সিলেট

'সাদা সোনা' নিয়েই মারামারি খুনোখুনি

সিলেটের পাথররাজ্য

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

মুকিত রহমানী, সিলেট সীমান্ত থেকে ফিরে

২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর দেশের অন্যতম পাথর কোয়ারি জাফলংয়ে প্রাণ হারায় স্কুলছাত্র লিটন। কোয়ারির দখল নিয়ে প্রভাবশালী দু'পক্ষের গোলাগুলিতে মারা যায় সে। এর আগে  একাধিক মারামারির ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি লিটনেরই প্রথম বলে জানান সে সময়ে মামলার আসামি জাফলংয়ের বাসিন্দা গণমাধ্যমকর্মী মিনহাজ আহমদ। তবে ২০০৬ সালের পর গত এক দশকে ১০ ব্যক্তি খুন হয়েছেন। মারা গেছেন ৮০ জনের মতো পাথর শ্রমিক। এ পর্যন্ত মামলা ও হামলা হয়েছে অন্তত অর্ধশত।

বছরের পর বছর সিলেটের পাথররাজ্যে অস্থিরতা যেন রোখা যাচ্ছে না। কোয়ারি দখল, চাঁদাবাজি, হত্যা ও মারামারি চলছে 'সাদা সোনা'খ্যাত পাথরের জন্যই। সিলেটের সীমান্তবর্তী চারটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে সাতটি পাথর কোয়ারি আর ৮-১০টি পাথর উত্তোলনের স্থানকে কেন্দ্র করে এই অস্থিরতা কতকাল চলবে- কেউ তা বলতে পারছেন না।

সরেজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, পাথরের জন্য মানুষ তার বাড়ির জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। একের পর এক ধ্বংস করা হচ্ছে গ্রাম, বাজার, স্কুল, মসজিদ, স্থল ও জলের ভূমি। বিছনাকান্দির শাহ আরেফিন টিলা এখন অস্থিত্বহীন। এরশাদ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা গুচ্ছগ্রামটি কোনোমতে টিকে আছে। জাফলং, লোভাছড়া, শ্রীপুর, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দিসহ সবক'টি পাথর কোয়ারি এলাকায় একমাত্র পাথরের জন্য লড়াই চলছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাথর ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল জলিল মেম্বারের তথ্যমতে, এক ফুট পাথরের দাম সর্বোচ্চ ১১০ টাকা। ৮০-১০০ টাকায় বিভিন্ন ধরনের পাথরের ফুট বিক্রি হয়। এক গাড়ি পাথর বিক্রি করলে ২৫-৫০ হাজার টাকা মেলে। আর এমন লোভের কারণে গত এক দশক ধরে এ অবস্থা চলে আসছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাথররাজ্যে পাথর নিয়ে গত এক দশকে ১০ ব্যক্তি খুন হয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৮ জুন ভোলাগঞ্জ কোয়ারি এলাকায় চাঁদাবাজির জের ধরে ফয়সল আহমদ নামে এক ব্যবসায়ী খুন হন। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২০০৯ সালের অক্টোবরে তেলিখাল ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আবদুল অদুদ আলফু মিয়ার ছোট ভাই জলফু মিয়া খুন হন। ২০১২ সালে কোয়ারি-সংলগ্ন দয়ারবাজারে খুন হন আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা জৈন উদ্দিন। ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর কোয়ারি এলাকায় নুরুল আমিন ও হরমুজ আলী নামের দুই ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগ নেতা ব্যবসায়ী আবদুল আলী। ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর কলাবাড়ীর সাহাবুদ্দিন-আলিম উদ্দিন গ্রুপের হাতে খুন হন এমসি কলেজের ছাত্র শামীম আহমদ ছোটন। একদিন পর ওই ঘটনায় আহত আবুল মিয়া নামে একজন মারা যান। ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর শ্রীপুর কোয়ারির দখল নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মারা যান মোহাইল গ্রামের মরতুজ আলী মেম্বারের ছেলে হোসাইন আহমদ। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার অধিকাংশ চার্জশিট হলেও একটিরও বিচার হয়নি।

শুধু হত্যা নয়, গর্ত করে ও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে এক দশকে ৮০ জনের মতো শ্রমিক মারা গেছেন। গত দুই বছরেই মারা গেছেন ৫৯ জন পাথর শ্রমিক। অধিক টাকার লোভে এমন বিপজ্জনক পথ বেছে নেন তারা। কোম্পানীগঞ্জের কালাইরাগ ও শাহ আরেফিন টিলা এবং কানাইঘাটের লোভাড়া পাথর কোয়ারিতে মাদ্রাসা ছাত্রসহ ১৫ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ছিল সিলেটে পাথর শ্রমিক মৃত্যুর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। ওই সময় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এক বছরে সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারিতে টিলা ও গর্ত ধসে অন্তত ৪০ শ্রমিক মৃত্যুর তালিকাও প্রকাশ করে। এর মধ্যে বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয় শাহ আরেফিন টিলা ও উৎমা কোয়ারিতে।

ভোলাগঞ্জ, জাফলং, লোভাছড়া ও শ্রীপুরসহ প্রত্যেক কোয়ারিতেই শ্রমিক মারা যাচ্ছেন। আরেফিন টিলার ঘটনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত তদন্ত কমিটি জড়িত ৪৪ জনের তালিকাও প্রকাশ করে।

পাথররাজ্য অরক্ষিত জানিয়ে বেলা সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার সমকালকে বলেন, পাথররাজ্যে শ্রমিক মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি ঘটত না যদি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতো। পাথর শ্রমিকের মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘতর হলেও পাথরখেকোদের দৌরাত্ম্য কমেনি।

সাদা সোনা নিয়ে খুনাখুনি প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, কোয়ারি এলাকা থেকে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে মূলত হত্যা, মারামারি ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কিছু দুর্বৃত্তের কারণে এ অবস্থা। তাদের রুখতে হবে। তিনি বলেন, দুদক বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পদের হিসাব নেয়, পাথর তুলে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়, তাদের হিসাব নেওয়া হয় না কেন। একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় পাথর কোয়ারিগুলো নিয়ে আসতে না পারলে মৃত্যু রোখা যাবে না বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

সর্বোচ্চ ৬৫ আসনে ছাড় দেবে বিএনপি

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোট শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে মহাসংকটে ...

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চল পাবে শহরের সুবিধা

গ্রামাঞ্চলকে শহরের সুবিধায় আনতে ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ...

প্রত্যাবাসন আজ শুরু হচ্ছে না

প্রত্যাবাসন আজ শুরু হচ্ছে না

বহুল প্রতীক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে না। ...

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

ঘাতক ব্যাধি ডায়াবেটিস থেকে শিশুদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ...

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

'লোকগানের কথায় রয়েছে জীবনের দিকনির্দেশনা। এর ঐন্দ্রজালিক সুর অদ্ভুত এক ...

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

দক্ষ রাজমিস্ত্রি হিসেবেই মিরপুর, ভাসানটেক ও কাফরুল এলাকার মানুষজন চিনতেন ...

নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে বসবে নির্বাচন কমিশন: সচিব

নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে বসবে নির্বাচন কমিশন: সচিব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেছাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি নিয়ে নির্বাচন ...

ইসির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিরোধিতা আ. লীগের

ইসির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর বিরোধিতা আ. লীগের

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আবারও পেছানোর বিরোধিতা করেছে আওয়ামী ...