ইয়াসিনের দেশে, পুতিনের রাজ্যে...

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০১৮     আপডেট: ১৩ জুন ২০১৮      

সিয়াম আনোয়ার

ছবি: সংগৃহীত

১. আমাদের প্রথম দর্শন, প্রথম পরিচয় আর প্রথম অবগাহনের যা কিছু, তার বেশ খানিকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে পাওয়া। রাশিয়া-দর্শনও।

কথাটিতে খটকা লাগতে পারে কারও কারও। ধেয়ে আসতে পারে প্রশও- বাকি সব অতীত বাদ দিলেও অন্তত ১৯১৭ সালের বলশেভিক আন্দোলনের ঢেউয়ের কালেই তো আমরা রাশিয়াকে চিনে ফেলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ আবার চেনালেন কখন? গেলেনই তো তিনি অক্টোবর বিপ্লবেরও ১৩ বছর বাদে, ১৯৩০ সালে।

কথা সত্য। কিন্তু খবরের কাগজ আর রাজনৈতিক পাইপের মাধ্যমে জানা, আর নিজেদের দৃষ্টিতে দেখার আলাদা ফারাক তো আছেই। তাই, বলশেভিক আন্দোলনের মাধ্যমে যে রাশিয়ার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে, সে রাশিয়াকে আমরা আমাদেরই একজনের চোখ হয়ে প্রখর আলোয় আবিস্কার করি ১৯৩১-এ- 'রাশিয়ার চিঠি'তে। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে রাশিয়ায় গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যা দেখেছেন, তা আমাদের দেখাতে গিয়ে বলেছেন- 'রাশিয়ায় এসেছি, না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।'

২. বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শুরুতে রবীন্দ্রনাথ যে দেশকে 'তীর্থস্থানে'র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আর নেই। ১৯৯১ সালে ভেঙে ভেঙে পনের টুকরো হয়ে গেছে। তারপরও সোভিয়েতের ছায়া হয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে দাড়িয়ে আছে রাশিয়া নামের যে দেশ; সেই দেশটি এবার পসরা সাজিয়ে বসেছে 'বিশ্বের তীর্থ' হবে বলে। সাম্প্রতিক সময়ের লন্ডনে রাসায়নিক হামলার ঘটনায় ইউরোপের সঙ্গে টানাপড়েন, ক্রিমিয়া ইস্যুতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর সিরীয় পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রভাবশালী দেশের বিপরীতে অবস্থান মিলিয়ে রাশিয়ার গত ক'টা বছর কাটছে অস্বস্তির হাওয়ায়। সেই অস্বস্তির হাওয়া ঝেটিয়ে দিয়ে স্বস্তি ফেরাতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পতন-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দাপটের জানান দিতে, আগামীর বিশ্বে নিজেদের মর্যাদার গ্রাফটা আরেকটু ওপরে পোক্ত করতে- রাশিয়ার জন্য খুব দরকার ছিল ইতিবাচক বৈশ্বিক মনোযোগের। তারই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে এবারের ফিফা বিশ্বকাপকে তাক করে নিয়েছে ভদ্মাদিমির পুতিনের রাশিয়া।

কখনও রাষ্ট্রপতি, কখনও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় বিগত দেড় যুগ ধরে রাশিয়ার কর্তার ভূমিকায় থাকা পুতিনের প্রধান লক্ষ্যই এখন বিশ্বকাপের মাধ্যমে সারা বিশ্বে নিজেদের পুনর্জন্মের চেহারা দেখানো; সোভিয়েত পতনের পরও যে দ্বি-মেরুর বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় রাশিয়ার প্রতাপ আছে আগের মতোই- সেই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করানো। বিশ্বকাপ ঘিরে নেওয়া সব বড় প্রকল্প আর অনুষ্ঠানই তাই নিজেই তদারক করেছেন পুতিন। বর্তমান ও আগামীর রাশিয়ার বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে, আর বিশ্বকাপ থেকে এর কত ধরনের প্রভাব আদায় করা যায়- এ নিয়ে ২০১০ সালে বিডিং পাওয়ার সময় থেকেই চলেছে একাধিক গবেষণা, এখনো চলছে নানামুখী উদ্যোগ। 

কিন্তু নিজেদের পুনর্জন্মের চেহারা দেখাতে বিভোর রাশিয়ার বাইরে আরেক রাশিয়াও তো আছে। রাশিয়া তো কেবল 'সোভিয়েত-ছায়া'র বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম ক্রীড়ানক নয়, রাশিয়া তো লেভ ইয়াসিনেরও দেশ।

লেভ ইয়াসিন!

এ একটি নামের জন্য বিশ্ব ফুটবলের কেউকেটা না হওয়ার পরও এর ইতিহাসে আলাদা করে উচ্চারিত হয় রাশিয়ার নাম। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো পোশাক মুড়িয়ে নামতেন বলে ডাকা হতো তাকে 'ব্ল্যাক স্পাইডার' নামে। সর্বকালের সেরা গোলরক্ষকের মর্যাদা পাওয়া এই কিংবদন্তির জন্ম-মৃত্যু (১৮২৯-১৯৯০) দুটিই প্রতাপশালী সোভিয়েত ইউনিয়নে। যে বছর পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে মহাকাশ জয় করল সোভিয়েত, তার আগের বছর লেভ ইয়াসিনের দল অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণ জিতে আভাষ দিয়েছিল ভূ-গ্রহ জয়ের।

 সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ জয়যাত্রা হয়তো প্রত্যাশিত রূপ পায়নি। কিন্ত দল হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বজয় করতে না পারলেও তিনি পেরেছিলেন। দল ছাপিয়ে বিশ্বব্যাপী আপন আলোয় ভাস্বর হয়ে উঠেছেন সাধারণ এক শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া ইয়াসিন। এই একবিংশ শতাব্দির প্রায় সিকি অংশ চলে যাওয়ার এই সময় পর্যন্ত একমাত্র গোলরক্ষক তিনি, যার হাতে উঠেছে বর্ষসেরা ফুটবলারের ব্যালন ডি অর পুরস্কার।

যে মস্কোর ক্রেমলিন প্রাসাদ এখনকার রাশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু; সেই মস্কোর আলো-মাটি-বাতাসে তার বেড়ে ওঠা। উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাশিয়ার গৌরবান্বিত ইতিহাস যেটুকু, তার অনেকটা জুড়ে আছেন এ ইয়াসিনই। ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়েও রাশিয়াও তাই পোস্টারবয় করেছে ১৯৬৭ সালে সোভিয়েতের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় পুরস্কার 'অর্ডার অব লেনিনে'র স্বীকৃতি পাওয়া এই ফুটবলারকে।

'ফরোয়ার্ড পপুলারিজম'র ফুটবলে কীর্তি, মাহাত্ম্য, খ্যাতি, অর্থ- সবকিছুর ভাগ দেওয়া হয় মিডফিল্ডার-স্ট্রাইকারদের। কিন্তু সম্মুখযুদ্ধে যে কেবল তলোয়ার থাকে না, ঢালও থাকে, আক্রমণের মতো আত্মরক্ষাও যে জয়ের কৌশল, তার প্রয়োগটা খুব করে দেখিয়েছেন ওই একজন ইয়াসিনই। নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেখার পর 'রাশিয়ার চিঠি'তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'এখানে এরা যা কাণ্ড করছে তার ভালো-মন্দ বিচার করবার পূর্বে সর্বপ্রথমেই মনে হয়, কী অসম্ভব সাহস। সনাতন বলে পদার্থটা মানুষের অস্থিমজ্জায় মনেপ্রাণে হাজারখানা হয়ে আঁকড়ে আছে, ...... এরা তাকে একেবারে জটে ধরে টান মেরেছে।' ইয়াসিনও তেমনি তার জন্মভূমির মতোই 'জটে ধরে টান' মেরেছিলেন ফুটবলের সনাতনী ভাবনাকে।

ইয়াসিনের জন্ম, বেড়ে ওঠা, কীর্তি- সবাই আসলে নাড়িয়ে দেওয়ার। শৈশব পেরোনোর পরপরই পড়েন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খপ্পরে। যুদ্ধে সহায়তার জন্য ১২ বছর বয়সী ইয়াসিনকে জোরপূর্বক কাজ দেওয়া হয় সামরিক কারখানায়। এই কারখানা জীবনের আবদ্ধ যাপনই তাকে নিয়ে যায় খোলা আকাশের উন্মুক্ত মাঠে। ফাঁক পেলেই ছুটে চলে যেতেন মাঠে-ময়দানে। 

এভাবেই একসময় তৎকালীন সোভিয়েত গোলরক্ষক অ্যালেপি টাইগার খোমিচের দৃষ্টিতে পড়া, আর সেই সূত্রে ১৯৫০-এ ডায়নামো মস্কোয় সুযোগ পেয়ে যাওয়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতীয় দলে খেলার সুযোগ মেলে তারও চার বছর পর। তার পরের ১৭ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে কেবল একটার পর একটা সিঁড়ি ভেঙেছেন, উঠেছেন এমন উচ্চতায়, যেখানে কেবল তারই সিংহাসন। বিশ্বকাপ খেলেছেন চারটি। এর মধ্যে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে তার হাতে-পায়ে ভর করে সোভিয়েত ইউনিয়ন উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। 'হাতে-পায়ে' বলার কারণ, ইয়াসিনের আগপর্যন্ত গোলরক্ষকের কাজটা ছিল হাতের ছকে বাঁধা। ডি-বপের মধ্যে হাত দিয়ে বলা ধরা, পেনাল্টি কর্নার ঠেকানো। কিন্তু গোলরক্ষকও যে লম্বা কিক নিয়ে আক্রমণ

এগিয়ে দিতে পারেন, ওপরে এসে চতুর্থ ডিফেন্ডারের ভূমিকা নিতে পারেন, সেটি এই লেভ ইয়াসিনেরই দেখানো, শেখানো। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি ওই সময়টায় ১৯৬৬ বিশ্বকাপে চতুর্থ হয় সোভিয়েত। ১৯৭০ সালের মেপিকো বিশ্বকাপেও পৌঁছে যায় কোয়ার্টারে। এর সবক'টি পর্বে বড় অবদান ছিল ইয়াসিনের অতিমানবীয় গোলরক্ষণের। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে খেলেছেন ১২টি ম্যাচ, যার মধ্যে ৪টিতে কোনো গোলই হয়নি তার জালে।

১৯৫৬ সালে অলিম্পিক স্বর্ণ জয়ের চার বছর পর জিতেছেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। তবে একটি-দুটি ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট নয়, ইয়াসিন তার অবিশ্বাস্য গোলকিপিং করে গেছেন ক্যারিয়ারের পুরোটা সময়জুড়েই। পেনাল্টি কর্নার ঠেকিয়ে দেওয়াকে পরিণত করেছিলেন শিল্পে। 

স্বীকৃত ফুটবল ম্যাচের যে হিসাব সংরক্ষিত আছে, সে অনুসারে ১৫১টি পেনাল্টি রুখেছেন ইয়াসিন, ক্যারিয়ারের ৮১২টি ম্যাচের প্রায় পাঁচশ'টির মতো ম্যাচ ছিল ক্লিনশিট। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে পেলে-গারিঞ্চাদের সঙ্গেই এক ব্র্যাকেটে উচ্চারিত হতো লেভ ইয়াসিনের নাম।

 ১৯৭১ সালের যে দিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ছেড়ে দেন, সেদিন মস্কোর লেনিন স্টেডিয়ামে তার বিদায়ের সম্মানে উপস্থিত ছিলেন পেলে, ফ্রেঞ্চ বেকেনবাওয়ার, ইউসেবিওর মতো তারকা ফুটবলাররা। ২০০২ সালে ফিফা ঘোষিত সর্বকালের বিশ্বসেরা একাদশে গোলরক্ষকের জায়গায় তার নামটা ছিল অবধারিত সংযোজন। তারও আট বছর আগে তার নামে বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার চালু করে ফিফা। বিশ্বকাপের সঙ্গে এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই ইয়াসিনই রাশিয়া বিশ্বকাপের পোস্টারবয়। ইয়াসিনের দেশে, পুতিনের রাজত্বে বসছে 'দ্য গ্রেটেস্ট শো...'

আরও পড়ুন

ছয় কেন্দ্রে ইভিএম, তিন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা

ছয় কেন্দ্রে ইভিএম, তিন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ছয়টি কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ...

মিশরকে এগিয়ে দিলেন সালাহ

মিশরকে এগিয়ে দিলেন সালাহ

এই ম্যাচের ফলাফল এবারের বিশ্বকাপে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে ...

ইন্টারনেট ব্যবহারে ভ্যাট কমছে

ইন্টারনেট ব্যবহারে ভ্যাট কমছে

অবশেষে ইন্টারনেট ব্যবহারে গ্রাহকের কাঁধ থেকে ভ্যাটের বোঝা কমছে। সোমবার অর্থমন্ত্রী ...

শুরুতেই দুই গোলে এগিয়ে উরুগুয়ে

শুরুতেই দুই গোলে এগিয়ে উরুগুয়ে

'এ' গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণী ম্যাচে মাঠে নেমেছে উরুগুয়ে ও রাশিয়া। ...

নেইমারদের এড়াতে যা করতে হবে জার্মানি-মেক্সিকো-সুইডেনকে

নেইমারদের এড়াতে যা করতে হবে জার্মানি-মেক্সিকো-সুইডেনকে

ঘটন-অঘটনের রাশিয়া বিশ্বকাপ প্রথম রাউন্ড শেষ হতে চললো। তবে এখন ...

আর্জেন্টিনা দলে যেসব পরিবর্তন হতে পারে

আর্জেন্টিনা দলে যেসব পরিবর্তন হতে পারে

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের পর আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় রাউন্ড পড়ে ...

বেতন দিয়ে চোর পোষেন ইদু মামা!

বেতন দিয়ে চোর পোষেন ইদু মামা!

ইদু মিয়া ওরফে হাতকাটা ইদু। চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে তার পরিচিতি ...

দেবরকে বাঁচাতে বউ সেজেছিলেন ভাবি!

দেবরকে বাঁচাতে বউ সেজেছিলেন ভাবি!

দেবরকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে ভাবী এখন শ্রীঘরে। সোমবার ...