পরিবেশ-প্রতিবেশ

জলাভূমি :ভবিষ্যৎ ও টেকসই জীবিকার জন্য

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০১৬      

রায়হান আহমেদ

বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা বহু বিস্তীর্ণ জলাভূমি বিভিন্নভাবে প্রকৃতি, সমাজ ও অর্থনীতির সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ২০০৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে বর্তমানে ১২৮০ মিলিয়ন হেক্টর জলাভূমি রয়েছে, যা ব্রাজিলের মোট আয়তনের অর্ধেক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ ভাগ। জলাভূমি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রাণিকুল রক্ষার উদ্দেশ্যে কাস্পিয়ান সাগরতীরে অবস্থিত ইরানের রামসার শহরে ১৯৭১ সালে বিশ্ব প্রকৃতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো নিজ নিজ দেশের জলাভূমি সংরক্ষণে একমত পোষণ করে। রামসার সম্মেলনে জলাভূমির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক অথবা মানবসৃষ্ট, স্থায়ী অথবা অস্থায়ী এবং স্থির বা প্রবহমান পানি; স্বাদু, লবণাক্ত অথবা মিশ্র পানির জলা, ডোবা, পিটভূমি অথবা জলাশয় এলাকা এবং একই সঙ্গে এমন গভীরতাবিশিষ্ট সামুদ্রিক এলাকা, যা নিম্ন জোয়ারের সময় ৬ মিটারের বেশি গভীরতা অতিক্রম করে না তা-ই জলাভূমি। রামসারের সংজ্ঞা অনুসারে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমিই জলাভূমি এবং ২০১৩ সালের মৎস্য অধিদপ্তরের গবেষণা অনুযায়ী দেশের মোট জলাভূমির পরিমাণ ৩৯ লাখ হেক্টর। অপরদিকে আইইউসিএনের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৬.৭ শতাংশ ভূমি সারা বছরই পানির নিচে থাকে, ২১ শতাংশ ভূমি বন্যার সময় ৯০ সেন্টিমিটার পানির নিচে তলিয়ে যায়।
বাংলাদেশের পুষ্টির প্রধানতম জোগানদাতা হচ্ছে মাছ, যার উৎস কেবল নদী নয়, সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য জলাভূমি। জলাভূমি শুধু মানুষের খাদ্য জোগান দেয় না, পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ১৫শ' প্রজাতির প্রাণীর আবাসনও নিশ্চিত করে। দেশের জলাভূমিগুলো পানির উৎস ও প্রাকৃতিক শোধনাগার এবং মাছের আশ্রয়স্থল। জলাশয় খাদ্যশস্য উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ষায় জলাভূমিতে মৎস্য চাষ এবং শুষ্ক মৌসুমে ধানসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ১৫ লাখ মৎস্যজীবী ও অনেক সম্পদ আহরণকারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে জলাভূমি। জলাভূমি বৃষ্টির পানি ধারণ করে পানির ভূগর্ভস্থ স্তরে সরবরাহ, বায়ু বিশুদ্ধকরণ, দূষিত পানির শোধনাগার, প্রাণীর বংশ বৃদ্ধির আধার, অনাবৃষ্টিতে বিভিন্ন প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল (নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট এবং মৌলভীবাজার জেলার অংশবিশেষ), দক্ষিণ অঞ্চল (উপকূলীয় এলাকা) এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে (সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের সুন্দরবন) জলাভূমির পরিমাণ অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালে মিথিলা চক্রবর্তীর গবেষণায় দেখা যায়, দেশে প্রায় ৩৭৩টি জলাভূমি রয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ৭৫-৭৮ লাখ হেক্টর। জলাভূমির মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, দেখার হাওর, দাব্রাইর হাওর, কাওয়াদীঘি হাওর, আটাডাঙ্গা হাওর, বুকভরার বাওর, চলনবিল, আইলা বিল, কুরি বিল, মেদা বিল, ইরালি বিল, চটাইন্নার বিল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, হাতিরগাতা বিল, রূপাবই বিল, আন্না বিল, বিল ভাটিয়া, কাপ্তাই লেক, বগাকিন লেক, সুন্দরবন অন্যতম। হাওর এলাকাখ্যাত দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ছয় হাজার তিনশ'টি বিল।
দেশের জলাভূমি ক্রমাগত কমছে। জনসংখ্যার আধিক্য, অধিক ফসল উৎপাদনের উদ্দেশ্যে জলাভূমিকে ফসলি জমিতে রূপান্তর, বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ নির্মাণ, বিভিন্ন স্তরে অপরিকল্পিত অবকাঠামো (রাস্তাঘাট, ভবন, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি) নির্মাণ ও উন্নয়ন, অবৈধ দখল, নদীর পানি প্রবাহের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন উৎসের দূষণ (পানি ও বায়ু) সামগ্রিকভাবে জলাভূমি হ্রাসের কারণ। বিগত তিন দশকে জলাভূমি কমেছে প্রায় ৭৫ লাখ হেক্টর। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।
জলাভূমিগুলো আমাদের কাছে সরকারি এলাকা (খাস), যা জলমহাল হিসেবে পরিচিত। সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় ইজারার মাধ্যমে জলমহাল থেকে রাজস্ব আদায় করে। মৎস্যজীবী সম্প্রদায়/জেলে সংগঠনগুলোর কাছে ইজারা দেওয়ার কথা থাকলেও সমাজের প্রভাবশালী মহল পেশিশক্তির জোরে জলাভূমি করায়ত্ত করে। জলমহাল নীতি ২০০৯ সালে ইজারার মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিগত তিন বছরের গড় ইজারামূল্যের সঙ্গে ৫ শতাংশ বাড়তি যোগ করে ইজারামূল্য নির্ধারিত হবে। ইজারার বাড়তি মূল্যের কারণে জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের দিকে লক্ষ্য না রেখে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে, অর্থাৎ জলাভূমিগুলোর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে। আবার সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে সমঝোতা স্মারকের আওতায় অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়; বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়) ৬ বছরের জন্য জলমহাল পেয়ে থাকে। এই ইজারা প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের অনুমতি জলাভূমির রাজনৈতিক ব্যবহারকে উদ্বুদ্ধ করে এবং এর গুণাগুণও নষ্ট করতে সহায়তা করে।
জলাভূমিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্থায়িত্বশীল জীবিকার আধার হিসেবে গণ্য করা হয়। জলাভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লাখো মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে হবে জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করেই। বর্তমানে কৃষি ও মৎস্য চাষের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও শুরু হয়েছে হাঁস পালন, শামুক চাষ, জলাশয়ে ভাসমান কচুরিপানার ওপর সবজি চাষ ইত্যাদি। এ ছাড়া, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া শাপলা, হোগলা, মাকনা, সিঙ্গড়া প্রভৃতি আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে বহু মানুষ। বর্ষা মৌসুমে দেশের বহু এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। ফলে অসংখ্য মানুষ নৌকাকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত। জলাভূমি রক্ষার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জলাভূমি-সংশ্লিষ্ট জীবিকাগুলোকে টেকসই করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। জলাভূমি রক্ষা এবং সমৃদ্ধ করতে একটি টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে জলাভূমি সম্পর্কিত সরকারের প্রতিটি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, হাওর উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তর- এ সব দপ্তর বিচ্ছিন্নভাবে জলাভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহায়তা করলেও জলাশয় রক্ষায় একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টার ঘাটতি রয়েছে। আইনি কাঠামোতে জলাভূমির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে বণ্টন না থাকায় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে একাধিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা থাকায়, কার্যক্রমে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের অধিক্রমণ (ওভারলেপিং) ঘটে। জলাভূমির পরিবেশ পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্প-কর্মসূচির সহায়তায় দ্বীপ এবং উপকূলীয় জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। মৎস্য সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ব্যবস্থাপনারও কাজ চলছে।
জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতক্রমে বিপুল জনসংখ্যার বিবিধ প্রয়োজনে ফসলি জমির পরিমাণ কমছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাড়তি খাদ্যের চাহিদা মেটাতে জলাভূমির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলাভূমি রক্ষায় পরিবেশগত দিক থেকে এর ইজারার মৌল নীতি পুনরুদ্ধার, সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং জলাভূমির উৎপাদনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা, সামগ্রিকভাবে জলমহাল-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জলমহাল পরিচালনা কমিটিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ/দপ্তর, নারী প্রতিনিধি, সংগঠন এমনকি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি সম্পৃক্ত ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জলাভূমি রক্ষার্থে দেশের নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় নাগরিকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই কেবল সবার সামগ্রিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে জলাভূমির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী

পরবর্তী খবর পড়ুন : হারিয়ে যাওয়া রিজার্ভ

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

শেষের রোমাঞ্চে হার আফগানদের

এখন পর্যন্ত এশিয়া কাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচ উপহার দিয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান। ...

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে ...

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

দুবাই যাচ্ছেন সৌম্য-ইমরুল

ড্রেসিংরুম থেকেই জরুরি তলব ঢাকায়-ওপেনিংয়ে কিছুই হচ্ছে না। সৌম্য সরকারকে ...

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ...

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

'নায়ক' গেলো সেন্সরে

ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় নায়ক বাপ্পি ও নবাগতা অধরা খান জুটির ...

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

সোনাহাট স্থলবন্দরে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ...

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

পাকিস্তানকে ভালো লক্ষ্য দিল আফগানরা

এশিয়া কাপে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে আফগানিস্তান। ভালো রান সংগ্রহ ...

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

চার জাতির টুর্নামেন্টে দর্শক মেসি

আগামী মাসে সৌদি আরবে চার জাতির একটি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। ...