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। কিন্তু এখনও তারা পহেলা বৈশাখকে বিজাতীয় সংস্কৃতিচর্চা বলে অপপ্রচার করে চলেছে। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী এক বিবৃতিতে পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে 'ইমান-আকিদাবিরোধী হিন্দুয়ানী শিরকি অপসংস্কৃতি' দাবি করে তা বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানান।

তবে ধর্মের সঙ্গে বর্ষবরণের মতো সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক নয় বলে জানিয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, 'সত্যিকার অর্থে ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির কোনো বিরোধ নেই। প্রতিটি ধর্মের মূল কথা হলো সুন্দরভাবে বাঁচা, সংস্কৃতি তো সেই কথাই বলে। সংস্কৃতি সুন্দরের সঙ্গে জীবনের সংযোগ ঘটায়। নববর্ষবরণ উৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা সেই বার্তাই প্রতিবছর দিয়ে আসছি।'

পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার মনে করেন শামসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, 'গ্রামবাংলায় জারি-সারি গান এখন মৌলবাদীরা বন্ধ করে দিয়েছে। এ মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি পহেলা বৈশাখ। শুধু পহেলা বৈশাখ নয় নবান্ন উৎসব, বসন্ত উৎসব, পৌষ উৎসবের মতো অসাম্প্রদায়িক উৎসব গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে দিতে হবে।'

চিত্রশিল্পী আবদুস শাকুর শাহ আবহমান বাংলার লোকজ বিষয়াদি নিজের চিত্রকর্মে তুলে ধরছেন। তিনি বলেন, 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরায় এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিকড়ের কাছে ফিরতে হবে। তা না হলে আমাদের সংস্কৃতির যে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ রয়েছে- তা বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে।'

কোটি টাকায় কেনা দীর্ঘশ্বাস

কোটি টাকায় কেনা দীর্ঘশ্বাস

ধানমণ্ডিতে সুপরিসর একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ী আহাদুল ইসলাম। ...

বিএনপির জনসভায় আমন্ত্রণ পাচ্ছে না জামায়াত

বিএনপির জনসভায় আমন্ত্রণ পাচ্ছে না জামায়াত

বিএনপির বৃহস্পতিবারের সম্ভাব্য জনসভায় ২০ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামীকে কৌশলগত ...

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক সেবন

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের ক্রুর মাদক সেবন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্লাইটের এক কেবিন ক্রুর মাদক সেবন ও ...

দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে অপতৎপরতা ...

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল দাবি সাংবাদিক নেতাদের

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল দাবি সাংবাদিক নেতাদের

স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে- এমন সব ধারা-উপধারা বহাল ...

ইয়াবা কারবারিরা তবু বেপরোয়া

ইয়াবা কারবারিরা তবু বেপরোয়া

মিয়ানমার থেকে নানা কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করে সারা ...

বিপিএলের কারণে রশিদকে চেনা ইমরুলের

বিপিএলের কারণে রশিদকে চেনা ইমরুলের

হুট করেই ইমরুল কায়েস এশিয়া কাপের দলে ডাক পান। এরপর ...

মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ!

মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ!

বরিশালে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ...